• ই-পেপার

টেরোট কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মনোমালিন্য এড়াতে নববী নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মনোমালিন্য এড়াতে নববী নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কোনো সম্পর্ক নেই যেখানে কখনো মতভেদ, অভিমান বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় না। বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কিংবা দাম্পত্য—প্রত্যেক সম্পর্কেই কখনো না কখনো পরীক্ষার মুহূর্ত আসে। তবে একটি সম্পর্কের সফলতা নির্ভর করে মতভেদ না হওয়ার ওপর নয়; বরং মতভেদকে কীভাবে প্রজ্ঞা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সমাধান করা হয়, তার ওপর।

ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, সম্মান ও দায়িত্বের এক পবিত্র বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

 وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً 

অর্থ : ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ ‍(সুরা : রূম, আয়াত : ২১)

এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো সাকিনা (প্রশান্তি), মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) এবং রহমাহ (দয়া)। তাই টানাপোড়েন দেখা দিলেও সম্পর্ক রক্ষা করার মানসিকতাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সংসারে কখনো কোনো মতভেদ বা অভিমান ছিল না। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। ইসলাম মানুষকে কল্পনার জগৎ নয়, বাস্তব জীবনের শিক্ষা দেয়। নবীজির সম্মানিত স্ত্রীগণেরও স্বাভাবিক আবেগ, অনুভূতি, অভিমান ও চাওয়া-পাওয়া ছিল। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) অসীম ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে সেসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এ কারণেই তাঁর সংসার প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য আদর্শ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। এমনও মাস কেটে যেত যখন তাঁর ঘরে রান্নার জন্য চুলা জ্বলত না। তিনি ও তাঁর পরিবার খেজুর ও পানি খেয়ে দিন অতিবাহিত করতেন। অথচ আল্লাহ চাইলে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তাঁর সামনে এনে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি দুনিয়ার চাকচিক্যের পরিবর্তে আখেরাতের স্থায়ী সফলতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৯)

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলে কীভাবে সংযমী আচরণ করতে হয়, তার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় হাফসা (রা.)-এর একটি ঘটনায়। একবার কথোপকথনের সময় ওমর (রা.) তাঁর কন্যা হাফসা (রা.)-এর একটি আবেগপূর্ণ কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে শান্ত করেন এবং পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত হতে দেননি। এ ঘটনা আমাদের শেখায়, রাগের মুহূর্তে উচ্চারিত প্রতিটি কথাকে বড় করে দেখা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ বানানো উচিত নয়। বরং সংযম ও সহনশীলতাই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। (সিরাতে হালাবিয়্যা, ৩/২১৭)

এক সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীরা সংসারের ভরণপোষণে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করেছিলেন। বিষয়টি জানার পর আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) নিজেদের কন্যাদের শাসন করতে চাইলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সে সুযোগ দেননি। কারণ, স্বামীর কাছে প্রয়োজন বা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু চাওয়া কোনো অপরাধ বা অবাধ্যতা নয়। তিনি বিষয়টিকে পারিবারিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। (হায়াতুস সাহাবা, ২/৬৮৪)

তবে যখন দুনিয়াবি চাহিদার বিষয়টি বারবার সামনে আসে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মানসিকভাবে কষ্ট পান। সেই কষ্টে তিনি প্রায় এক মাস স্ত্রীদের থেকে আলাদা অবস্থান করেন। এ সময় সমাজে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি নাকি তাঁদের তালাক দিয়েছেন। পরে ওমর (রা.) এসে সত্যতা যাচাই করেন এবং জানতে পারেন, তালাকের ঘটনা ঘটেনি। তারপর তিনি পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে হাস্যরসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মন প্রফুল্ল করার চেষ্টা করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৯১, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৭৯)

এরপর আল্লাহ তাআলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা অবতীর্ণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দেন, তাঁর স্ত্রীদের সামনে দুটি পথ উপস্থাপন করতে—একদিকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, অন্যদিকে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখেরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا ۝ وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا

