• ই-পেপার

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও জনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সহিংসতা

  • ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন উদ্যোগ : দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হচ্ছে

আবু তাহের খান

গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন উদ্যোগ : দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হচ্ছে

সরকার সম্প্রতি সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নিয়েছে। গভীর সমুদ্রের ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রের ১১টি মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লকের জন্য এ দরপত্র আহবান করা হয়েছে, যার দলিলাদি ক্রয়ের সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে গত ১ জুন থেকে। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২০২৫ সালেও একবার দরপত্র আহবান করা হয়েছিল। কিন্তু সাতটি বহুজাতিক কম্পানি তখন দরপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত কেউই তা জমা দেয়নি। কেন দেয়নি, তা সহজেই বোধগম্য। মব-শাসনের সেকালে সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত আগ্রহে বিশেষ সুবিধা ভোগকারী স্টারলিংক ছাড়া অন্য কোনো খাতের কোনো কম্পানিই তখন বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি এবং সেটি সম্ভবও ছিল না। আর সে কারণেই বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোও তখন দরপত্র জমাদানে বিরত থাকে। বিষয়টি মোটেও অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশে হলেও এ ধরনের পরিস্থিতিতে একইরূপ ঘটনাই ঘটত। কেননা চরম অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ একটি দেশে কোনো বিদেশি কম্পানিরই বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ দেখানোর কথা নয়।

তো গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে বিদেশি কম্পানিগুলোর এরূপ স্বাভাবিক অনাগ্রহকেই অস্বাভাবিক ধরে নিয়ে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে নাকি রক্ষা পাবে, সে বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই-গ্যাস অনুসন্ধানের নতুন উদ্যোগ : দেশের স্বার্থ কতটা রক্ষিত হচ্ছেবাছাই না করেই বিদেশি কম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এরই মধ্যে ঘোষিত দরপত্রের শর্তে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করে দিয়েছে। পেট্রোবাংলার যুক্তি অনুযায়ী এতে দরপত্রে বিদেশি কম্পানির অংশগ্রহণ বাড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন সরকারের মেয়াদ তিন মাস পেরোনোর আগেই বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই না করে এবং এ ধরনের একটি উচ্চ কারিগরি বিষয়ে ব্যাপকভিত্তিক বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ ছাড়াই তাড়াহুড়া করে এভাবে দরপত্র আহবান করাটা কি আদৌ সমীচীন হয়েছে? অভিজ্ঞ মহলের মতে, এর জবাব হচ্ছে ‘না’। সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সৃষ্ট বিরোধে এতদসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালত যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৪ সালে বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেওয়ার পর এক যুগ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই এক যুগেও যখন এ বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি, তখন বিশেষজ্ঞ অভিমত হচ্ছে, বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখা ও এ বিষয়ে অধিকতর মতামত গ্রহণের জন্য আরো চার-ছয় মাস বিলম্ব হলে তাতে মোটেও এমন বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত না। কিন্তু সেটি না করে তাড়াহুড়া করে সম্ভাব্য দরদাতা কম্পানির দেওয়া অগ্রিম শর্তে দরপত্র আহবান করার প্রেক্ষিতেই বরং দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এখন দেখা যাক, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী সম্ভাব্য বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোর পরামর্শ মেনে পেট্রোবাংলা তাদের দরপত্রে এমন কী কী শর্ত অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা দেশের স্বার্থকে ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এক. ২০১৯ সালের উৎপাদন-বণ্টন চুক্তিতে (পিএসসি) গভীর সমুদ্র থেকে আহরিত প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম যেখানে নির্ধারণ করা হয়েছিল সোয়া সাত মার্কিন ডলার, সেখানে বর্তমান পিএসসিতে তা করা হয়েছে ১১ মার্কিন ডলার—বৃদ্ধির হার ৫৪ শতাংশ। অন্যদিকে অগভীর সমুদ্র থেকে আহরিত প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের মূল্য পূর্বের ৫ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে বর্তমানে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। দুটি শর্তই প্রচণ্ডভাবে দেশের স্বার্থবিরোধী।

দুই. ২০২৩ সালের শ্রম আইনে কম্পানির মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক তহবিলে প্রদানের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেটি সংশোধন করে মাত্র দেড় শতাংশে নির্ধারণ করে। এবং দুর্ভাগ্য ও হতাশার বিষয় এই যে বর্তমান নির্বাচিত সরকারও চরম শ্রমিক স্বার্থবিরোধী ওই অধ্যাদেশটির ওপর জাতীয় সংসদে কোনো প্রকার আলাপ-আলোচনার সুযোগ না দিয়েই উত্থাপনের মাত্র ৬০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের ব্যবধানে গত ৯ এপ্রিল সংসদে সেটি পাস করে নেয়। আর নতুন শ্রমিক আইনে অন্তর্ভুক্ত এই বিধানটির কারণে এ অন্যায্য সুবিধাটি এখন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যুক্ত হতে যাওয়া বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোকেও প্রদান করতে হচ্ছে।

