• ই-পেপার

রোমের রক্তাক্ত রাত

কেন বাড়ছে বাংলাদেশি বনাম বাংলাদেশি সংঘাত?

রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

জিল্লুর রহমান
রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

কোনো কোনো সপ্তাহে চারটি আলাদা ঘটনা যেন একটি বড় গল্পের চারটি অধ্যায় হয়ে ওঠে। প্রথমে মনে হয়, এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। একটি কূটনীতি, একটি বাণিজ্য, একটি যুদ্ধ, আরেকটি নিছক জীবনদর্শন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, চারটির কেন্দ্রেই রয়েছে একটি শব্দ-বিচক্ষণতা। রাষ্ট্রের যেমন চরিত্র থাকে, মানুষেরও থাকে। রাষ্ট্র যেমন প্রতিটি প্রস্তাব গ্রহণ করে না, মানুষও তেমনি প্রতিটি শব্দের উত্তর দেয় না। রাষ্ট্র যেমন সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, কিন্তু কারও অধীন হয় না; মানুষও তেমনি সবার সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখে, কিন্তু সবার জন্য নিজের ভিতরের দরজা খুলে দেয় না। এই সপ্তাহের ঘটনাগুলো যেন সেই পুরোনো সত্যটিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

১. চীন, মালয়েশিয়া এবং সুযোগের রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যতটা হয়েছে, অর্থনৈতিক আলোচনা ততটা হয়নি। অথচ আধুনিক কূটনীতির সাফল্য আর করমর্দনের ছবিতে মাপা হয় না; মাপা হয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, বাজার এবং আস্থার অঙ্কে। মালয়েশিয়া শুধু শ্রমবাজার নয়; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র। অন্যদিকে চীন অবকাঠামো, শিল্প, উৎপাদন এবং বিনিয়োগে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার। কিন্তু এই দুটি সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্যত্র। 

বাংলাদেশের সামনে এখন ‘কার সঙ্গে যাব’, এই প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ করা যায়। একসময় বিশ্বায়ন আমাদের শিখিয়েছিল দক্ষতার ভাষা। এখন ভূরাজনীতি শেখাচ্ছে স্থিতিস্থাপকতার ভাষা। সরবরাহ শৃঙ্খল বদলাচ্ছে, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে, উৎপাদনের মানচিত্র পুনর্লিখিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ভিতরেই বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কূটনীতি কখনো পক্ষ বেছে নেওয়ার শিল্প নয়; কূটনীতি হলো বিকল্প তৈরি করার শিল্প।

২. আমেরিকার জন্মদিন, ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস সামনে। ১৭৭৬ সালের সেই ঘোষণাপত্র শুধু একটি দেশের জন্ম দেয়নি; রাষ্ট্র, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণারও জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু আজকের আমেরিকা আর ১৭৭৬ সালের আমেরিকা এক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর আবারও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। শুল্ক, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নিরাপত্তা এখন একই আলোচনার অংশ।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী? অর্থ হলো, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি কারও ঘনিষ্ঠ হওয়া নয়; বিশ্বাসযোগ্য হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ইউরোপ প্রধান ক্রেতা। চীন বড় বিনিয়োগকারী। ভারত অপরিহার্য প্রতিবেশী। জাপান উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী। এদের কাউকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লেখা সম্ভব নয়। ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভারসাম্য। একজন দক্ষ মাঝি বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন না; তিনি শুধু পাল বদলে দেন। রাষ্ট্র পরিচালনাও তেমনি। সময়ের পরিবর্তনকে অস্বীকার করে নয়, বুঝে এগোতে হয়। যে রাষ্ট্র নিজের কম্পাস নিজে ধরে রাখতে পারে, শেষ পর্যন্ত তারাই অন্যদের কাছে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে ওঠে।

তবে একটি বিষয় আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না। ভূরাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই, যেমন স্থায়ী শত্রুও নেই। স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। আজ যে দেশ আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী, কাল সে-ই কোনো বাণিজ্যিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিতে পারে। আবার যে দেশ আজ শুল্ক আরোপ করছে, আগামীকাল সে-ই নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই বাস্তবতাকে আবেগ দিয়ে নয়, প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতে হয়।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করছি। বঙ্গোপসাগর আজ আর শুধু সমুদ্র নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, নৌ-নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। যে রাষ্ট্র এই পরিবর্তন বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

কিন্তু একটি বন্দর নির্মাণের চেয়েও কঠিন কাজ হলো আস্থা নির্মাণ। বিদেশি বিনিয়োগ আসে শুধু কর-সুবিধা দেখে নয়; আসে নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে। তাই কূটনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত দেশের ভিতরের সুশাসনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সামরিক শক্তি নয়; তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সবাই কাজ করতে চায়। কারণ সেখানে সিদ্ধান্ত হঠাৎ বদলে যায় না, নীতির ধারাবাহিকতা থাকে, আর প্রতিশ্রুতির মূল্য থাকে।