অর্থ : ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদের কিছু ভোগ-সামগ্রী দিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় করে দেব। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখেরাত কামনা কর, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীলদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২৮–২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সকল স্ত্রী আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং আখেরাতকেই বেছে নিয়েছিলেন। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের ঈমান, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

অর্থ : ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করে। আর আমি আমার পরিবারের সঙ্গে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম আচরণ করি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)
আবার আল্লাহ তাআলা স্বামীদের নির্দেশ দিয়ে বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

অর্থ : ‘তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম ও সদাচরণে জীবনযাপন কর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
এসব শিক্ষা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, একটি সুখী সংসারের জন্য ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংযম, ন্যায়বিচার এবং আন্তরিক যোগাযোগ কতটা অপরিহার্য। রাগের মুহূর্তে কঠোর সিদ্ধান্ত না নেওয়া, অভিমানকে দীর্ঘস্থায়ী না করা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়াই নববি আদর্শ।

নবী করিম (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন ছিল বাস্তব জীবনের একটি পরিপূর্ণ আদর্শ। সেখানে মতভেদ ছিল, অভিমান ছিল, পারিবারিক চাহিদা ছিল; কিন্তু ছিল না অবিচার, প্রতিশোধ, অপমান কিংবা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার তাড়াহুড়ো। বরং ছিল ধৈর্য, ন্যায়, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা, ক্ষমা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখার মানসিকতা।

আজ আমাদের অনেক সংসার ভেঙে যায় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার, রাগ বা যোগাযোগের অভাবে। অথচ যদি আমরা মহানবী (সা.) শিক্ষা অনুসরণ করি—রাগের সময় সংযম অবলম্বন করি, একে অপরকে ক্ষমা করি, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখি এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সংসার পরিচালনা করি—তবে ইনশাআল্লাহ আমাদের পরিবার হবে শান্তিময়, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং আখেরাতের সফলতার একটি মাধ্যম। সত্যিই, নববি আদর্শ অনুসরণই একটি সুখী, স্থিতিশীল ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের সর্বোত্তম পথ।

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের দিন আল্লাহ যেভাবে গুনাহগার বান্দার প্রতি রহম করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের দিন আল্লাহ যেভাবে গুনাহগার বান্দার প্রতি রহম করবেন
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয় আমি সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তিকে ভালোভাবে জানি। আর যে ব্যক্তি সর্বশেষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে, তাকেও জানি। কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে (আল্লাহর নিকট উপস্থিত করে) বলা হবে, এর সগিরা গুনাহগুলো উপস্থিত করো এবং কবিরা গুনাহগুলো গোপন করে রাখো। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি অমুক অমুক দিনে এই এই গুনাহ করেছ। তখন সে ব্যক্তি সবগুলো গোনাহের কথা স্বীকার করবে। একটিও অস্বীকার করবে না। তখন সে তার কবীরা গুনাহসমূহ সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। তার এই অবস্থা দেখে ঘোষণা দেয়া হবে যে, তার প্রতিটি মন্দ কাজের বিনিময়ে একটি করে নেকী লিপিবদ্ধ করো। তখন বান্দা খুশিতে বলে উঠবে যে, নিশ্চয় এখনো আমার অনেক গুনাহ বাকী আছে, যা আমি দেখতে পাচ্ছি না। এই হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু জর (রা.) বলেন, তখন আমি দেখলাম, রাসুলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসছেন; এমনকি তাঁর সাদা দাতগুলো দেখা যাচ্ছিল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১৪৩০, সিলসিলায়ে সহিহাহ, হাদিস : ৩০৫২)