তিন. ২০১৯ সালের পিএসসিতে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট তেল-গ্যাস কম্পানির এবং উক্ত নির্মাণ, গ্যাসের মজুদ সংরক্ষণ, গ্যাস সরবরাহকরণ ইত্যাদি বাবদ ব্যয়িত অর্থের বিপরীতে কম্পানি কর্তৃক তখন ট্যারিফ দাবি করার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু বর্তমান পিএসসিতে সংশ্লিষ্ট কম্পানিকে এ বাবদ ট্যারিফ সুবিধা প্রদানের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী।

উল্লিখিত বিষয়াদির বাইরেও উক্ত দরপত্রে এমন আরো কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে দেশের স্বার্থ—যে ক্ষুণ্ন হবে সেটি সহজেই বোধগম্য। তবে সে ক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণের জন্য বিশেষজ্ঞ অভিমতের দ্বারস্থ হওয়া প্রয়োজন। তদুপরি ২০১৯ সালের পিএসসির যেসব ধারা নতুন পিএসসিতে হুবহু রেখে দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেও এমন কিছু ধারা আছে, যেগুলোতে দেশের স্বার্থরক্ষায় ব্যাপকভিত্তিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ ২০১৯ সালের পিএসসিতে শুধু অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র খাতের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কম্পানিকে (বাপেক্স) ১০ শতাংশ অংশীদারি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা বর্তমান পিএসসিতেও বহাল রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই যে অনুরূপ ১০ শতাংশ হিস্যা বাপেক্সকে গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রদান করা জরুরি। এ বিধান এখনই সংযুক্ত করা না হলে সেটি হবে সবকিছু জেনেবুঝেও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে স্থায়ীভাবে পরনির্ভরশীল ও বহুজাতিক তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোর কাছে জিম্মি করে রাখার মতো একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিষয়টি কি দেশের রাজনীতিক ও সংশ্লিষ্ট বিষয় বিশেষজ্ঞগণের দৃষ্টিতে পড়েছে?

প্রসঙ্গত বলি, গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে বাংলাদেশকে যদি বিশ্বমানের দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে এগোতে হয়, তাহলে এ ধরনের কাজে বাপেক্সকে আরো অধিক হারে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞ অভিমত যে বাপেক্সের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের মধ্যে সে যোগ্যতা ও দক্ষতা দুই-ই যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ হচ্ছে, সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ভেতরকার একটি মহল তাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে বাপেক্সকে সে সুযোগটি দিতে চায়নি এবং এখনো দিতে চান না, যেমনটি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চান না চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডকে (সিডিডিএল)। সিডিডিএলকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিলে সে ক্ষেত্রে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড যেমন বঞ্চিত হয়, তেমনি বাপেক্সকে গভীর সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কাজের শরিকানা দিলে সেখানেও সংশ্লিষ্ট বহুজাতিক কম্পানি ও তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়। বিষয়টির প্রতি দেশের সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

২০১৯ সালের পিএসসিতে তেল-গ্যাস কম্পানিসমূহের সব আমদানিকেই কর ও শুল্কমুক্ত রাখা হয়েছিল এবং নতুন পিএসসিতেও তা বদল করা হয়নি। দেশে কর-জিডিপির অনুপাত যেভাবে বছরের পর বছর ধরে প্রায় একই নিম্নচক্রে খাবি খাচ্ছে, সেখান থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এ ধরনের কর ও শুল্কমুক্তির ধারা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রাখার প্রবণতা থামাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব হচ্ছে, তেল-গ্যাস কম্পানিগুলোর জন্য কর ও শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকুক; তবে সেটি হতে হবে শুধু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে।

সব মিলিয়ে তাই বলব, গ্যাস বাংলাদেশের একটি অপার সম্ভাবনাময় খাত। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে অন্যান্য বিকল্প অনুসন্ধানের পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নিজেদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, বিনিয়োগ সামর্থ্যের অভাব ও দক্ষতাজনিত ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের গ্যাসসম্পদের বেশির ভাগই চলে যাচ্ছে বহুজাতিকদের কবজাধীনে। দেশে গ্যাসের যারা পাইপলাইন ভোক্তা, তাদের অধিকাংশই কি জানেন, তাদের চুলায় বা কারখানায় সরবরাহকৃত এ গ্যাস বহুজাতিক কম্পানিগুলোর কাছ থেকে দুষ্প্রাপ্য বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা? যদি জানতেন, তাহলে এ দাবি আরো অনেক আগেই হয়তো জোরদার হতো যে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে বাপেক্সকে আরো অধিক হারে যুক্ত করার মাধ্যমে স্থানীয় দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো হোক, যাতে উক্ত কাজে বাংলাদেশ ক্রমান্বয়ে আরো স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।

গ্যাস অনুসন্ধানসংক্রান্ত দরপত্র আহবান প্রসঙ্গে ওপরে যা যা বলা হলো, তার পুরোটাই এ দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার অংশ হিসেবে বলা। অতএব রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের কাছে অনুরোধ, দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এ প্রস্তাবগুলোর আলোকে গ্যাস অনুসন্ধানসংক্রান্ত উল্লিখিত দরপত্র-দলিলসমূহ অবিলম্বে পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হোক, যে সুযোগ ওই দরপত্র-দলিলের ভেতরেই রয়েছে, যেমনটি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি পর্যালোচনা বা বাতিলের সুযোগও।