৩. যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; মানুষের মনেও হয়। একসময় যুদ্ধ শুরু হতো কামানের গর্জনে। এখন শুরু হয় একটি ভিডিও, একটি পোস্ট, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্মিত ছবি কিংবা একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, তথ্য এখন শুধু সংবাদ নয়; এটি একটি কৌশলগত অস্ত্র।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ততাই মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সত্যকে গোপন করার চেয়ে তাকে অসংখ্য শব্দের ভিড়ে হারিয়ে দেওয়া এখন অনেক সহজ। রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। বিনিয়োগ আস্থার ওপর দাঁড়ায়, আস্থা দাঁড়ায় বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ওপর। তাই সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং কৌশলগত যোগাযোগ আজ আর বিলাসিতা নয়; জাতীয় সক্ষমতার অংশ।

জর্জ অরওয়েল একসময় লিখেছিলেন, ক্ষমতা শুধু মানুষের ওপর নয়, সত্যের ওপরও প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। ডিজিটাল যুগে সেই কথার নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে। এখন যে বয়ান তৈরি করতে পারে, সে-ই অনেক সময় বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশেরও তাই নিজের গল্প নিজেকেই বলতে হবে। অন্যের ভাষায় নিজের পরিচয় লিখতে গেলে, একসময় নিজের পরিচয়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

৪. সব আলো পথ দেখায় না

জীবনের একটি বড় শিক্ষা হলো, সব আলো পথ দেখায় না। কিছু আলো শুধু চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। সব শব্দের উত্তর শব্দ দিয়ে দিতে হয় না। কিছু ঝড়ের সবচেয়ে ভালো উত্তর জানালা বন্ধ করে দেওয়া। কিছু দূরত্ব সম্পর্ককে রক্ষা করে। কিছু নীরবতা মর্যাদাকে বাঁচিয়ে রাখে। আজ ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, সবাই যেন প্রতিনিয়ত প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে নীরবতাকে দুর্বলতা মনে করা হয়। অথচ ইতিহাস বলে, সবচেয়ে পরিণত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই সবচেয়ে শান্ত পরিবেশেই নেওয়া হয়। বুদ্ধ নীরবতার শক্তি জানতেন। রবীন্দ্রনাথ নিঃসঙ্গতার শক্তি জানতেন। জীবনানন্দ জানতেন, মানুষের সবচেয়ে গভীর সংলাপ অনেক সময় নিজের সঙ্গেই হয়।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। যে রাষ্ট্র প্রতিটি উত্তেজনায় প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে একসময় নিজের অগ্রাধিকার হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যে রাষ্ট্র জানে কখন কথা বলতে হয়, কখন অপেক্ষা করতে হয়, আর কখন কেবল পর্যবেক্ষণ করতে হয়-দীর্ঘ মেয়াদে তারাই স্থিতিশীল থাকে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্যের গতি আলোর গতির মতো, কিন্তু প্রজ্ঞার গতি এখনো মানুষের বিবেকের ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যুক্ত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বিভক্তও করেছে। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে এমনভাবে পরিচালিত করে যে আমরা ধীরে ধীরে শুধু নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। ভিন্নমত তখন আর যুক্তি নয়, শত্রু বলে মনে হয়।

এই প্রবণতা শুধু সমাজের জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্যও একটি নীরব ঝুঁকি। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি মতের মিল নয়; মতের ভিন্নতাকে ধারণ করার ক্ষমতা। বাংলাদেশের মতো একটি বহুমাত্রিক সমাজে তাই সহনশীলতা শুধু নৈতিক গুণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনারও অপরিহার্য শর্ত। আমরা যদি প্রতিটি মতপার্থক্যকে সংঘাতে পরিণত করি, তাহলে উন্নয়নের গতি থেমে যাবে। আর যদি ভিন্নমতকে আলোচনায় রূপ দিতে পারি, তাহলে সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

শেষ কথা

একজন প্রবীণ কূটনীতিক একবার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের পরিপক্বতা বোঝা যায় সে কত জোরে কথা বলে তা দিয়ে নয়; সে কত মনোযোগ দিয়ে শোনে তা দিয়ে।’ এই কথাটির ভিতরে আজকের বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমাদের এখন শুধু বিশ্বকে বোঝানোর প্রয়োজন নেই; বিশ্ব কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রয়োজন আছে। কারণ ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে পারে, ভবিষ্যৎও অনেক সময় তার পক্ষেই কথা বলে। চারটি প্রসঙ্গ-চীন ও মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব সংঘাত এবং নীরবতার দর্শন। আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন, কিন্তু মূল শিক্ষা একটিই। রাষ্ট্র পরিচালনা শেষ পর্যন্ত শক্তির নয়, চরিত্রের পরীক্ষা।