শিক্ষা ও বিধান 
১. আল্লাহর রহমত অত্যন্ত ব্যাপক। তাই আল্লাহ তাআলা চাইলে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে সেগুলোর পরিবর্তে নেকি দান করতে পারেন। তাই কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়।
২. সগিরা ও কবিরা গুনাহের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইসলামে গুনাহ দুই প্রকার—সগিরা (ছোট) ও কবিরা (বড়)। উভয় থেকেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
৩. কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমলের হিসাব দিতে হবে। দুনিয়ার কোনো কাজই আল্লাহর কাছে গোপন নয়। সবকিছুর হিসাব নেওয়া হবে।
৪. সত্য গোপন করার সুযোগ থাকবে না। আল্লাহর সামনে মানুষ নিজের গুনাহ স্বীকার করতে বাধ্য হবে। সেখানে মিথ্যা বলা বা অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকবে না।
৫. আল্লাহ বান্দার সম্মান রক্ষা করেন। এই হাদিসে কবিরা গুনাহ গোপন রাখার কথা এসেছে, যা আল্লাহর অসীম দয়া ও বান্দার প্রতি তাঁর পর্দা রাখার গুণের পরিচয় বহন করে।
৬. তাওবা ও ঈমানের মূল্য অপরিসীম। যিনি শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবেন, তিনি ঈমানদার ছিলেন। এতে বোঝা যায়, ঈমান ও আন্তরিক তাওবার গুরুত্ব অনেক।
৭. মুমিনের মধ্যে আশা ও ভয়—দুটিই থাকা উচিত। গুনাহের জন্য ভয় থাকবে, আবার আল্লাহর ক্ষমার প্রতি দৃঢ় আশাও থাকবে। এটাই ভারসাম্যপূর্ণ ঈমানের পরিচয়।

সারকথা, এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ তাআলার রহমত সীমাহীন। তাই গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত আন্তরিক তাওবা করতে হবে, নেক আমলে অটল থাকতে হবে এবং কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। একই সঙ্গে গুনাহকে হালকা মনে না করে সর্বদা হিসাবের দিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন।

বৃদ্ধ বয়সে প্রশস্ত রিজিকের জন্য পঠিতব্য দোয়া

মুফতি ওমর বিন নাছির
বৃদ্ধ বয়সে প্রশস্ত রিজিকের জন্য পঠিতব্য দোয়া
সংগৃহীত ছবি

জীবনের শুরুতে মানুষ শক্তি, সামর্থ্য ও কর্মক্ষমতার ওপর ভর করে জীবিকা অর্জন করে। কিন্তু বয়স যখন বাড়তে থাকে, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং উপার্জনের পথও অনেক সময় সংকুচিত হয়ে আসে। এমন সময় একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় ভরসা হন মহান আল্লাহ। কারণ তিনিই রাজ্জাক (সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা)। তাই বৃদ্ধ বয়সেও যেন অভাব, অসহায়ত্ব বা মানুষের মুখাপেক্ষী হতে না হয়, সে জন্য আল্লাহর কাছে প্রশস্ত ও বরকতময় রিজিকের প্রার্থনা করা উচিত। তেমনি একটি দোয়া হলো, 

 اَللّٰهُمَّ اجْعَلْ أَوْسَعَ رِزْقِكَ عَلَيَّ عِنْدَ كِبَرِ سِنِّيْ , وَانْقِطَاعِ عُمُرِيْ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাজ আল আওসাআ রিজক্বিকা আলাইয়া ইনদা কিবারি সিন্নি, ওয়ানক্বিত্বাই উমুরি।

অর্থ : হে আল্লাহ ! আপনার দেওয়া রিজককে আমার বৃদ্ধ বয়সে এবং জীবনের সমাপ্তি পর্যন্ত প্রশস্ত করে দিন। (তররানি শরিফ, হাদিস : ৩৬১১)

অহংকারী ব্যক্তি চেনার ১০ উপায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অহংকারী ব্যক্তি চেনার ১০ উপায়
সংগৃহীত ছবি

আরবি ভাষায় ‘কিবর’, ‘তাকাব্বুর’ ও ‘ইস্তিকবার’ শব্দগুলো কাছাকাছি অর্থ বহন করে। যার অর্থ অহংকার করা। ইমাম রাগিব আল-আসবাহানি বলেন, ‘কিবর বা অহংকার হলো এমন একটি অবস্থা, যার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রতি মুগ্ধ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ সে নিজেকে অন্যদের তুলনায় বড় ও শ্রেষ্ঠ মনে করে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ অহংকার হলো আল্লাহর প্রতি অহংকার করা অর্থাৎ সত্য গ্রহণ করতে অস্বীকার করা এবং তাঁর ইবাদতের কাছে আত্মসমর্পণ না করা।’ (গারিবুল কোরআন, পৃষ্ঠা : ৪২১)