 

লেখক : আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক

জান্নাতের টিকিট ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্তের বয়ান

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

জান্নাতের টিকিট ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্তের বয়ান

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির মিলন অস্বাভাবিক না হলেও জামায়াতের নব-উত্থানটা কিন্তু বিস্ময়কর। যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তারা সম্ভব-অসম্ভব সব কিছুই করেছে, কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়ার পথেও এগোয়নি; যে দল তার আদি জন্মভূমি ভারতে বিলুপ্তই হয়ে গেছে এবং বিশিষ্ট কর্মভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্রে যাদের অস্তিত্ব এখন প্রান্তিক পর্যায়ে, সেই দল স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থান দখল করে নেবে এই ঘটনা বিস্ময়কর তো বটেই; আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্যই। যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনাস্থল ও লালন-ভূমি, চিন্তা ও মননশীলতার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার জন্য যাদের ছিল বিশেষ খ্যাতি, সেখানে জামায়াতপন্থী ছাত্ররা আধিপত্য বিস্তার করবে এমনটা ২০২৬ সালের আগে কল্পনা করাও ছিল দুঃসাধ্য। অথচ সেটাই ঘটেছে। এবং হয়তো বা জামায়াতের চাপেই নবগঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শোক প্রস্তাবে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জামায়াতের এই উত্থানের মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য মোটেই উপেক্ষণীয় নয়।

জামায়াতের উত্থানের পেছনে একটা বড় কারণ অবশ্য আওয়ামী লীগের দুঃশাসন। তাদের ফ্যাসিবাদী তৎপরতায় অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ বিকল্প খুঁজেছে। পথের সন্ধান সমাজতন্ত্রীরা দিতে পারতেন। কিন্তু সে কর্তব্যপালনে সমাজতন্ত্রীরা ব্যর্থ হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথা আবারও মনে পড়ে। তিনি সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, তবে অবশ্যই উদারনৈতিক ছিলেন। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান চেয়েছেন এবং সে লক্ষ্যে কাজও করেছেন। তবে তাঁর আস্থা ছিল ব্যক্তির নেতৃত্বে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর নৈরাজ্যিক ইতালিতে মুসোলিনির অভ্যুদয় দেখে তাঁর ধারণা হয়েছিল ‘উন্মত্ত’ ওই জনগোষ্ঠীকে শৃঙ্খলার মধ্যে এনে সম্মানের নতুন জায়গায় প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা মুসোলিনির মধ্যে রয়েছে। তাঁর এই আস্থা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মুসোলিনি যে ঘোরতর কর্তৃত্ববাদী, ভয়ংকর রকমের পরমত-অসহিষ্ণু, ফ্যাসিবাদী এক নায়ক, নিজের ইতালি ভ্রমণের সময়ে এবং পরে ফরাসি সাহিত্যিক রোমাঁ রলাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় রবীন্দ্রনাথের কাছে সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। মুসোলিনির অভ্যুত্থানের জন্য রলাঁ প্রধানত দায়ী করেছিলেন সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতাকেই।

