পাশাপাশি দুইটি বিদ্যালয়। একটি প্রাথমিক অপরটি উচ্চ বিদ্যালয়। প্রাথমিকের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পরিত্যক্ত। তাই পাশের উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত তবে কম ঝুঁকিপূর্ণ টিনশেড ঘরটি শিশু শিক্ষার্থীদের ভরসা। সেখানে নেই আলাদা শ্রেণিকক্ষ। বসার বেঞ্চ নেই। ছোট্ট শিক্ষার্থীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেঝেতে বসে মাথা নিচু করে পড়ছে, লিখছে।
এমন অবস্থা কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ৫২ নম্বর বারুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
বুধবার (১ জুলাই) বিকেলে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, টিনের বেড়া দেওয়া ছোট্ট কক্ষের মেঝেতে বসে পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বই-খাতা মেঝেতে রেখেই লিখতে হচ্ছে শিশুদের।
বিদ্যালয়টির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে বসে লেখাপড়া করায় শিক্ষার্থীদের মাথাব্যথা হয়; ঘাড় ও কোমরে ব্যথা হয়।। এতে তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। অভিভাবকরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বারুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের একটি ভবনের দেয়ালে দেখা দেয় বড় বড় ফাটল। ছাদের পলেস্তরা খসে খসে পড়ছে। শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কয়েক বছর আগে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে উপজেলা শিক্ষা বিভাগ।
সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত নতুন ভবন নির্মাণ বা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে শ্রেণিকক্ষের সংকট দেখা দেয়। পরে বাধ্য হয়ে পাশের বারুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত একটি টিনশেড ঘরে টিনের বেড়া দিয়ে তিনটি শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা হয়। সেখানকার মেঝেতে বসে পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা সেখানে নেই প্রয়োজনীয় বেঞ্চ-টেবিল কিংবা শিশুদের উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ; নেই বৈদ্যুতিক সংযোগও।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার ও তাসলিমা আক্তার জানায়, প্রতিদিন মেঝের ধুলোবালিতে বসে ক্লাস করতে তাদের খুব কষ্ট হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নিচু হয়ে লিখতে গিয়ে ঘাড় ও কোমরে ব্যথা হয়। তাদের ভাষ্য, ‘বর্ষাকালে টিনশেড কক্ষে বৃষ্টির পানি পড়ে। গরমে টিনের তাপে বসে পড়া লেখা করা যায় না। অন্যসব স্কুলে নতুন ভবন আছে, আমাদের নেই। আমরা নতুন ভবন চাই।’
আনোয়ার হোসেন নামের এক অভিভাবক কালের কণ্ঠকে বলেন, শিশুরা পড়তে এসে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও এই স্কুলটি ভিন্ন। এই সময় এসেও আমাদের সন্তানদের মেঝেতে বসে লেখাপড়া করতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এটা শুধু কষ্টের নয়, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্যও ক্ষতিকর। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় বেঞ্চ-টেবিল সরবরাহের দাবি জানাচ্ছি।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শিমুল চন্দ্র সূত্রধর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওরা (শিক্ষার্থী) যখন মেঝে বসে লেখে, ওদের চেহারার দিকে তাকানো যায় না। ওরা বিভিন্ন সময় এসে বলে স্যার ঘাড় ব্যথা করে, কোমর ব্যথা করে। কিন্তু কী করব। ওদের কী বলব। দীর্ঘ সময় মাথা ঝুঁকে বসে লেখা কষ্ট। পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন করা হলে শিক্ষার্থীদের কষ্ট দূর হবে।’
প্রধান শিক্ষক রেহেনা আক্তার বলেন, বিদ্যালয়ের একটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কয়েক বছর আগে এটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে পাশের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের টিনশেড ভবনে পাঠদান করা হচ্ছে। এই টিনসেড ঘরটিও পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়েছিল।
প্রধান শিক্ষক জানান, ঘরটিতে বেঞ্চ টেবিল কিছুই নেই। বাধ্য হয়ে শিশুদের মেঝেতে বসেই পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে মাথা নিচু করে লেখায় অনেক শিক্ষার্থীর ঘাড়ে ব্যথার সমস্যা হয়েছে। পড়ালেখা করতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিশুরা। আমাদের আর কোনো উপায়ও নেই।
দেবিদ্বার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, উপজেলার ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বারুর বিদ্যালয়ের একটি ভবনও পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বরাদ্দের জন্য চিঠি দেওয়া আছে।
বিদ্যালয়ের শিশুদের দুর্ভোগ প্রসঙ্গে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘বারুর বিদ্যালয়ে শিশুরা মেঝেতে বসে ক্লাস করছে- বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি। জানালে একটা ব্যবস্থা করতাম। এর পরও আমি যেহেতেু এখন জেনেছি, ব্যবস্থা নেব।’