জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নারী ও কিশোরীরা ক্রমেই জটিল স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপুষ্টি, অনিরাপদ স্যানিটেশন এবং জলবায়ুজনিত দারিদ্র্যের কারণে মাতৃ ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু-সম্পর্কিত বাজেট বরাদ্দ উল্টো কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মানবিক মূল্য দিচ্ছে স্বাস্থ্য খাত, কিন্তু জাতীয় বাজেট ও জলবায়ু অর্থায়নে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন এখনও পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থায় জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তারা।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন’ শীর্ষক নীতিসংলাপে এসব তথ্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), এইচইকেএস/ইপিইআর এবং সুশীলনের যৌথ উদ্যোগে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
উপস্থাপিত গবেষণায় দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সম্পর্কিত বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশে। একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার কথা বিবেচনায় নিলে বরাদ্দ বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট নতুন স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারছে না।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের গভর্ন্যান্স, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশবিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শিরিন সুলতানা লিরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। এ বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক তথ্যকে কার্যকর নীতি এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য অধিক অর্থায়ন সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
নীতিসংলাপে সিপিআরডির দুটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষণা দুটির শিরোনাম ছিল ‘উপকূলীয় নারী ও কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন’ এবং ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়ন: নীতিগত আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব আর্থিক চিত্র’।
গবেষণায় উঠে আসে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন উপকূলীয় অঞ্চলের নারী ও কিশোরীরা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এবং নিরাপদ পানির অভাব তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীরা জানিয়েছেন, তারা অনিয়মিত ঋতুস্রাব, তীব্র মাসিকব্যথা, গর্ভপাত, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, প্রসবকালীন জটিলতা, প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণ এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণসহ নানা ধরনের প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক জটিলতারও জন্ম দিচ্ছে।
গবেষকরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে সাধারণত কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা বা অবকাঠামোর ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধভাবে দেখা হয়। অথচ নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য, মাতৃস্বাস্থ্য এবং শিশুস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের (বিসিসিটিএফ) অর্থায়নেও স্বাস্থ্য খাত তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত। তহবিলটির মোট অর্থায়নের ১ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে।
২০২৪ সাল পর্যন্ত বিসিসিটিএফ-এর আওতায় অর্থায়ন পাওয়া ৮৭৭টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র তিনটি বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার একটি স্পষ্ট চিত্র।
বক্তারা বলেন, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) ২০২৩-২০৫০-এ স্বাস্থ্যকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সেই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রতিশ্রুতি এখনো দৃশ্যমান নয়।
স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) অনুযায়ী, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থ ব্যবহার করা হবে স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, রোগ নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, জরুরি প্রস্তুতি বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত গবেষণা সম্প্রসারণে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বর্তমানে জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার ৬০ শতাংশের বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে রোগ নজরদারি, দুর্যোগ প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন সক্ষমতা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত তুলনামূলকভাবে কম অর্থায়ন পাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উপসচিব ড. শাহ আবদুল সাদি বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহের জন্য শক্তিশালী ও তথ্যসমৃদ্ধ জলবায়ু-যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক অভিযোজন অর্থায়ন এক বছরে প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার কমে গেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে জলবায়ু বাজেট ট্যাগিং ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের নিজস্ব অর্থায়ন সংগ্রহ সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল কবির বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে আসে। ফলে স্বাস্থ্য খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া শক্তিশালী অর্থায়ন প্রস্তাব তৈরি করা এবং কার্যকর নীতি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও ইউএন উইং প্রধান এ কে এম সোহেল বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখনো পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে বিভিন্ন উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন কমে যাওয়ার এই সময়ে বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতকে আরো সহনশীল করে তুলতে হবে।
সংলাপের শেষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারগুলো বাজেট প্রক্রিয়ায় আরো শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু বাজেট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, রোগ নজরদারি ও জরুরি প্রস্তুতির জন্য নিয়মিত অর্থায়ন বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য দেশীয় জলবায়ু তহবিলে অধিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।