লাল-সাদা চিরচেনা সমারোহে সাজানো শাড়ি-পাঞ্জাবি পরা মানুষের ঢল নামবে পহেলা বৈশাখে। গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় আয়োজন, পার্ক-উদ্যানে চলছে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাংলা নববর্ষের স্বতঃস্ফূর্ত উদযাপন এখন নগর পেরিয়ে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবছর এই উৎসব ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হয় এবং গ্রাম ও শহর—উভয় অর্থনীতিতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এই উৎসব শুধু সাংস্কৃতিক আনন্দ নয়; এটি দেশের অর্থনীতির এক বড় চালিকাশক্তি। হালখাতা থেকে পোশাক, বৈশাখী ভাতা থেকে মেলা—সব মিলিয়ে বৈশাখ ঘিরে দেশের বাজারে সঞ্চরণ করছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বৈশাখ ঘিরে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের হাতবদল হয়। উৎসবের রং যেন অর্থনীতির চিত্র আরো উজ্জ্বল করে তুলছে।

ছবি : শেখ হাসান
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপে ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা কমলেও রাজধানীসহ সারা দেশের বিপণিবিতান, মার্কেট, শপিং মল থেকে ফুটপাতে বিকিকিনি হচ্ছে বৈশাখের সামগ্রী ও রকমারি পোশাক। আকর্ষণীয় অফারে গ্রাহকদের টানছে দোকানগুলো।
তবে জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধের যে নির্দেশ দিয়েছে, তাতে বৈশাখী বাজারে বিক্রি আশানুরূপ না হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলালউদ্দিন বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। দোকানিদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। সামনে পহেলা বৈশাখ। এই সময়ে শপিং মল ও মার্কেটগুলো ব্যবসা করতে না পারলে প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হবে।’ ব্যবসায়ীরা অন্তত রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন।
ঐতিহ্যের হালখাতা
পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে পুরনো ও ব্যাপক আয়োজন হালখাতা। দেশের বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র দোকানি ও ব্যবসায়ীরা নতুন খাতা খুলে পুরনো হিসাব চুকিয়ে দেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট দোকান ও খুচরা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি। প্রতিটি দোকানে হালখাতা উপলক্ষে গড় খরচ ধরা হয় ১০ হাজার টাকা। তবে শুধু খাতা কেনা নয়, এর সঙ্গে মিষ্টি বিতরণ, গ্রাহকদের জন্য ছাড়, কর্মচারীদের উপহার ইত্যাদি যুক্ত হয়। তাই দেশের অর্থনীতিতে হালখাতা ঘিরে মোট লেনদেন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বৈশাখী পোশাক
বুটিক হাউস ও ব্র্যান্ডগুলোর জন্য পহেলা বৈশাখ ছিল কেনাবেচার দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বৈশাখ ঘিরে বুটিক হাউস ও ব্র্যান্ডেড পোশাকের দোকানে বিশেষ আয়োজনের প্রচলন শুরু হয় প্রায় দুই দশক আগে। ধীরে ধীরে সেটির পরিধি বাড়তে থাকে।
সারা দেশে পুরুষ, নারী ও শিশুদের পোশাকের দোকান রয়েছে ২৫ লাখের বেশি। সাধারণ দিনে এসব দোকানে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়। কিন্তু পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই বিক্রি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। কেরানীগঞ্জ, ইসলামপুর, নবাবপুরের পাইকারি মার্কেট থেকে শুরু করে রাজধানীর বিভিন্ন সুপারমার্কেট, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, কাটাবন, এলিফ্যান্ট রোড, গুলশান, মিরপুর, উত্তরা—সব জায়গায় বাহারি রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, জামদানি, তাঁত ও সিল্কের সমারোহ। ঢাকার অনেক প্রতিষ্ঠান ছাড়ের অফার দিয়ে গ্রাহক টানছে।
দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগঠন ফ্যাশন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ঈদসহ সারা বছর দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোতে যে পরিমাণ পোশাক বিক্রি হয়, তার ৩০-৫০ শতাংশ বিক্রি হয় পহেলা বৈশাখ ঘিরে।
দেশীয় পোশাক ব্র্যান্ড অঞ্জন’স-এর প্রধান নির্বাহী শাহীন আহম্মেদ বলেন, ‘বৈশাখ উপলক্ষে ক্রেতার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফ্যাশন হাউসগুলোর আউটলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মোট বিক্রিও বাড়ছে।’ আড়ং, লা রিভ, ইয়েলোসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডও ঐতিহ্যবাহী জামদানি, সিল্ক ও হস্তশিল্পভিত্তিক ডিজাইনে সাড়া পাচ্ছে।

