• ই-পেপার

অকুতোভয় সাহাবি বারা ইবনে মালিক (রা.)

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব ১১৪৩

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

‘হা-মিম, এই কিতাব পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর কাছ থেকে অবতীর্ণ। নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে নিদর্শন রয়েছে মুমিনদের জন্য।...এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার কাছে তিলাওয়াত করেছি যথাযথভাবে। সুতরাং আল্লাহর ও তাঁর আয়াতের পরিবর্তে তারা আর কোন বাণীতে বিশ্বাস করবে?’ (সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ১-৬)

পবিত্র কোরআনের ৪৫তম সুরা জাসিয়া। মক্কায় অবতীর্ণ এই সুরায় চারটি রুকু ও ৩৭টি আয়াত আছে। অন্যান্য মক্কি সুরার মতো এই সুরায়ও বিশ্বাসের সংশোধনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

 

শিক্ষা ও বিধান

১. কোরআনে ‘আজিজ’ বিশেষণটি আল্লাহ ও কোরআন উভয়ের জন্য এ কথা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে যে আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাব তাঁর শান ও মর্যাদার অনুকূল।

২. আয়াতগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বাসী, সুদৃঢ় বিশ্বাসের অধিকারী ও জ্ঞানী-বুদ্ধিমান শব্দগুলো আনা হয়েছে, যা মর্যাদার ক্ষেত্রে মুমিনদের ক্রমধারার প্রতি ইঙ্গিত করে।

৩. তাওহিদের প্রমাণ হিসেবে কোরআনে ছয়টি বড় নিদর্শনের বর্ণনা বারবার করা হয়েছে। তা হলো—ক. আসমান-জমিনের সৃষ্টি, খ. মানবসৃষ্টি, গ. চতুষ্পদ জন্তুর সৃষ্টি।

৪. এবং ঘ. রাত-দিনের পরিবর্তন, ঙ. বৃষ্টির মাধ্যমে জমিনকে সজীব করা, চ. বাতাস প্রবাহিত করা।

৫. উল্লিখিত ছয়টি নিদর্শন বারবার আলোচনা করার কারণ হলো তা যেকোনো স্তরের মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব। (আল কোরআন তাদাব্বুর ওয়া আমল : ২৬/১৮)

মসজিদে নববীর আঙ্গিনা শীতলীকরণে ব্যবহৃত মার্বেল থাসোস

আবু তাশফিন
মসজিদে নববীর আঙ্গিনা শীতলীকরণে ব্যবহৃত মার্বেল থাসোস

মসজিদে নববীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য উপাদান এবং এর পরিবেশবান্ধব শীতলীকরণ ব্যবস্থার একটি প্রধান অংশ হলো সাদা থাসোস মার্বেল। এটি মসজিদের অভ্যন্তর, ছাদ এবং উন্মুক্ত চত্বরগুলোতে ইবাদতকারীদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মসজিদের চত্বর ও ছাদজুড়ে বিছানো সাদা মার্বেল আশপাশের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে মুসল্লিরা নামাজ আদায় কিংবা চত্বরে চলাফেরার সময় পায়ের নিচে শীতলতার অনুভূতি পান। পবিত্র দুই মসজিদের প্রতি সৌদি আরবের বিশেষ যত্ন এবং হজযাত্রী, ওমরাহ পালনকারী ও দর্শনার্থীদের সেবার প্রতি তাদের আন্তরিকতার এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পবিত্র মসজিদ ও মসজিদে নববী বিষয়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মসজিদে নববীর ছাদ ও বহিরাঙ্গন চত্বরগুলো আবৃত করতে মোট এক লাখ ১৭ হাজার বর্গমিটার সাদা থাসোস মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন আকারের এসব মার্বেল খণ্ড মসজিদের নান্দনিক স্থাপত্য নকশা, নামাজের স্থান এবং উন্মুক্ত চত্বরের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে এগুলো মসজিদের বিভিন্ন স্থাপনা ও উপাদানে সৌন্দর্যের অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। সব মিলিয়ে এটি ইবাদতকারীদের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত মার্বেল আবৃত এলাকাগুলোর একটি।

কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, উজ্জ্বল শুভ্র বর্ণের জন্য খ্যাত থাসোস মার্বেলের উচ্চমান এবং সূর্যের আলো প্রতিফলিত করার বিশেষ ক্ষমতার কারণে নির্বাচন করা হয়েছে। এটি সূর্যের তাপ শোষণ না করে অপেক্ষাকৃত শীতল থাকে, ফলে নামাজ আদায়ের স্থান হিসেবে এটি অত্যন্ত উপযোগী।

এ ছাড়া মার্বেলগুলো নিয়মিতভাবে বিশেষ স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে পলিশ, পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত করা হয়। এর ফলে মার্বেলের স্বচ্ছতা, দীপ্তি ও তাপ নিয়ন্ত্রণের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকে এবং বছরজুড়ে মুসল্লিদের ব্যবহারের জন্য সর্বদা প্রস্তুত রাখা সম্ভব হয়।

সূত্র : রিয়াদ ডেইলি

 

ইসলাম কী বলে

ঋণ শোধের জন্য আত্মহত্যা বা অনাচারে জড়ানো

উমায়ের কোব্বাদী
ঋণ শোধের জন্য আত্মহত্যা বা অনাচারে জড়ানো

যদি কোনো নারী-পুরুষ অভিভাবকহীন অবস্থায় এমন ঋণ ও সংকটে পড়ে যায় যে তার সামনে আত্মহত্যা বা পতিতাবৃত্তি—এই দুটি পথই খোলা মনে হয়, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে এ দুটির কোনোটিই বৈধ নয়। ইসলাম মানুষের কষ্ট, দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বকে বিবেচনা করে, কিন্তু হারামকে হালাল করে দেয় না; বরং এমন অবস্থায় ধৈর্য, তাওবা, দোয়া, হালাল উপার্জনের চেষ্টা এবং মানুষের সাহায্য গ্রহণের নির্দেশ দেয়।

