ইউক্রেনের পাল্টা হামলায় রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি তেল শোধনাগারও রয়েছে বলে জানা গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোর ওপর এটিকে অন্যতম বড় ইউক্রেনীয় হামলা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এই হামলার আগে ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার ব্যাপক আক্রমণে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২২ সালের এপ্রিলের পর সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনে রুশ হামলায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়ার হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হন। দেশটির ছয়টি অঞ্চলে একদিনেই এসব হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম।
এদিকে রাশিয়া রাজধানী কিয়েভের একটি ঐতিহাসিক মঠ কমপ্লেক্সেও হামলা চালিয়েছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এই স্থাপনাটি ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নিদর্শন। রুশ হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার মস্কোকে লক্ষ্য করে বড় আকারের ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে একটি তেল শোধনাগারও ছিল। ইউক্রেনের দাবি, এসব স্থাপনা রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রাজধানীর দিকে আসার সময় প্রায় ১৮০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে রুশ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে কিছু ড্রোন বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হেনেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এর আগে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক বার্তায় বলেন, 'ইউক্রেনের মানুষ এই যুদ্ধ চায় না। তারা কখনোই তা চায়নি। কিন্তু যদি ইউক্রেন পুড়ে যায়, তাহলে তোমাদের মস্কোও পুড়বে।'
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের ওপর রাশিয়া যে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে, তার জবাব হিসেবে ইউক্রেন মস্কোতে ড্রোন হামলা করেছে। তার মতে, এটি প্রতিশোধমূলক বা অযৌক্তিক কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং রাশিয়ার হামলারই পাল্টা প্রতিক্রিয়া। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইউক্রেন শুধু সাধারণ লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং রাশিয়াকে যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তাকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করছে। মস্কোর তেল শোধনাগারের মতো স্থাপনায় হামলাকে তিনি ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইউক্রেন শুধু নিজেদের রক্ষাই করছে না, বরং রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতাকেও দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে প্রায় ১৬ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে যুদ্ধে দুই পক্ষের কত সেনা নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধ তিন বছরের বেশি সময় ধরে চললেও এখনো সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না।
ইউক্রেনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন (এইচআরএমএমইউ) চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানায়, এই বছরের মে মাস গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ছিল। ওই মাসে রুশ হামলায় ২৭৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। আহত হন আরো এক হাজার ৭৬৩ জন।
এদিকে রাশিয়ার ভেতরেও ইউক্রেনীয় হামলার ঘটনা ঘটছে। চলতি সপ্তাহে রুশ গণমাধ্যম জানায়, বেলারুশের একটি কিশোর ফুটবল দলকে বহনকারী একটি বাসে ইউক্রেনের হামলায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, ইউক্রেনের হামলার জবাবে রাশিয়া নিয়মিতভাবে বড় আকারের সম্মিলিত হামলা চালাবে। এর আগে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ইউক্রেনকে নতুন করে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। শুক্রবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস জানান, ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়া হবে। এর ফলে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের জন্য অস্ট্রেলিয়ার মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ১৮০ কোটি ডলারে। মার্লেস বলেন, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার করতে ইউক্রেনের যে ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, অস্ট্রেলিয়া সেই সহায়তা অব্যাহত রাখবে।




