ব্রাজিল নামটা শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে ফিফা বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা। ফুটবল বিশ্বকাপের সমার্থক হয়ে যাওয়া এই লাতিন পরাশক্তিরা বিশ্বমঞ্চের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল। রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তো বটেই, একমাত্র দল হিসেবে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়া ২২টি বিশ্বকাপের প্রতিটিতেই অংশ নিয়েছে সেলেসাওরা।
অথচ এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পিঠেও আছে এক দীর্ঘ হতাশার গল্প। ২০০২ সালে জাপানের ইয়োকোহামায় পঞ্চম তারকা (পেন্টা) জয়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪টি বছর। এরপর থেকে গত পাঁচটি বিশ্বকাপের চারটিতেই কোয়ার্টার ফাইনালের বৈতরণী পার হতে পারেনি সাম্বার দেশ।
তবে এবার ডাগআউটে বসেছেন ফুটবলের চতুর জাদুকর এবং সিরিয়াল উইনার কার্লো আনচেলত্তি। তার অধীনেই ব্রাজিল হারাতে বসা সিংহাসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া। বিখ্যাত ‘অপটা সুপারকম্পিউটার’ ২৫ হাজার বার টুর্নামেন্টের সিমুলেশন চালিয়ে বের করেছে, কীভাবে এবং কোন পথ ধরে এবার ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে পারে ব্রাজিল।
চলুন দেখে নেওয়া যাক সুপারকম্পিউটারের চোখে ব্রাজিলের সেই সম্ভাব্য রোডম্যাপ:
গ্রুপ পর্ব
গ্রুপ ‘সি’: মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ড
গ্রুপ ‘সি’-তে ব্রাজিলের সঙ্গী মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ড। এই গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষেত্রে সেলেসাওদের দেওয়া হয়েছে ৬০.৮ শতাংশ সম্ভাবনা। আর শেষ ৩২-এ যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৬.৯ শতাংশ। পুরো টুর্নামেন্টে কেবল স্পেনের গ্রুপ পর্ব পার হওয়ার সম্ভাবনা (৯৮.৬ শতাংশ) ব্রাজিলের চেয়ে বেশি।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৮২ সালের পর থেকে প্রতিবারই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে গেছে ব্রাজিল। মরক্কো হয়তো কিছুটা প্রতিরোধ গড়তে পারে, তবে আনচেলত্তির দলের জন্য গ্রুপ পর্ব পার হওয়া কোনো কঠিন পরীক্ষা হওয়ার কথা নয়।
শেষ ৩২ (সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: জাপান)
গ্রুপ ‘এফ’-এর রানার্স-আপ হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে জাপান। ফলে শেষ ৩২-এ ব্রাজিলের সামনে পড়তে পারে ‘সামুরাই ব্লু’রা। এই বাধা টপকে শেষ ১৬-তে যাওয়ার জন্য ব্রাজিলকে ৬২.১ শতাংশ ফেভারিট ধরা হয়েছে।
অতীত ইতিহাসও ব্রাজিলের পক্ষে গান গাইছে। জাপানের বিপক্ষে খেলা ১৪ ম্যাচের ১১টিতেই জিতেছে ব্রাজিল (ড্র ২টি, হার ১টি)।
শেষ ১৬ (সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: নরওয়ে)
১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করেছে নরওয়ে। আর তাদের আক্রমণভাগের নেতৃত্বে আছেন আর্লিং হালান্ড। শেষ ১৬-তে এই নরওয়েই হতে পারে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি হবে দুই দলের মাত্র দ্বিতীয় সাক্ষাৎ। এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নরওয়ে ২-১ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিলকে। অবশ্য সেই ম্যাচে ব্রাজিল আগেই নকআউট নিশ্চিত করে ফেলায় কিছুটা গা-ছাড়া ভাব ছিল, অন্যদিকে নরওয়ের জন্য ওটা ছিল বাঁচা-মরার লড়াই।
তবে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে ব্রাজিলের রেকর্ড এককথায় অনবদ্য। এই পর্বে খেলা ১০টি ম্যাচের ৯টিতেই তারা পরের রাউন্ডে গেছে, যার মধ্যে রয়েছে টানা শেষ আটটি জয়। ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এই রাউন্ডে ব্রাজিলের রেকর্ড শতভাগ—১৯৮৬ সালে পোল্যান্ডকে ৪-০ এবং ২০০২ সালে বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে হারিয়েছিল তারা।
কোয়ার্টার ফাইনাল (সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: ইংল্যান্ড)
আগের দুই রাউন্ডের প্রতিপক্ষকে সম্মান জানিয়েই বলা যায়, আসরটি আসল রূপ নেবে ঠিক এই জায়গায় এসে। কার্লো আনচেলত্তির দলের জন্য এটি হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।