ইস্তিকবার বা অহংকার প্রকাশ দুই ধরনের হতে পারে—

১. নিজেকে বড় করার চেষ্টা করা, যখন তা যথাযথ স্থান, সময় ও অবস্থার মধ্যে হয়, তখন তা প্রশংসনীয় হতে পারে।

২. নিজের মধ্যে যা নেই, তা আছে বলে প্রকাশ করা অর্থাৎ মিথ্যা বড়ত্ব দেখানো।

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘সব নিন্দনীয় চরিত্রের মূল হলো অহংকার, হীনতা ও নীচতা। আর সব প্রশংসনীয় চরিত্রের মূল হলো বিনয় ও উচ্চ আকাঙ্ক্ষা। গর্ব, ঔদ্ধত্য, আত্মপ্রশংসা, হিংসা, সীমা লঙ্ঘন, অহংকারপূর্ণ আচরণ, জুলুম, কঠোরতা, দাম্ভিকতা, উপদেশ গ্রহণে অনীহা, নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, মর্যাদা ও নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, যা করেনি তার জন্য প্রশংসা কামনা করা—এ সবই অহংকার থেকে জন্ম নেয়।’ (আল-ফাওয়ায়িদ, পৃষ্ঠা : ১৪৩)

অহংকারের বিভিন্ন রূপ
অহংকারের অনেক রূপ আছে, যার সব গণনা করা কঠিন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১. সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা : সত্য জেনে তা গ্রহণ না করা অহংকারের অন্যতম বড় নিদর্শন। আল্লাহ বলেন, ‘তারা তা অস্বীকার করল, যদিও তাদের অন্তর তা নিশ্চিতভাবে জানত—অন্যায় ও অহংকারবশত।’ (সুরা : আন-নামল, আয়াত : ১৪)

২. মানুষের প্রাপ্ত নিয়ামতের প্রতি হিংসা করা : মহান আল্লাহ কাকে কোন নিয়ামত দান করবেন, এটা সম্পূর্ণ তাঁর এখতিয়ারাধীন। তবু মানুষ অন্যের প্রাপ্ত নিয়ামত নিয়ে হিংসা করে, যেভাবে ইবলিস আদম (আ.)-এর প্রতি হিংসা করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো, তখন সবাই সিজদা করল, শুধু ইবলিস ছাড়া। সে অস্বীকার করল, অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ৩৪)

৩. প্রবৃত্তির কারণে সত্যের বিরোধিতা করা : আল্লাহ বলেন, ‘যখনই তোমাদের কাছে কোনো রাসুল এমন কিছু নিয়ে এসেছে যা তোমাদের মন চায়নি, তখনই তোমরা অহংকার করেছ। ফলে কাউকে মিথ্যা বলেছ এবং কাউকে হত্যা করেছ।’ (সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ৮৭)

৪. মিথ্যা, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা : সত্যের বিরোধিতা ও অহংকারের কারণে মানুষ এসব কাজে লিপ্ত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তারা পৃথিবীতে অহংকার ও মন্দ ষড়যন্ত্র করেছিল। অথচ মন্দ ষড়যন্ত্র তার মালিকদেরই ঘিরে ফেলে।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৪২-৪৩)

৫. শক্তি ও ক্ষমতার কারণে গর্ব করা : শক্তি ও ক্ষমতার কারণে গর্ব করা অন্যতম অহংকারমূলক কাজ। যেমন—আদ জাতি করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘আদ জাতি পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করেছিল এবং বলেছিল, আমাদের চেয়ে শক্তিশালী কে আছে?’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ১৫)

