যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষকে খাদ্যসংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে। শুক্রবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, তেলের দামের ওপর এই সংঘাতের ধারাবাহিক প্রভাব বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গভীর সংকট তৈরি করছে।
ডব্লিউএফপি মার্চ মাসে দেওয়া এক পূর্বাভাসে সতর্ক করে জানিয়েছিল, জুনের শেষে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের আশপাশে থাকলে বিশ্বের চার কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়বে। সেই আশঙ্কা এখন সত্য হতে শুরু করেছে।
ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডব্লিউএফপির মূল্যসূচক অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম এখন পর্যন্ত সামান্য বাড়লেও ভঙ্গুর ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোতে এরই মধ্যে খাবারের দাম অনেক বেড়ে গেছে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ার কারণে চলমান সংকট খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায় দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যেসব দেশ আগে থেকেই দারিদ্র্য, যুদ্ধ বা বেকারত্বের মতো সমস্যায় জর্জরিত ছিল, সেসব দেশের ওপর এই পরিস্থিতি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ তেলের বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় তেলবাহী জাহাজগুলো চলাচল করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চললেও যুদ্ধ থামার প্রক্রিয়া আটকে গেছে। এমনকি কবে এই যুদ্ধ শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তাও নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান, সোমালিয়া ও শ্রীলঙ্কার জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জ্বালানির চড়া দাম, খাবারের মূল্যবৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ার কারণে তারা তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে।
ডব্লিউএফপির শঙ্কা, সোমালিয়ায় ২০২৬ সালে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ (জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ) তীব্র ক্ষুধার মুখোমুখি হতে পারে। আফগানিস্তানে এক কোটি ৭৪ লাখ মানুষ খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। এ ছাড়া সোমালিয়া ও আফগানিস্তান উভয় দেশেই আরো ২৫ লাখ করে মানুষ এতটাই গরিব হয়ে পড়তে পারে যে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিনের ন্যূনতম খাবার কেনার অর্থও হয়তো তাদের কাছে থাকবে না।
ডব্লিউএফপির পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালে সোমালিয়ার প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে ব্যর্থ হবে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৭ শতাংশ।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আফগানিস্তানে ১ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ খাদ্যসংকটে ছিল। এখন এই নতুন পরিস্থিতির কারণে আরো ২৩ লাখ মানুষ অনাহারে থাকার ঝুঁকিতে পড়বে। এর বড় কারণ হলো, আফগানিস্তান ও সোমালিয়া দুই দেশই আমদানি করা জ্বালানি ও খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে শ্রীলঙ্কার অবস্থা নিয়ে নতুন এক আশঙ্কায় বলা হয়েছে, দেশটির প্রায় ১৩ লাখ মানুষ এতটাই সংকটে পড়বে যে বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিনের খাদ্য কেনার অর্থও হয়তো তাদের থাকবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে সাহায্য পাওয়ার মতো মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। এই দ্বিমুখী চাপের কারণে বিশ্ব মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা বড় সংকটে পড়েছে। এসব কারণে ডব্লিউএফপি ২০২৬ সালের মূল পরিকল্পনার চেয়ে ১৫ লাখ কম মানুষকে খাবার দিতে পারবে।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে এই যুদ্ধ যদি আর ছয় মাস চলে, তবে যাতায়াত খরচ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বাজারে খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ৯০ লাখেরও বেশি মানুষ জাতিসংঘের সাহায্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সূত্র : আল জাজিরা


