মানুষের জীবনে সফলতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় ও অবিরাম প্রচেষ্টার ফল। পৃথিবীর ইতিহাসে যাঁরা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেউই এক দিনে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাননি। অসংখ্য ব্যর্থতা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ধৈর্য ও পরিশ্রমের পথ অতিক্রম করেই তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছেছেন। কারণ মহান আল্লাহ এই পৃথিবীকে কর্মের ক্ষেত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এখানে প্রাপ্তির সঙ্গে প্রচেষ্টা এবং সফলতার সঙ্গে সাধনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
ইসলামও মানুষকে অলসতা বা ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকতে শেখায় না। বরং চেষ্টা, সংগ্রাম ও কর্মনিষ্ঠাকে সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এই যে মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : আন নাজম, আয়াত : ৩৯)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, মানুষ তার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফলই লাভ করে। চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া কোনো অর্জন সম্ভব নয়। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মফলেরই মুখোমুখি হবে। (তাফসিরে কুরতুবী)
পার্থিব জীবনের সাফল্যের মতো আখিরাতের সফলতাও চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর সন্তুষ্টি, জান্নাতের সৌভাগ্য কিংবা আত্মিক উৎকর্ষ—কোনোটিই অলসতার মাধ্যমে লাভ করা যায় না। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর পথে চলতে চায় এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সংগ্রাম করে, আল্লাহ নিজেই তার জন্য হেদায়েতের পথ খুলে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে চেষ্টা-সংগ্রাম করবে, তাদের আমি আমার পথ দেখাব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মশীল লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।’
(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)
এই আয়াতের তাফসিরে ফুদাইল ইবনে আয়াদ বলেন, ‘যারা বিদ্যার্জনে ব্রতী হয়, আমি তাদের জন্য আমলও সহজ করে দিই।’ (বাগভী)
আসলে মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা কখনোই আল্লাহর কাছে মূল্যহীন নয়। কোনো ব্যক্তি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পরিশ্রম করে, আল্লাহ তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন না; বরং ধীরে ধীরে তাকে সত্যের পথে পরিচালিত করেন, কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং নেক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।
মুমিনের জীবনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়; বরং আখিরাতের স্থায়ী মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই একজন মুমিন ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি নফল আমল, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন ও মানবসেবার মাধ্যমে নিজের আমলের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা এমন প্রচেষ্টাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আর যারা মুমিন হয়ে আখিরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে। তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।
(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১৯)
অতএব, সফলতার স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন নিরলস চেষ্টা, ধৈর্য ও আত্মনিবেদন। দুনিয়ার কোনো ক্ষেত্রেই হোক কিংবা আখিরাতের কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যেই হোক, মহান আল্লাহ চেষ্টা ও সাধনাকেই সফলতার সোপান বানিয়েছেন। তাই মুমিনের কর্তব্য হলো হতাশ না হয়ে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং বিশ্বাস করা যে আন্তরিক প্রচেষ্টার কোনো প্রতিদান কখনোই আল্লাহর কাছে হারিয়ে যায় না। একদিন না একদিন তিনি তার শ্রম, ত্যাগ ও সাধনার উত্তম প্রতিদান অবশ্যই দান করবেন।