কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নোয়াম শাজির গুগল ছেড়ে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা 'ওপেনএআই'-এ যোগ দিচ্ছেন। তার এই সিদ্ধান্তকে গুগলের এআই পরিকল্পনার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।
গুগলের প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জেমিনি এআই মডেলের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন শাজির। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি লেখেন, 'আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমি ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছি। সেখানে অসাধারণ একটি দলের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি।' শাজিরের এই ঘোষণার পর প্রযুক্তি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি শুধু একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নন, বরং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর হিসেবেও পরিচিত।
নোয়াম শাজিরকে বর্তমান এআই বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন হিসেবে ধরা হয়। টাইম ম্যাগাজিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকাতেও তার নাম রয়েছে। গুগলে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন তিনি। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানের একেবারে শুরুর দিকে যোগ দেন এবং সে সময় গুগলের প্রথম ১০০ কর্মীর একজন ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং অন্যান্য বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের পেছনে যে প্রযুক্তি কাজ করছে, তার ভিত্তি তৈরিতে শাজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্রের সহলেখক ছিলেন তিনি। এ গবেষণাকেই বর্তমান বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম প্রযুক্তির সূচনা হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং অন্যান্য জনপ্রিয় এআই সেবা।
শাজির ২০২০ সালে তার সহকর্মী ড্যানিয়েল ডি ফ্রেইতাসের সঙ্গে গুগলে 'মীনা' নামে একটি উন্নত কথোপকথনভিত্তিক চ্যাটবট তৈরি করেন। পরে এই প্রযুক্তিকে আরো উন্নত করে 'ল্যামডা' নামে নতুন সংস্করণ তৈরি করা হয়। তিনি চেয়েছিলেন সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করা হোক। তার বিশ্বাস ছিল, এই চ্যাটবট ভবিষ্যতে সার্চ প্রযুক্তিকে আমূল বদলে দিতে পারবে। তবে নিরাপত্তা, ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম নিয়ে উদ্বেগের কারণে গুগলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই পরিকল্পনায় সম্মতি দেয়নি। এ নিয়ে হতাশ হয়ে ২০২১ সালে গুগল ছেড়ে দেন শাজির। গুগল ছাড়ার পর শাজির নিজের এআই কম্পানি 'ক্যারেক্টার.এআই' প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ২০২৪ সালে গুগল একটি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে তাকে আবার প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনে। ওই চুক্তির মূল্য ছিল ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। গুগলে ফিরে তিনি জেমিনি এআই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি আবার প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। গুগল থেকে দ্বিতীয়বার বিদায় নেওয়ার সময় শাজির বলেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল না।
শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার খবর প্রকাশের পর নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান। তিনি বলেন, ওপেনএআইয়ের শুরু থেকেই নোয়াম এমন একজন, যার সঙ্গে তিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করতে চেয়েছিলেন। এতে শুধু ১০ বছর সময় লেগেছে। তার আশা, এই অপেক্ষা সার্থক হবে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, শাজিরের মতো একজন গবেষকের যোগদান ওপেনএআইয়ের গবেষণা ও পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করবে।
শাজিরের নিয়োগকে ওপেনএআইয়ের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত মাসে ওপেনএআই গোপনে প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির আবেদন জমা দিয়েছে। একই পথে হাঁটছে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকও। বিশ্লেষকদের মতে, শাজিরের মতো বিশ্বখ্যাত এআই গবেষকের যোগদান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতে পরিচিত হওয়ার অনেক আগেই নিজের অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন নোয়াম শাজির। কিশোর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্র দলের হয়ে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ৩৫তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেন। সেখানে পূর্ণ নম্বর পেয়ে স্বর্ণপদক জয় করেন। পরে বৃত্তি নিয়ে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম সেমিস্টারেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উইলিয়াম লোয়েল পুটনাম গণিত প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে তিনি ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত দলকে জাতীয় পর্যায়ে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনে নেতৃত্ব দেন। পড়াশোনা শেষে অল্প সময়ের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির স্নাতকোত্তর কর্মসূচিতে ভর্তি হলেও ডিগ্রি শেষ করার আগেই গুগলে যোগ দেন তিনি।
শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগদান দেখিয়ে দিচ্ছে, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দক্ষ এআই গবেষকদের নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। যেখানে সাধারণ অনেক কর্মী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় আছেন, সেখানে এআই বিশেষজ্ঞদের চাহিদা ও মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। এর উদাহরণ দেখা গেছে গত বছরও। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক মেটা ১৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে স্কেল এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্দর ওয়াংকে নিজেদের দলে যুক্ত করে নেয়। বর্তমানে তিনি মেটার সুপারইনটেলিজেন্স ল্যাবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াম শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগদান শুধুমাত্র একটি চাকরি পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে নেতৃত্বের লড়াই আরো তীব্র হওয়ার ইঙ্গিতও বটে।