জান্নাতের টিকিট ও জাহান্নামে নিক্ষিপ্তের বয়ানবাংলাদেশের ইতিহাসেও কিন্তু সেটাই ঘটেছে। মতাদর্শিকভাবে জামায়াতে ইসলামীই যে দেশের জন্য তো বটেই, নিজেদের দলের জন্যও প্রধান শত্রু, আওয়ামী লীগের নব্য ফ্যাসিবাদী নেতৃত্ব সেই স্থূল সত্যটাকে উপেক্ষা করে; শুধু তাই নয়, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার ব্যাপারে তাদের বুর্জোয়া প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকেই প্রধান শত্রু বলে ধরে নিয়ে তদনুযায়ী আচরণ করে। এটা অবশ্য অপ্রত্যাশিত ছিল না, তবে দেশবাসীর দিক থেকে যেটা প্রত্যাশিত ছিল সেটা হলো স্বাধীন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রীরাই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। প্রত্যাশার কারণও ছিল। সেটা এই যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর প্রথমে স্বাধীনতার ও পরে মুক্তির সংগ্রামে জাতীয়তাবাদীদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রীরা সর্বক্ষণই উপস্থিত ছিলেন; বস্তুত তাঁরাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এবং তার আগে সত্তরের নির্বাচনেও; আওয়ামী লীগ যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে সেটা দেশের সংগ্রামী মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব—এই বিবেচনা থেকেই। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল সমাজতন্ত্রীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছে বুর্জোয়ারা। সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে রুশপন্থী-চীনপন্থী আত্মঘাতী বিভাজন, রুশপন্থীদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকার প্রবণতা, চীনপন্থীদের বিভ্রান্তি ও বিভক্তি, এসবের মধ্য দিয়ে আরো একটি ঘটনা ঘটল, সেটা হলো আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে এবং সমাজতন্ত্রীদের কার্যকর অনুপস্থিতির দরুন সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের সুযোগকে ব্যবহার করে আওয়ামীপন্থী তরুণদের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) আবির্ভাব। দলটি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার যতটা উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করা সম্ভব সেভাবেই করেছে, তাদের দলের নামকরণেও সমাজতন্ত্র জ্বলজ্বল করেছে, কিন্তু তাদের মূল নেতৃত্ব যে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিল সেটা শুধু যে তাদের পূর্বপরিচয়ের মধ্যেই সুপ্ত ছিল তা নয়, নিজেদের ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক’ পরিচয়দানের ভেতর দিয়েও প্রকাশ পেয়েছে বৈকি। চক্ষুষ্মানরা দেখতে ভুল করেননি, এবং স্মরণ না-করে পারেননি যে নািস হিটলার এবং ফ্যাসিস্ট মুসোলিনিও ‘জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্যই লড়ছিলেন। একদিকে সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা, অপরদিকে মুখে সমাজতন্ত্রী অন্তরে সমাজতন্ত্রবিরোধী জাসদের উগ্র অভ্যুদয়—এই দুই ঘটনা বাংলাদেশে বুর্জোয়াদের শাসনকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে যে প্রভূত পরিমাণে সহায়তা প্রদান করেছে সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জাসদের ক্ষতিকর ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এখানে কৌতূহলোদ্দীপক একটি ঘটনার উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির সম্পর্কে জানা যাচ্ছে যে ছাত্রাবস্থাতেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেটা ঘটেছিল জাসদের ছাত্রসংগঠনের মধ্য দিয়ে। তারপর তিনি ইসলামী ছাত্রশিবির হয়ে জামায়াতে প্রবেশ করেছেন এবং অবশেষে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে সংস্থাপিত হয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর উঠে দাঁড়ানোর পেছনে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণগুলোও উল্লেখযোগ্য। দেশে বেকার ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। অন্যায়, অপরাধ, অবিচার, জুলুম স্থায়ী প্লাবনের আকার ধারণ করেছে। বিচার আগেও পণ্যই ছিল, এখন তার ব্যবসায়ী চরিত্র আরো প্রকট হয়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের কোথাও জবাবদিহিতার বালাই নেই। রাষ্ট্র নিজেই বৈষম্য ও নিষ্পেষণ বৃদ্ধির নির্মম যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। ধর্ষণ মহামারির আকার ধারণ করবে বলে শঙ্কা। সবকিছু মিলিয়ে সর্বত্র গভীর এক হতাশা দেখা দিয়েছে। বিত্তবানরা বিদেশে বিকল্প বাসস্থানের খোঁজ করছে। দেশে হত্যা ও আত্মহত্যা দুটোই বেড়েছে। হতাশ মানুষ মাদকের দিকে ঝুঁকছে। প্রযুক্তি মানুষকে বিচ্ছিন্ন ও একাকী করে ফেলছে। অনলাইনে জুয়া খেলা বিনোদনের স্তর পার হয়ে নেশায় পরিণত হয়েছে। ওদিকে সামাজিকভাবে সংস্কৃতির চর্চা ক্রমাগত কমে আসছে। বাড়ছে ওয়াজ এবং বিনোদনের জন্য মোবাইল ও অনলাইনের ওপর নির্ভরতা। সব দিকেই অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। অন্ধকার বাড়লে আশ্রয়ের জন্য মানুষ ধর্মের শরণাপন্ন হয়, বাংলাদেশেও সেটাই ঘটে চলেছে। এবং তাতে সুবিধা হচ্ছে ধর্মকে যারা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে তাদের। যেমন— জামায়াতে ইসলামীর।

জামায়াতের ইতিহাস দ্বিচারিতায় সমুজ্জ্বল। দ্বিচারিতাকে মোনাফেকি বললে বোধকরি বুঝতে সুবিধা হয়। শুরুতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানেই হেডকোয়ার্টার্স স্থাপন করে জামায়াতের জনবিরোধী তৎপরতা চালু থাকে। কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে পাঞ্জাবে তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিল। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ অধ্যাদেশকে আইনে রূপদানের উদ্যোগের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা তাদের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কাজ। সন্তানের জন্মদানের সক্ষমতাকে মেয়েদের পক্ষে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে তারা অযোগ্যতা জ্ঞান করে, অথচ পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে মিস ফাতেমা জিন্নাহকে তাদের পার্টি সমর্থন করেছে। বাংলাদেশে তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। আর খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে নারী নেত্রীর পরিচালনায় তাদের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রিত্ব করাতেও কোনো প্রকার দ্বিধা প্রকাশ করেননি। এবারের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে তারা একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি, অথচ ওই সংসদেরই সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়ন আগেও দিয়েছে, এবারও অবশ্যই দেবে। দলের পক্ষে ভোট চাইতে মেয়েদের দ্বারে দ্বারে পাঠাতেও তাদের কুণ্ঠা ছিল না, তারা ইসলামী শাসন কায়েম করতে বদ্ধপরিকর, তবে নির্বাচনে জেতার আশায় হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে প্রার্থী করতে অসুবিধা দেখতে পায়নি। তাদের নেতারা কেউ আমির, কেউ নায়েবে আমির, আবার কেউ সেক্রেটারি জেনারেল। জামায়াতিরা নিজেদের সততার বড়াই করেন এবং দেশে সেলাকের শাসন কায়েম করবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকেন, তবে ভোট টানার আশায় মিথ্যাচারে দ্বিধা করেন না। বিগত নির্বাচনের সময় তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে জামায়াতকে ভোট দেওয়ার অর্থ জান্নাতে যাওয়ার টিকিট কেনা, হয়তো আশা করেছিল যে জ্বলন্ত জাহান্নামের প্রান্তে অবস্থানরত গরিব মানুষ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে উদ্দীপ্ত হয়ে দলে দলে তাদের ভোট দিতে ছুটে আসবে; পরে সমালোচনার মুখে ওই বক্তব্যটি ব্যক্তিগত, দলীয় নয় বলে প্রচার করে। ভোট কেনার জন্য প্রকাশ্যে অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে সংবাদপত্রে চলে এসেছে।