ব্রাজিলকে সেমিফাইনালে যেতে হলে রুখতে হবে ইংল্যান্ডকে, যাদের টুর্নামেন্ট জেতার সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ১১.৪ শতাংশ (স্পেন ও ফ্রান্সের পরই তৃতীয় সর্বোচ্চ)। তবে থ্রি লায়ন্সদের সামনে পেয়ে ব্রাজিল ভয় পাওয়ার চেয়ে আত্মবিশ্বাসীই হবে বেশি। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ ১২ ম্যাচের মাত্র একটিতে হেরেছে ব্রাজিল (৫ জয়, ৬ ড্র)। আর বিশ্বকাপে চারবারের দেখায় কখনই ইংল্যান্ডের কাছে হারেনি সেলেসাওরা, জিতেছে শেষ তিনটি ম্যাচই। ২০০২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে রোনালদিনহোর সেই আইকনিক ফ্রি-কিকের কল্যাণে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর স্মৃতি এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে অমলিন।
ইংল্যান্ড সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৮ বিশ্বকাপে তৃতীয় এবং পরপর দুটি ইউরোতে (২০২০, ২০২৪) রানার্স-আপ হয়ে বেশ উন্নতি করলেও, ১৯৬৬ সালের পর তাদের দীর্ঘ ৬০ বছরের বিশ্বকাপ খরা ব্রাজিলের ২৪ বছরের খরাকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়।
সেমিফাইনাল (সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: ফ্রান্স)
ইংল্যান্ডের বাধা টপকাতে পারলে ব্রাজিলের সামনে আসবে আরও বড় পাহাড়—দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। সুপারকম্পিউটারের মতে, দিদিয়ের দেশমের দলের সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা ৩৩.৫ শতাংশ।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই পরাশক্তি চারবার মুখোমুখি হয়েছে এবং এখানে ইতিহাস কথা বলছে ফরাসিদের পক্ষে। ১৯৫৮ সালের সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ৫-২ গোলে হারিয়ে প্রথম ট্রফির দিকে এগিয়েছিল পেলে-ভাভাদের ব্রাজিল। কিন্তু এরপর থেকে প্রতিবারই ফরাসিদের কাছে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে লাতিনদের। ১৯৮৬ ও ২০০৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় করার পাশাপাশি ১৯৯৮ সালের ফাইনালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ফ্রান্স।
তাছাড়া সেমিফাইনালে ফ্রান্সের রেকর্ড অবিশ্বাস্য—তারা তাদের শেষ চারটি সেমিফাইনালই জিতেছে, যার শেষ তিনটিতে কোনো গোলই হজম করেনি। তবে ব্রাজিলও কম যায় না; নিজেদের শেষ সাতটি সেমিফাইনালের মাত্র একটিতে তারা ফাইনালের টিকিট কাটতে ব্যর্থ হয়েছে। আর ইউরোপীয় দলগুলোর বিরুদ্ধে শেষ পাঁচ সেমির চারটিতেই জিতেছে ব্রাজিল।
ফাইনাল (সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ: স্পেন)
সব বাধা পেরিয়ে ব্রাজিল যদি ফাইনালে উঠতে পারে, তবে শিরোপার মহালড়াইতে তাদের সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হবে টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট স্পেন (সুপারকম্পিউটারের চোখে যাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, ১৬.৫ শতাংশ)।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন হতে পারে, কিন্তু বিশ্বকাপে তাদের সাম্প্রতিক অতীত একেবারেই সুখকর নয়। ২০১০ চ্যাম্পিয়নদের শেষ তিনটি বিশ্বকাপ মিশন ছিল হতাশাজনক—২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, আর ২০১৮ ও ২০২২ আসরে বিদায় নিতে হয়েছে শেষ ১৬ থেকেই।
ইতিহাসের পাতায় স্পেনের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের পাল্লাটাই ভারী। ১০ বারের দেখায় মাত্র দুটিতে হেরেছে ব্রাজিল (৫ জয়, ৩ ড্র)। বিশ্বকাপে স্পেনের বিরুদ্ধে শেষ চার ম্যাচে অপরাজিত সেলেসাওরা (৩ জয়, ১ ড্র)। তবে সেই ম্যাচগুলো ছিল গ্রুপ পর্বের, আর বিশ্বকাপের ফাইনালের চাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গোলকধাঁধা।
টুর্নামেন্টের প্রথম বাঁশি বাজার আগে, অপটা সুপারকম্পিউটারের ২৫,০০০ সিমুলেশনে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মাত্র ৬.৭ শতাংশ সময়ে। সম্ভাবনার দিক থেকে ব্রাজিলের চেয়ে এগিয়ে আছে আরো পাঁচটি দেশ।
তবে পরিসংখ্যান এবং সুপারকম্পিউটার যা-ই বলুক, ফুটবল মাঠের রোমাঞ্চ কখনো কোনো চিপ বা অ্যালগরিদমে বন্দি করা যায় না। কার্লো আনচেলত্তির চাণক্য মস্তিস্ক আর ভিনিসিয়ুস-নেইমারদের পায়ের জাদু কি পারবে ২৪ বছরের অপেক্ষা ফুরিয়ে ব্রাজিলের জার্সিতে ষষ্ঠ সোনালি তারকাটা খোদাই করতে? উত্তরটা তোলা রইল সময়ের খেরোখাতায়।