৬. দুর্বল মানুষকে অবহেলা ও পথভ্রষ্ট করা : আল্লাহ বলেন, ‘যারা অহংকার করেছিল তারা দুর্বলদের বলবে—আমরা কি তোমাদের হেদায়েত থেকে বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরাই অপরাধী ছিলে।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ৩২)

৭. নিজের আমল ও কর্ম নিয়ে অহংকার করা : নিজের কাজকে সব সময় সঠিক মনে করা অহংকারীর স্বভাব। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের বলা হবে—জাহান্নামের দরজায় প্রবেশ করো, সেখানে চিরকাল থাকবে। অহংকারীদের জন্য এটি কতই না নিকৃষ্ট আবাস!’ (সুরা : আন-নাহল, আয়াত : ২৯)

৮. জুলুম, অন্যায় ও ভ্রষ্টতার পথ অনুসরণ করা : আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার নিদর্শন থেকে তাদের ফিরিয়ে রাখব, যারা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করে।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৪৬)

৯. চলাফেরা ও বেশভূষায় অহংকার প্রকাশ করা : আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে দম্ভভরে বিচরণ কোরো না। তুমি কখনো জমিন বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং পাহাড়ের সমান উচ্চতাও অর্জন করতে পারবে না।’ (সুরা : আল-ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৭)

১০. পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য কামনা করা : আল্লাহ বলেন, ‘এ আখিরাতের আবাস আমি তাদের জন্য নির্ধারণ করি, যারা পৃথিবীতে বড়ত্ব ও বিশৃঙ্খলা কামনা করে না।’ (সুরা : আল-কাসাস, আয়াত : ৮৩)

আরেকটি হলো নিজের সম্মানে দাঁড়িয়ে থাকা পছন্দ করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে মানুষ তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, সে যেন জাহান্নামে নিজের আসন প্রস্তুত করে নেয়।’ (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল আদব, হাদিস : ৫২২৯)

অহংকারী ব্যক্তি চেনার আরো কিছু উপায়
ঘরের বাইরে, বিশেষ করে বাজারে বা জনসমক্ষে একা চলতে অপছন্দ করা; বরং নিজের সঙ্গে লোকজনকে অনুসারী হিসেবে রাখতে চাওয়া।
অন্যদের বাড়িতে যেতে অপছন্দ করা, বিশেষ করে নিজের সমমানের লোকদের।
অন্য কেউ নিজের পাশে বসলে অস্বস্তি বোধ করা, যেন মর্যাদা সমান হয়ে যাবে।
অসুস্থ ও দুর্বল মানুষের সঙ্গে বসতে অপছন্দ করা (সংক্রমণের ভয় ছাড়া শুধু মর্যাদার কারণে)।
ঘরের কোনো কাজ নিজ হাতে করতে অপছন্দ করা।
নিজের জিনিসপত্র নিজে বহন করতে লজ্জাবোধ করা।
সাধারণ বা নিম্ন মানের পোশাক পরতে অপছন্দ করা।
গরিব মানুষের দাওয়াত গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করা।
আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের প্রয়োজনীয় ছোটখাটো কাজ বাজার থেকে করে দিতে অপছন্দ করা।
সমবয়সী বা সমপর্যায়ের কেউ আগে হাঁটলে বা আগে বসলে কষ্ট পাওয়া।
বিতর্কে সত্য প্রকাশ পাওয়ার পরও তা গ্রহণ না করা, যাতে মানুষ তাকে কম জ্ঞানী মনে না করে।
নিজের ভুল জানা সত্ত্বেও তা স্বীকার না করা এবং যে ব্যক্তি তাকে ভুল দেখিয়ে দিয়েছে তাকে ধন্যবাদ না দেওয়া। 

সারকথা হলো, অহংকার হলো নিজের বড়ত্বের মিথ্যা অনুভূতি, যা মানুষকে সত্য গ্রহণ, বিনয় ও আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো আল্লাহ ও সত্যের প্রতি অহংকার করা। আর এর প্রতিকার হলো বিনয়, সত্য গ্রহণ, নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি এবং আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করা।