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়া

ইকরামউজ্জমান

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়া

আবার ঘরে ঘরে ফুটবল। রাত জাগার ফুটবল। আনন্দ, বেদনা, আশা ও নিরাশার ফুটবল। ঘরে ঘরে তর্ক, মান-অভিমান, আবার মধুর মিলনের ফুটবল। অঘটন, অনিশ্চয়তা আর অপ্রত্যাশিত ফুটবলের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ উৎসবের রঙে রাঙিয়ে এখন অপেক্ষা।

ফুটবল মাঠে নামতে আর মাত্র কয়েকটি প্রহরের অপেক্ষা। এরপর সারা দুনিয়ার মানুষ চঞ্চল হয়ে উঠবে। ফুটবলের বলয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলবে। ফুটবল আমাদের জীবনে ঈদ ও বড় পূজার উৎসবের মতোযা বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়।

হাজার হাজার মাইল দূরে অনুষ্ঠিত ফুটবলের সুরে আমরা সবাই আটকে যাব। দুনিয়াজুড়ে তো একই অনুভূতি ও আবেগ। ফুটবলের সম্মোহন সত্যিই অসাধারণ। এমনিতে তো আর পরিচিতি হয়নি খেলার রাজা, বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর জীবনধর্মী খেলা হিসেবে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়াবিশ্বকাপ ফুটবল তো শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বজনীন এক মহোৎসব। খেলাটি পুরো দুনিয়াকে একত্র করছে একই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে। মানুষ জীবনের রং খুঁজে পায় এই খেলার মধ্যে। এই খেলার ভাষা ও জয়-পরাজয়ের অনুভূতি আর আবেগের মধ্যে পার্থক্য নেই। বিশ্বকাপে যারা সরাসরি জড়িত তাদের চেয়ে আমাদের আবেগ-উৎকণ্ঠা, এমনকি উন্মাদনা কোনো অংশে কম নয়। এখানেই এই খেলার সবচেয়ে বড় জয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, খেলার প্রতি নিরলস ভালোবাসা আর আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ফুটবল সব সময় মানুষকে কাছে টানেমিলায়। খেলার মঞ্চে সামর্থ্য, শৈলী, বীরত্ব, বুদ্ধি ও মানবতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

ফুটবলের আসল মানচিত্রে আমাদের স্থান নেই। আমাদের স্থান আছে বড় গণমানচিত্রে। তা সত্ত্বেও এই যে আমরা ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছিএর সবকিছুই খেলার দর্শনের মধ্যে আছে। প্রাণের টান আর ভালোবাসাকে কি অস্বীকার করা যায়? অভিমান, বিচ্ছেদ, এর পরও ভালোবাসার তো মৃত্যু নেই।

অদ্ভুত এক খেলা! পথের ভিখারি ভালোবাসে ফুটবলকে, আবার ভালোবাসে সমাজের বিত্তশালী মানুষটিও। কোনো তফাত নেই। উভয়েই ফুটবলের ভালোবাসার কাঙাল। প্রত্যেকে তার নিজস্ব অবস্থান থেকে খেলাটিকে দেখে। খেলাটি নিয়ে ভাবে। কখনো অনুশোচনা করে, কখনো আনন্দিত হয়।

