• ই-পেপার

ভ্রমণের ভিডিও ইন্টারনেটে আপলোড করার হুকুম : ইসলাম কী বলে?

হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত
সংগৃহীত ছবি

দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি মহান ইবাদতও বটে। মানুষের জীবন, সম্পদ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত থাকেন, ইসলাম তাদের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ মর্যাদা ও বিরাট সওয়াবের সুসংবাদ। ইসলামী পরিভাষায় সীমান্ত ও জনপদ রক্ষার উদ্দেশ্যে শত্রুর অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে থাকাকে বলা হয় ‘রিবাত’। কোরআন ও হাদিসে এই আমলের এমনসব ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ।

কোরআনে সীমান্ত পাহারায় সতর্ক থাকার নির্দেশ
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, সীমান্তে ও প্রহরায় নিয়োজিত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ২০০)

মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, এ আয়াতে মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘রাবিতু’ শব্দটি সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে।

এক দিনের সীমান্ত পাহারা দুনিয়ার সব কিছুর চেয়েও উত্তম
সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯২)
দুনিয়ার বিপুল সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনা করেও সীমান্ত পাহারার প্রকৃত মর্যাদা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হাদিসটি এই মহান আমলের অসাধারণ ফজিলত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং এক মাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আত্মনিবেদিত দায়িত্ব পালন অনেক সময় দীর্ঘ নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াবের কারণ হতে পারে।

মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না সওয়াব
একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে তার আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকবে, তার জন্য রিজিক প্রবাহিত হতে থাকবে এবং সে কবরের পরীক্ষার ভয় থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
সাধারণত মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখেন।

যে রাত কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন এক রাতের কথা বলব না, যা কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ? সে হলো ওই প্রহরীর রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে হয়তো সে তার পরিবারের কাছে জীবিত ফিরে যেতে পারবে না।’ (আল মুসতাদরাক আলা আসসহিহাইন, হাদিস : ২৪২৪, তারগিব ওয়াত তারহিব : ১২৩২)

এ হাদিস সীমান্তরক্ষীদের আত্মত্যাগ, ঝুঁকি ও আন্তরিকতার উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরে।

যে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়; দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৯)
এ হাদিসে সীমান্ত ও জনপদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।


একটি রাতের প্রহরায় জান্নাতের সুসংবাদ
হুনাইনের যুদ্ধের রাতে সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সারা রাত ঘোড়ার পিঠে থেকে প্রহরা দেন এবং নামাজ ও প্রয়োজন ছাড়া একবারও দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেননি। পরদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি নিজের জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫০১)
এ সুসংবাদ তার নিষ্ঠা, সতর্কতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্ব পালনের ফলস্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল।

জান্নাতের সুসংবাদ যাদের জন্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুসংবাদ ওই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথে সদা প্রস্তুত থাকে। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে।’ (বুখারি ২৮৮৭)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষা
বর্তমান সময়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। যদি তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি, দেশ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়তে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত এসব ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে সীমান্ত পাহারা ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহান ইবাদত। এক দিনের প্রহরা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান, এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, এমনকি এর সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। যারা দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে দায়িত্ব পালন করেন, তারা নিঃসন্দেহে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।

ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের ইবাদতকে নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা, সমাজের স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য নিবেদিত দায়িত্বশীল কাজকেও মহান সওয়াবের উৎস হিসেবে গণ্য করেছে। সীমান্ত পাহারা তারই একটি উজ্জ্বল ও অনন্য উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী সব সদস্যের খেদমত কবুল করুন, তাদের হেফাজত করুন এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।

হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাসিম অ্যাওয়ার্ড জিতল সৌদির এসডিএআইএ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হাজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাসিম অ্যাওয়ার্ড জিতল সৌদির এসডিএআইএ
সংগৃহীত ছবি

হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জনসমাগম ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে সৌদি ডেটা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অথরিটি  (SDAIA) মর্যাদাপূর্ণ ‘কাসিম অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি’ অর্জন করেছে। ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণায় শ্রেষ্ঠত্ব’ বিভাগে পাওয়া এই সম্মাননা সৌদি আরবের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে সৌদি আরবকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে যেতে এসডিএআইএ দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং জাতীয় প্রতিভা বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় জনসমাগম ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি শনাক্তকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে পরিচালিত একটি ফলিত গবেষণা প্রকল্প এবার তাদের জন্য এনে দিয়েছে এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।