আত্মহত্যা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু।’

(সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

আর ব্যভিচার ও পতিতাবৃত্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা ও অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩২)

এ ছাড়া কোরআনে বিশেষভাবে নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য কোরো না।’

(সুরা : নূর, আয়াত : ৩৩)

অতএব, কোনো মা যদি ঋণ শোধের জন্য নিজের মেয়েকেও এ কাজে বাধ্য করতে চান, তাহলে তা হারাম, জুলুম ও মারাত্মক গুনাহ। মেয়ের জন্য এ আদেশ মানা বৈধ নয়। কারণ ইসলামে আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কারো আনুগত্য করা যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘অসৎ কাজে আনুগত্য নয়; আনুগত্য শুধু সৎ কাজের ক্ষেত্রেই হতে হবে।’

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৪৫)

তাই কন্যাসন্তানের করণীয় হলো—

এ কাজ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা, নিরাপদ কোনো আত্মীয়, আলেম, বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া, নিজেকে নিরাপদ পরিবেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা, হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের পথ খোঁজা। আর যদি কোনো মেয়ে এরই মধ্যে এ কাজে জড়িয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা বন্ধ নয়। সে অবিলম্বে এ কাজ ছেড়ে দেবে, আন্তরিকভাবে তাওবা করবে, হারাম সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং হালাল জীবিকার দিকে ফিরে আসবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’

(সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

ইসলাম মানুষকে হতাশ হতে শেখায় না। যত কঠিন পরিস্থিতিই হোক, হারাম পথের পরিবর্তে হালাল পথ খোঁজার চেষ্টা করতে হবে এবং আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখতে হবে।

সাফল্য লাভে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব

মাইমুনা আক্তার
সাফল্য লাভে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব

মানুষের জীবনে সফলতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘ সাধনা, অধ্যবসায় ও অবিরাম প্রচেষ্টার ফল। পৃথিবীর ইতিহাসে যাঁরা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কেউই এক দিনে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাননি। অসংখ্য ব্যর্থতা, প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ধৈর্য ও পরিশ্রমের পথ অতিক্রম করেই তাঁরা গন্তব্যে পৌঁছেছেন। কারণ মহান আল্লাহ এই পৃথিবীকে কর্মের ক্ষেত্র হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এখানে প্রাপ্তির সঙ্গে প্রচেষ্টা এবং সফলতার সঙ্গে সাধনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ইসলামও মানুষকে অলসতা বা ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকতে শেখায় না। বরং চেষ্টা, সংগ্রাম ও কর্মনিষ্ঠাকে সফলতার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে উপস্থাপন করে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এই যে মানুষ তাই পায়, যা সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : আন নাজম, আয়াত : ৩৯)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেন, মানুষ তার কর্ম ও প্রচেষ্টার ফলই লাভ করে। চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া কোনো অর্জন সম্ভব নয়। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মফলেরই মুখোমুখি হবে। (তাফসিরে কুরতুবী)

পার্থিব জীবনের সাফল্যের মতো আখিরাতের সফলতাও চেষ্টা ও সাধনা ছাড়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর সন্তুষ্টি, জান্নাতের সৌভাগ্য কিংবা আত্মিক উৎকর্ষ—কোনোটিই অলসতার মাধ্যমে লাভ করা যায় না। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর পথে চলতে চায় এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সংগ্রাম করে, আল্লাহ নিজেই তার জন্য হেদায়েতের পথ খুলে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে চেষ্টা-সংগ্রাম করবে, তাদের আমি আমার পথ দেখাব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মশীল লোকদের সঙ্গে রয়েছেন।’

(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)

এই আয়াতের তাফসিরে ফুদাইল ইবনে আয়াদ বলেন, ‘যারা বিদ্যার্জনে ব্রতী হয়, আমি তাদের জন্য আমলও সহজ করে দিই।’ (বাগভী)

আসলে মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা কখনোই আল্লাহর কাছে মূল্যহীন নয়। কোনো ব্যক্তি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পরিশ্রম করে, আল্লাহ তাকে তার অবস্থার ওপর ছেড়ে দেন না; বরং ধীরে ধীরে তাকে সত্যের পথে পরিচালিত করেন, কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেন এবং নেক কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।

মুমিনের জীবনের লক্ষ্য শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়; বরং আখিরাতের স্থায়ী মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই একজন মুমিন ফরজ ইবাদত যথাযথভাবে আদায়ের পাশাপাশি নফল আমল, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন ও মানবসেবার মাধ্যমে নিজের আমলের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা এমন প্রচেষ্টাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আর যারা মুমিন হয়ে আখিরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে। তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।

(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ১৯)

অতএব, সফলতার স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়; সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন নিরলস চেষ্টা, ধৈর্য ও আত্মনিবেদন। দুনিয়ার কোনো ক্ষেত্রেই হোক কিংবা আখিরাতের কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যেই হোক, মহান আল্লাহ চেষ্টা ও সাধনাকেই সফলতার সোপান বানিয়েছেন। তাই মুমিনের কর্তব্য হলো হতাশ না হয়ে অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং বিশ্বাস করা যে আন্তরিক প্রচেষ্টার কোনো প্রতিদান কখনোই আল্লাহর কাছে হারিয়ে যায় না। একদিন না একদিন তিনি তার শ্রম, ত্যাগ ও সাধনার উত্তম প্রতিদান অবশ্যই দান করবেন।