চার বছর পর পর মানুষের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার আলোতে উৎসাহিত হয় ফুটবলের মহাযজ্ঞ। উত্তেজনা, আনন্দ আর উৎকণ্ঠার কড়াই যত গরম হচ্ছে, মানুষ ততই চঞ্চল হয়ে উঠছে। বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ড এক মাসের বেশি সময় ধরে মানুষের দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ রাখবে। আমাদের মতো দেশে ফুটবল অনেক ইস্যুর ওপরে স্থান পাবে। ফুটবল নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে রীতিমতো পাগলামি ও উন্মাদনার জন্ম হবে। ফুটবল নিয়ে এখন শুধু বিশেষজ্ঞ, পণ্ডিত ও মৌসুমি ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মাথা ঘামাচ্ছেন না; মাথা ঘামাচ্ছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদরাও। তাঁরাও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। বিগত বিশ্বকাপগুলোর সময় লক্ষ করেছি, গণকদের গণনা করে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন দলের নাম ঘোষণা করে আলোচনার জন্ম দিতে। ১৬০ জন অর্থনীতিবিদের পূর্বাভাস হলো, গতবারের রানার্স আপ ফ্রান্স ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনকে পরাজিত করে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি জয় করবে। আর এই ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি প্রমাণিত হয় তাহলে তো ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞদের খবর আছে। রয়টার্সের প্রেস আইটেমে দেখেছি, অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করেছেন, মূল্যস্ফীতির কঠিন হিসাব কষা যত না কঠিন, তার চেয়েও বেশি কঠিন বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম বলা। যা হোক, এই ভবিষ্যদ্বাণী অবশ্য বড় ধাক্কা ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, জার্মানি ও পর্তুগালের ফুটবল দলের জন্য। তবে ফুটবল-রসিকরা নিশ্চয়ই মনে রাখবেন, ফুটবল মাঠের দুই পায়ের খেলা। খেলার আসল গায়েন হলেন খেলোয়াড়রা। খেলোয়াড়রাই মাঠের রং বারবার পাল্টে দিয়েছেন। পাল্টে দিয়েছেন অনেক হিসাব-নিকাশ। মানুষ মাঠের ফুটবলের ওপর ভরসা রেখেছে। দলগত শক্তি, সামর্থ্যের বাস্তবায়ন আর তারকা খেলোয়াড়ের সময়মতো জ্বলে ওঠার কথা ভেবেছে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের অপেক্ষায় দেশ-দুনিয়াএবারই প্রথম তিন দেশ মিলিয়ে (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) বিশ্বকাপের আয়োজক। অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হয়েছে। ম্যাচ এখন ১০৪টি। ম্যাচ বাড়াতে খেলার দিনও বেড়েছে। বিশ্বায়নের দোহাইয়ের পেছনে ফিফার আয়ও এবার বেড়েছে। আবার এই আয় দুনিয়াজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হবে বলে অনেক আগেই ফিফা জানিয়েছে। ফিফার কাছ থেকে আমাদের বরাদ্দ বাড়বে বলে ফুটবল ফেডারেশনের গভর্নিং বডির একজন সদস্য জানিয়েছেন। তবে কোন কোন খাতে ফিফা বরাদ্দ বাড়াবেএ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানিয়েছেন।

বিশ্বকাপ ফুটবল ৯৬ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। শুরু সেই ১৯৩০ সালে উরুগুয়ে থেকে। স্বাগতিক উরুগুয়ে ৪-২ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই সময় থেকে বিগত ২২টি বিশ্বকাপে মাত্র ছয়বার স্বাগতিক দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। দেশগুলো হলো উরুগুয়ে, ইতালি, ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স। ২৩তম বিশ্বকাপের (২০২৬) স্বাগতিক দেশ তিনটি, তারা বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হবে এমন স্বপ্ন কখনো দেখছে না।

বিভিন্ন কারণে ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা অনেক হিসাব-নিকাশ ও আগ-পিছ ভেবে কথা বলেন। এবার তাঁদের বেশির ভাগের ভবিষ্যদ্বাণী হলো, যে আটটি দেশ এর আগে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে, এর বাইরে যাচ্ছে না আসন্ন বিশ্বকাপের ট্রফি। পণ্ডিতরা কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন, লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা গতবার কাতার বিশ্বকাপে বিজয়ী দল এবং ব্রাজিল, যারা ষষ্ঠ বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছে, অপেক্ষা করে আছে ২৪ বছর ধরেতাদের কোনো সম্ভাবনা নেই। এতে ধরে নেওয়া যায়, বিশ্বকাপ আবার ইউরোপের কবজায় চলে যাচ্ছে। ১৯৫৮ সালে সুইডেন থেকে প্রথম লাতিন দল ব্রাজিল কাপ জিতেছিল ইউরোপের সুইডেনকে ৫-২ গোলে পরাজিত করে। এর ৫৬ বছর পর ২০১৪ সালে ব্রাজিল থেকে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে জার্মানির লাতিন জয়। বিষয়টি দারুণ।