কাসিম গভর্নরেটের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কাসিম অঞ্চলের গভর্নর ও যুবরাজ ড. ফয়সাল বিন মিশাল বিন সৌদ বিন আব্দুল আজিজ এসডিএআইএ-এর ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (NCAI) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাত্তাম আল-সুবাইয়ের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেন।

পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল জনসমাগমের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা। বিশেষ করে হজ ও ওমরাহ মৌসুমে লাখো হাজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসডিএআইএর গবেষকরা এ প্রকল্পে ‘ভেলোসিটিনেট’  (VelocityNet) এবং ‘অ্যাটেনশন ইনভার্স’ (Attention Inverse)-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এসব প্রযুক্তি ভিড়ের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে অস্বাভাবিক আচরণ বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত অত্যন্ত নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। ফলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, জননিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং জরুরি সেবার কার্যকারিতা উন্নত করা সহজ হয়েছে।

গবেষণাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও উল্লেখযোগ্য। এ প্রকল্পের ফলাফল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক সম্মেলন  ICCV, ICML I ArabicNLP-এ উপস্থাপিত ও প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি গবেষকরা নতুন মানসম্পন্ন ডেটা বেইসও তৈরি করেছেন, যা ভবিষ্যতে ক্রাউড অ্যানালিটিকস বা জনসমাগম বিশ্লেষণভিত্তিক গবেষণার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে সৌদি আরব যে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, এসডিএআইএর এই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও সম্মাননা তারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

ওআইসির কার্যক্রম গতিশীল করতে আরব-ইরাক বৈঠক

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ওআইসির কার্যক্রম গতিশীল করতে আরব-ইরাক বৈঠক
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কার্যক্রমকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে সৌদি আরব ও ইরাকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সংস্থার আওতায় যৌথ ইসলামী কার্যক্রমের উন্নয়ন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ওআইসির ভূমিকা আরো শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

ওআইসিতে সৌদি আরবের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. সালেহ বিন হামাদ আল-সুহাইবানি জেদ্দায় অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে ওআইসিতে ইরাকের নবনিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি ও জেদ্দায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল রাষ্ট্রদূত মাওলুদ আহমেদ আল-মাশহাদানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রতি রাষ্ট্রদূত আল-মাশহাদানি ওআইসিতে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করেছেন।

সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয় পক্ষ ওআইসির কাঠামোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও পরামর্শ প্রক্রিয়া আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং সংস্থার বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।

বৈঠকে আলোচকরা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ওআইসির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্ব্বিত উদ্যোগ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আরো শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। তারা যৌথ ইসলামী কার্যক্রমের বিকাশ, সংস্থার সেবার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওআইসির নেতৃত্বপূর্ণ অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণ ও বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেন।

উল্লেখ্য, বর্তমানে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ৫২তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করছে ইরাক। এ প্রেক্ষাপটে জেদ্দায় অনুষ্ঠিত সৌদি আরব-ইরাকের এই বৈঠককে সংস্থার কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসলামে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালনের গুরুত্ব

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
ইসলামে দায়িত্ববোধ ও কর্তব্য পালনের গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

একজন সৎ মানুষের জীবনের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হলো দায়িত্ববোধ। সভ্যতার অগ্রগতি, রাষ্ট্র/প্রতিষ্ঠানের সাফল্য এবং পারস্পরিক আস্থার মূলেও এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

ইসলাম প্রত্যেক মানুষকেই দায়িত্বশীল আচরণের উৎসাহ দেয়। একজন মুমিনের জন্য তার ঈমানের মৌলিক দায়িত্ব পালন করা যেমন জরুরি, তেমনি তার পারিবারিক দায়িত্ব, পেশাদারি দায়িত্ব ও (নাগরিক/নেতা বা কর্মকর্তা হিসেবে) রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করাও জরুরি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সমাজে এমন একটি প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে যে কেউ কেউ সুযোগ পেলেই দায়িত্বে অবহেলা করে, কর্তব্য পালনে শৈথিল্য দেখায়; আবার বিভিন্ন কৌশল, অজুহাত বা চাতুর্যের মাধ্যমে নিজেদের প্রাপ্য কিংবা অপ্রাপ্য সুবিধাও ভোগ করে নেয়। বাহ্যিকভাবে তারা সফল মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি নৈতিক অবক্ষয় এবং আমানতের খিয়ানতের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম দায়িত্বকে শুধু প্রশাসনিক বা সামাজিক বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং এটিকে একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তাদের হকদারের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

