বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা শুধু দুটি দেশের নাম নয়, আবেগেরও প্রতীক। বিশ্বকাপ এলেই এই দুই দলকে ঘিরে সমর্থকদের উন্মাদনা, তর্ক-বিতর্ক ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে ফুটবলের বাইরেও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা রয়েছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার। কারণ, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার তালিকায় ওপরের দিকে আছে দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই দেশ।
প্রায় ৯ মাস মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। বিজয় অর্জনের ১০ দিন আগেই (৬ ডিসেম্বর) প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ভুটান। এর কয়েক ঘণ্টা পর ভারতও স্বীকৃতি দেয়। এর পর থেকে যতগুলো দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে, সবই বিজয় অর্জনের পর।
ইতিহাস বলছে, ১৯৭২ সালের ১৫ মে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ব্রাজিল। দেশটির রাজধানী ব্রাসিলিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসে এই তারিখের উল্লেখ আছে।
বাংলাদেশ-ব্রাজিলের কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনাও হয়েছে ১৯৭২ সালে। ২০২২ সালে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করে।
আর্জেন্টিনা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ব্রাজিলের ঠিক দশ দিন পর; ১৯৭২ সালের ২৫ মে। ওই দিন থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হয়।
আর্জেন্টিনার সরকারি ডিক্রিতে স্পষ্ট বলা আছে, বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের যৌথ ঘোষণাপত্র ২৫ মে ১৯৭২ তারিখে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় স্বাক্ষরিত হয়। নথিতে স্প্যানিশ ভাষায় এভাবে লেখা আছে, ‘el Comunicado Conjunto sobre el Establecimiento de Relaciones Diplomáticas entre la República Argentina y la República Popular de Bangladesh, suscripto en Djakarta el 25 de mayo de 1972.’
সেই সময় বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার দূতাবাস চালু করা হলেও ১৯৭৮ সালে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২২ বিশ্বকাপ চলাকালীন মেসি-দি মারিয়া-মার্তিনেজদের নিয়ে বাংলাদেশিদের উন্মাদনা ও তাদের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখে আবারো দূতাবাস চালুর সিদ্ধান্ত নেয় আর্জেন্টিনা সরকার। অবশেষে ৪৫ বছর পর ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে আবারো আর্জেন্টিনার দূতাবাস চালু করা হয়।
ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের এক ধরনের আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছে। ব্রাজিলের গোলকিপার আলিসন বেকার, মিডফিল্ডার কাসেমিরো, ফরোয়ার্ড মাথেউস কুনিয়া কিংবা আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ সম্প্রতি বাংলাদেশের সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছেন।
দক্ষিণ আমেরিকার এই দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও দৃঢ় হতে চলেছে। তবে ব্রাজিলের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। আর্জেন্টিনার তুলনায় ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় আট গুণ বেশি। একইভাবে আমদানির ক্ষেত্রেও আর্জেন্টিনার চেয়ে ব্রাজিলের অবস্থান এগিয়ে। দুই দেশেই বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক সাইডলাইন বৈঠকে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা বাংলাদেশ সফরের আগ্রহের কথা জানান।
অন্যদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টাইন রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসাকে স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ম্যাচ উপভোগ করতে ও দলের জয় উদযাপনে অংশ নিতে দেখা গেছে, যা দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করেছে।