ফুটবলের পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখিয়ে বলছে, বিশ্বকাপ ফুটবল ডমিনেট করছে ইউরোপ। ইউরোপজুড়ে ফুটবল ভীষণভাবে পাল্টে গেছে। ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানিসব জায়গায় ঘরোয়া লীগে টুর্নামেন্টের খেলায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ফুটবল নিয়ে নতুনভাবে মাথা ঘামিয়ে নতুন এক ধারার ফুটবলের জন্ম দিয়েছেন। এখানে আছে আক্রমণাত্মক ফুটবলের সঙ্গে শৈল্পিক ফুটবলও। আগের দিনগুলোতে লাতিন দেশগুলোর ফুটবলাররা এক ধরনের ফুটবল খেলতেন, আর ইউরোপের দলগুলো খেলছে অন্য ধাঁচের ফুটবল। এখন আর সেই ধারা নেই। লাতিন আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ফুটবলার এখন ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে ফুটবল খেলছেন। এতে ফুটবল দুনিয়ার সব কিছু মিলেমিশে গেছে। গত ২৫ থেকে ৩০ বছরে ক্লাব ফুটবলে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। যার প্রভাব ইউরোপের সব জাতীয় দলেও লক্ষণীয় হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি ফুটবলের সত্যিকারের বিশ্বায়ন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, এমনকি এশিয়ার খেলোয়াড় তাঁদের নিজস্ব খেলার ধারা বাদ দিয়ে নতুন চিন্তা-ভাবনায় ফুটবল খেলছেন। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, এশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের অনেক খেলোয়াড় নিজস্ব নাগরিকত্ব বাদ দিয়ে নতুন করে নাগরিকত্ব নিয়ে বিভিন্ন দেশের হয়ে ফুটবল খেলছেন। আসন্ন বিশ্বকাপ ফুটবলে তাঁদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে।

এশিয়া থেকে এবার প্রতিনিধিত্ব করবে ৯টি দেশ। ১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়া বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। আর ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে যৌথভাবে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া খেলেছে সেমিফাইনালে। এবারের বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলো কী করবে, এর চেয়েও বেশি কৌতূহল লক্ষণীয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে গিয়ে ইরানের কোন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। কাতার বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে মরক্কো সেমিফাইনালে খেলেছিল। দেখার বিষয় এবার মরক্কো কতটুকু এগোতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও আরববিশ্বে ফুটবলের কদর দ্রুত বাড়ছে। এখন দরকার টেকসই ফুটবলে উন্নতি।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে জাপান হারিয়েছে জার্মানি ও স্পেনকে; দক্ষিণ কোরিয়া হারিয়েছে পর্তুগালকে; ক্যামেরুন ব্রাজিলকে; তিউনিশিয়া ফ্রান্সকে। মরক্কো প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে খেলেছে। হারিয়েছে বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালকে। আশা করছি, এশিয়া মহাদেশ থেকে সাহসের সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স প্রদর্শন করবে আমাদের প্রতিনিধিরা, যা এশিয়ায় সার্বিক ফুটবলকে অনুপ্রাণিত করবে। বিশ্বকাপের বর্ণিল উৎসবে সবাইকে স্বাগত। শরীরের যত্ন নিন আর খেলা উপভোগ করুন। জীবনের ব্যঞ্জনের নুন হলো আনন্দ।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

ভরণ-পোষণ আইন কি বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারে

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

ভরণ-পোষণ আইন কি বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারে

প্রযুক্তির এই যুগে আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সংযুক্ত। কিন্তু একই সঙ্গে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। আমাদের বন্ধু তালিকায় হাজারো মানুষ, অসংখ্য ফলোয়ার, অসংখ্য ভার্চুয়াল সম্পর্ক; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিজের ঘরের মানুষগুলোর জন্য সময় নেই। আমরা ক্যারিয়ার, পদোন্নতি, ব্যাবসায়িক সাফল্য, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির এক নিরন্তর প্রতিযোগিতার পিছে ছুটছি। এই দৌড়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করছি। কিন্তু অজান্তেই হারিয়ে ফেলছি পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা। ভার্চুয়াল জগতে একটি পোস্টে শত শত লাইক-কমেন্ট রিপ্লাই দেওয়ার সময় পেলেও বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে বসে দশ মিনিট কথা বলার সময় পাই না। নিজেদের সফল করার প্রতিযোগিতায় আমরা এতটাই ব্যস্ত যে যাঁরা আমাদের সফল হওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, তাঁদের অনুভূতি ও প্রয়োজন অনেক সময় আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংবাদ আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কোথাও বৃদ্ধ মা একা বাসায় মৃত্যুবরণ করেছেন, কয়েক দিন পর প্রতিবেশীরা খবর পেয়েছেন। কোথাও বৃদ্ধ বাবা অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছেন, অথচ প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের কারো সময় হয়নি তাঁর খোঁজ নেওয়ার। আবার কোথাও দেখা যায়, সন্তানরা বিদেশে বা দেশের বড় শহরে সুখী ও সফল জীবনযাপন করছেন, আর গ্রামের বাড়িতে থাকা মা-বাবা দিন পার করছেন নিঃসঙ্গতা, অবহেলা ও অপেক্ষার মধ্যে। এমনকি প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের পিতা-মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে।

ভরণ-পোষণ আইন কি বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারেএসব ঘটনা শুনে আমরা কিছুক্ষণ দুঃখ প্রকাশ করি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ জানাই, তারপর আবার অন্য কোনো আলোচিত ঘটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেদের কাছে প্রশ্ন করি, আমরা আসলে কী করছি। প্রতি বছর মা দিবস ও বাবা দিবস এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে যায় আবেগঘন স্ট্যাটাসে। কেউ মায়ের সঙ্গে ছবি দেন, কেউ বাবার ত্যাগের গল্প লেখেন, কেউবা কৃতজ্ঞতার দীর্ঘ বার্তা প্রকাশ করেন। এসব প্রকাশ অবশ্যই সুন্দর। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ভালোবাসা বাস্তব জীবনের দায়িত্ববোধে পরিণত হয় না।