প্রতিটি দায়িত্বই একেকটি আমানত। সেই আমানতের যথাযথ হক আদায় না করে শুধু সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, ‘আর যারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকারের ব্যাপারে যত্নশীল।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৮)

বর্তমান সমাজে এমন অনেক মানুষকে দেখা যায়, যারা দায়িত্ব পালনে উদাসীন; কিন্তু মূল্যায়ন, সুযোগ-সুবিধা, পদোন্নতি কিংবা সম্মান অর্জনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই মানসিকতা ন্যায়বিচার ও তাকওয়ার পরিপন্থী।

এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা তাদের কৃতকর্মের প্রতি খুশি হয় এবং যা তারা করেনি তা নিয়ে প্রশংসিত হতে পছন্দ করে, তুমি তাদেরকে শাস্তি থেকে মুক্ত মনে কোরো না। আর তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৮)

আলোচ্য আয়াতে এমন লোকদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা ঘোষিত হয়েছে, যারা শুধু তাদের বাস্তব কৃতিত্ব নিয়েই খুশি নয়, বরং তারা চায় যে তাদের খাতায় এমন কৃতিত্বও লেখা হোক বা প্রকাশ করা হোক, যা তারা করেনি। এই রোগ যেরূপ রাসুল (সা.)-এর যুগে ছিল এবং যার কারণে আয়াত নাজিল হয়, অনুরূপ বর্তমানেও পদাভিলাষী ও যশান্বেষী  প্রকৃতির মানুষের মধ্যে এবং প্রোপাগান্ডা ও আরো বিভিন্ন চালাকি ও চাতুর্যের মাধ্যমে নেতৃত্ব লাভকারী বা বসের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণকারীদের মধ্যেও ব্যাপক হারে এ রোগ পাওয়া যায়।

তবে যারা প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বশীল ব্যক্তি, যাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ আছে, তারাই কৃতিত্বের আসল হকদার। মহান আল্লাহ যাদের কর্তৃত্ব দিয়েছেন, তাদের উচিত প্রকৃত দায়িত্ববোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে তাদের হক বুঝিয়ে দেওয়া। কারণ কিয়ামতের দিন যার যার পরিধি অনুযায়ী প্রত্যেক দায়িত্বশীলকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাব দিতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন,  ‘তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং সবাইকে তোমাদের ওপর দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে দায়িত্ব পালন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র বা বিশ্ব, সব পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা তাদের দায়িত্বের পরিধি অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ফলে নিজে যেমন দায়িত্ববোধ এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই, তেমনি কোনো দায়িত্বহীন ব্যক্তিকেও অন্যায়ভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে সব ভুল, বিলম্ব বা দুর্বলতাকে দায়িত্বে অবহেলা বলা যায় না। মানুষ সীমাবদ্ধ, তার সামর্থ্য ও পরিস্থিতিরও সীমা আছে। কখনো অসুস্থতা, অপ্রত্যাশিত সংকট, দক্ষতার ঘাটতি বা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে দায়িত্বে ত্রুটি হতে পারে। ইসলাম ইচ্ছাকৃত গাফিলতি ও অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য রেখেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব প্রদান করেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৬)

কিন্তু যখন কেউ সচেতনভাবে চালাকি করে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, অথচ সুবিধা গ্রহণে কৌশলী হয়ে ওঠে, তখন তা নৈতিক সংকটে রূপ নেয়। এমন ব্যক্তি হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থা হারায়। সমাজে মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। একবার সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে বাহ্যিক সাফল্যও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

কারো পক্ষেই শতভাগ নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আন্তরিকতা, জবাবদিহি, আত্মসমালোচনা এবং দায়িত্ব পালনের চেষ্টা একজন মানুষকে আল্লাহর কাছে সম্মানিত করে। পক্ষান্তরে দায়িত্বে গাফিলতি করে চাতুর্যের মাধ্যমে সুবিধাভোগ করা সাময়িক লাভ দিলেও তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। মহান আল্লাহ সবাইকে তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতা দান করুন। আমিন।