রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় জেসমিন আক্তার বিথী নামের এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবি, প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে হলেও মাদকাসক্ত স্বামীর যৌতুকের দাবি ও ক্রমাগত নির্যাতনে বিথী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার বাবার দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
শুক্রবার (৫ জুন) রাতে কুনিপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় অচেতন বিথীকে উদ্ধার করা হয়। পরে মহাখালী ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় নিহতের বাবা মো. ইলিয়াস ব্যাপারী বাদী হয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’র মামলা দায়ের করেছেন। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে নিহতের মাদকাসক্ত স্বামী আল আমিন ব্যাপারিকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছরের প্রেমের সম্পর্কের পর পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন আল আমিন ও জেসমিন আক্তার বিথী। বিয়ের প্রথম কিছুদিন তাদের সংসার ভালোই চলছিল। আল আমিন তার বড় ভাইয়ের মাছের আড়তে কাজ করতেন। স্বামীকে ব্যবসায় সহযোগিতা করার জন্য বিথী নিজে ব্যাংক থেকে ৬২ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে আল আমিনকে দিয়েছিলেন।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বাদল গোমস্তা কালের কণ্ঠকে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আল আমিন দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবনের কথা স্বীকার করেছেন। বিথীর দেওয়া ঋণের টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে আল আমিন মাদক সেবনে নষ্ট করেন বলে স্ত্রী সন্দেহ করতেন। প্রায় প্রতি রাতেই আল আমিন মাদকাসক্ত হয়ে বাসায় ফিরতেন এবং এই নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র ঝগড়া ও মারধরের ঘটনা ঘটত। পারিবারিক এই অশান্তি ও নির্যাতনের কারণে বিথী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে অভিযোগ করেও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি।
মামলার এজাহারে নিহতের বাবা ইলিয়াস ব্যাপারী উল্লেখ করেন, প্রেমের বিয়ে হলেও বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই আল আমিন ও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা বিথীর কাছে ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিলেন। যৌতুকের টাকার জন্য তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।
গত ৪ জুন রাতেও টাকার জন্য বিথীকে বেদম মারধর করা হয়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরদিন শুক্রবার সকালে বিথী বাবার বাড়িতে চলে যান। কিন্তু সেখানেও আল আমিন ফোনে হুমকি দিয়ে বলেন, টাকা না নিয়ে ফিরলে তিনি আর সংসার করবেন না। বাবার আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে বিথী টাকা ছাড়াই আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরে যান। সেখানে যাওয়ামাত্রই তার ওপর পুনরায় নির্যাতন শুরু হয়।
বিথীর বাবা জানান, ঘটনার দিন রাতে বিথী রুমের ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে তাকে ফোন করে জানান যে, টাকা-পয়সা নিয়ে স্বামীর সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছে। খবর পেয়ে ইলিয়াস ব্যাপারী তার এক বন্ধুকে নিয়ে দ্রুত মেয়ের বাসায় যান। রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে ডাকাডাকি ও ফোনে চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে আল আমিন বাসায় এসে দরজা খুললে দেখা যায়, বিথী সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলছেন। প্রথমে শমরিতা হাসপাতাল এবং পরে মহাখালী ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিথীর বাবা মো. ইলিয়াস ব্যাপারী বলেন, আমার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। মেয়েকে তো আর কোনোদিন ফেরত পাব না। আমি শুধু আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই।
পুলিশ জানায়, এই মামলায় আল আমিন ও মোক্তার হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।