একজন বৃদ্ধা মা কিংবা বাবার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সব সময় অর্থ নয়। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে মানুষের প্রয়োজন হয় সঙ্গ, সম্মান, খোঁজখবর এবং আপনজনের উপস্থিতি। একজন মা হয়তো সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। একজন বাবা হয়তো চান সন্তানের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করতে। তাঁরা হয়তো আর নতুন কোনো সম্পদ চান না; তাঁরা শুধু অনুভব করতে চান যে তাঁরা এখনো পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দুঃখজনকভাবে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নগরায়ণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারার কারণে অনেক পরিবারে আবেগগত দূরত্ব বাড়ছে। আমরা অনেকেই মনে করি মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু সম্পর্ক কি শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন? ভরণ-পোষণ কি ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে?

আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সন্তান তাঁদের মা-বাবার চিকিৎসা খরচ বহন করছেন, নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন, কিন্তু মাসের পর মাস তাঁদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলছেন না। ফলে মা-বাবারা আর্থিকভাবে নিরাপদ হলেও মানসিকভাবে একাকী হয়ে পড়ছেন। এই একাকিত্ব অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এমন হয়ে উঠছি? আমরা কি সঠিক রাস্তায় আছি? আমরা ভালো চাকরি, উচ্চ বেতন, বড় বাড়ি, দামি গাড়ি এবং সামাজিক মর্যাদাকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখছি। কিন্তু একজন মানুষ কতটা সফল, তা তাঁর ব্যাংক হিসাব দিয়ে নয়; বরং তিনি তাঁর বাবা-মায়ের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল, সেটি দিয়েও পরিমাপ করা উচিত।

বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার জন্য আইন রয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কারণ কোনো মা-বাবা যেন সন্তানের অবহেলায় অভুক্ত বা অসহায় অবস্থায় না থাকেন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন দিয়ে ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করা গেলেও ভালোবাসা নিশ্চিত করা যায় না।

আইন কাউকে অর্থ দিতে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু কাউকে আন্তরিক হতে বাধ্য করতে পারে না। আদালত একজন সন্তানকে খরচ বহনের নির্দেশ দিতে পারে, কিন্তু আদালত কি নির্দেশ দিতে পারে যে সে প্রতি সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলবে? অথবা বৃদ্ধ বাবার হাত ধরে হাঁটবে? ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের জন্ম আদালতে নয়; জন্ম পরিবারে, শিক্ষায় এবং সামাজিক মূল্যবোধে।

আজ যারা তাঁদের বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করছেন, তাঁদের একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। সময় কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না। আজ আমরা তরুণ, কর্মক্ষম এবং ব্যস্ত। কিন্তু একদিন আমাদের চুলও সাদা হবে, আমাদের শরীরও দুর্বল হবে, আমাদেরও কারো অপেক্ষায় থাকতে হবে। আজ আমরা আমাদের সন্তানদের সামনে যে আচরণের উদাহরণ তৈরি করছি, আগামীকাল তারাই সেই উদাহরণ অনুসরণ করবে।

একজন শিশু যখন দেখে তাঁর বাবা-মা দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির প্রতি দায়িত্বশীল, তখন সে সম্মান ও মানবিকতার শিক্ষা পায়। আবার যখন দেখে বৃদ্ধদের অবহেলা করা হচ্ছে, তখন সে সেটিকেও স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন শুধু বর্তমানের নৈতিক কর্তব্য নয়; এটি ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণেরও একটি বিনিয়োগ।

একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা বোঝা যায় সে তার শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী এবং বৃদ্ধদের কিভাবে মূল্যায়ন করে তার মাধ্যমে। যে সমাজে বৃদ্ধ মা-বাবা সম্মান, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা নিয়ে জীবন কাটাতে পারেন, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত সমাজ।

তাই মা দিবস বা বাবা দিবসের আবেগঘন পোস্টের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বছরের প্রতিটি দিনে তাঁদের পাশে থাকা। একটি ফোনকল, কিছু সময়, একটি খোঁজখবর, একটি আন্তরিক আলাপএসবের মূল্য অনেক সময় হাজার টাকার চেয়েও বেশি।

আমরা প্রায়ই বলি, মা-বাবার ঋণ কখনো শোধ করা যায় না। কথাটি সত্য। কিন্তু সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা অন্তত করা যায়। তাঁদের বার্ধক্যকে সম্মানজনক করা যায়। তাঁদের নিঃসঙ্গতা কিছুটা হলেও ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভালো সন্তানের পরিচয় দিতে চাই, নাকি বাস্তব জীবনেও সত্যিকার অর্থে দায়িত্বশীল সন্তান হয়ে উঠতে চাই?

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়