ছবি : শেখ হাসান
বোনাস ও বৈশাখী ভাতা
চাকরিজীবীদের বেতন ও বোনাস উৎসবের বাজার চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা রাখে। এ বছর কর্মজীবী মানুষেরা বোনাস বাবদ তুলেছেন ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে যায় বাজারে—পোশাক, খাদ্য, ভ্রমণ, উপহারসামগ্রী কেনায়।
সরকারের ২০১৬ সালে চালু করা বৈশাখী ভাতা এবারও যুক্ত হয়েছে উৎসবের অর্থনীতিতে। দেশের সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বৈশাখী ভাতা পান। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এই ভাতা চালু করেছে। এই অতিরিক্ত অর্থ গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে গেছে, যা কেনাকাটার গতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুরান ঢাকার মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী রহমান মিয়া বলেন, ‘চিনি, দুধ, ঘির দাম কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হাতে টাকা আসায় নকশি পিঠা, কদমা, পায়েসের বিক্রি ভালো। পাড়া-মহল্লার অনুষ্ঠান ও মেলায় চাহিদা বাড়ছে।’
পহেলা বৈশাখের দিন মিষ্টির বিক্রি বেশি হয়। পুরান ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী এখনো হালখাতা উৎসব করে বছর শুরু করেন। মিষ্টি-নিমকি দিয়ে ক্রেতা ও বন্ধুবান্ধবকে আপ্যায়ন করার ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। সব মিলিয়ে মিষ্টির ব্যবসা বেশ ভালোই চলে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য
বৈশাখের অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে গ্রামীণ মেলা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। রাজধানী থেকে গ্রামবাংলার আনাচকানাচে বিস্তৃত এই মেলা। হস্তশিল্প, গয়না, বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রী, তাঁতবস্ত্র—সবকিছুর বিক্রি চাঙ্গা। রাজশাহীর পিঠা কারিগর নূরজাহান বেগম জানান, স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি পিঠা নিয়ে এবার মেলায় দারুণ সাড়া পাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘শহরের ফ্যাশনের চেয়ে গ্রামের মানুষ সরল আয়োজনেই খুশি। আমাদের বিক্রি গতবারের চেয়ে বেশি।’ গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এসব মেলা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হস্তশিল্প ও কারুশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিলে বৈশাখী অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।
পান্তা-ইলিশ
বৈশাখ এলে শহরে পান্তা-ইলিশের আয়োজন চোখে পড়ে। এবারও ইলিশের দাম কিছুটা বেশি—এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ৬০০ থেকে তিন হাজার টাকায়। বরিশাল ও চাঁদপুরের ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছরের তুলনায় দাম ২০-৩০ শতাংশ বেশি। মধ্যবিত্তের জন্য এটি কিছুটা মহার্ঘ হলেও উচ্চবিত্তের মধ্যে ও রেস্তোরাঁগুলোতে পান্তা-ইলিশের চাহিদা কমেনি। তবে গ্রামীণ এলাকায় ইলিশের পরিবর্তে স্থানীয় ছোট মাছ, শাক-সবজি ও পিঠা-পুলির চাহিদাই বেশি। শহর-গ্রামের এই ভিন্নতা সত্ত্বেও উৎসবের আমেজে ভাটা পড়েনি। বরং ঐতিহ্য ধরে রাখতে অনেকেই নিজেদের সাধ্যের মধ্যে বিকল্প আয়োজন করছেন।
বৈশাখ ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানের ফুল ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চাঙ্গা হয়। প্রতিদিন রাজধানীতে পাইকারি বাজারে ৩০-৩৫ লাখ টাকার ফুল কেনাবেচা হয়। সেই হিসাবে বৈশাখ ঘিরে ৬০-৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ফুল ব্যবসায়ী সমিতি।
স্থানীয় চাহিদাই ভরসা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশাখী অর্থনীতি মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদানির্ভর। উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা যেকোনো বাধা সত্ত্বেও চাহিদা ধরে রাখে। এ বছর হালখাতা, বোনাস ও বৈশাখী ভাতা মিলে বাজারে বাড়তি তারল্য এসেছে। ফ্যাশন হাউস ও ছোট ব্যবসায়ীরা এর সুফল পাচ্ছেন।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, ‘এবার বৈশাখের আয়োজন বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ উদ্যোক্তারা লাভবান হচ্ছেন। হস্তশিল্প ও কারুশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিলে বৈশাখী অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।’