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। এই পরিবর্তনের ভিতরে বাংলাদেশের সামনে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি বিরল সুযোগও রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তা। সব দরজা খুলে রাখতে হয়, কিন্তু নিজের ঘরের চাবি কখনো অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা সবচেয়ে বেশি আওয়াজ করেনি; বরং সবচেয়ে স্পষ্টভাবে নিজেদের চিনেছিল।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : ভূ-রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্য

ড. মো. মিজানুর রহমান
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : ভূ-রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্য
চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়, যা দীর্ঘদিনের বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিক সম্প্রসারণ। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা এবং ভারত–চীন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান এখন আরও জটিল ও কৌশলগত হয়ে উঠেছে। ফলে এই সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য ও উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবেও গুরুত্ব বহন করে। সফরকে ঘিরে প্রধান প্রত্যাশা ছিল বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়নে চীনা অংশীদারি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, যা বাংলাদেশের দ্রুত অবকাঠামোগত অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাস্তব ফলাফলের দিক থেকে সফরটি কোনো একক বড় চুক্তির পরিবর্তে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি কৌশলগত ভিত্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ কাঠামো তৈরি করেছে। অবকাঠামো, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার ক্ষেত্র পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী চ্যালেঞ্জ—যেমন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, আর্থিক জটিলতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা—কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত–চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চীনের সঙ্গে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানই বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, উন্নয়ন অগ্রযাত্রা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামোতে ভারত ও চীন উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ, তবে ভিন্ন ভূমিকায়। ভারত প্রায় ১৫-১৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য অংশীদার, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বৃহত্তর বাণিজ্য ও অবকাঠামো সহযোগিতা থাকলেও প্রায় ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এ দুই সম্পর্ক পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ভিত্তি। গত এক দশকে চীনা অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪,৯০০ মেগাওয়াট থেকে ২৫,০০০ মেগাওয়াটের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সড়ক, সেতু, বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিদ্যমান সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন কৌশলকে আরও সুসংহত করার মধ্যে নিহিত। বিশেষ করে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদন বৈচিত্র্য এবং বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের শিল্পায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সংযোজন। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক অবস্থানের কারণে এটি ভবিষ্যতে রপ্তানি, লজিস্টিক ও শিল্প উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল চট্টগ্রামকে একটি আঞ্চলিক শিল্প ও রপ্তানি হাবে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে।
এছাড়াও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মংলায় একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও বন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আধুনিক শিল্প স্থাপন, রপ্তানিমুখী উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। ফলে চট্টগ্রাম, মংলা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত শিল্প ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ১৮–২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ ব্যবস্থাপনা, সুদের শর্ত, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায় যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো প্রকল্পে গড়ে ২০–৩০ শতাংশ সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি একটি সাধারণ প্রবণতা। তাই এসব সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ঋণ টেকসইতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগকে শুধু অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনমুখী শিল্পে সম্প্রসারণ করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ বৃদ্ধি করা এবং আনোয়ারার মতো অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। পাশাপাশি ঋণ টেকসইতা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে চীনের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ভারত ও চীন উভয়ই প্রভাবশালী শক্তি। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সফরটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব প্রয়োগকে আরও দৃঢ় করেছে।

বাংলাদেশের জন্য ভারত ও চীন—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তবে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে। ভারত প্রধান প্রতিবেশী ও অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার, আর চীন বৃহত্তম আমদানি উৎস, অবকাঠামো বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগী। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি দুই দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সীমিত সহযোগিতার পরিবেশ বিদ্যমান। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যকারী রাষ্ট্র হিসেবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

অবশ্যই। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়—আপনার দেওয়া লেখায় কিছু দাবি (যেমন নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তি "হতে যাচ্ছে" বা "সিদ্ধান্ত নিয়েছে") ভবিষ্যতমুখী ও বিতর্কিত। তাই গবেষণাধর্মী লেখার জন্য এগুলোকে সম্ভাবনা বা আলোচনাধীন উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করলে তা আরও নিরপেক্ষ হবে। নিচে মূল তথ্য ও বার্তা অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের আলোকে দুইটি অনুচ্ছেদ দেওয়া হলো।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য তিনটি মেগা সহযোগিতা—জে-১০সি (J-10C) যুদ্ধবিমান ক্রয়, চীনের সহায়তায় একটি আধুনিক সামরিক শিল্প কারখানা স্থাপন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্পৃক্ততা—বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য জে-১০সি ফাইটার জেট চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নতুন মাত্রা পাবে। একই সঙ্গে নিজস্ব সামরিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিদেশি নির্ভরতা কমে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভরতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অন্যদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, সেচ ও আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে এই তিনটি উদ্যোগই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, কারণ এগুলো ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারত-চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ফলে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও বাংলাদেশ বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করছে। এর মাধ্যমে একদিকে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা হচ্ছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই দুই সম্পর্ক পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের দুটি পৃথক কিন্তু পরিপূরক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে এই ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তেরই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর অবকাঠামো, বাণিজ্য ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে, যা মূলত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাভিত্তিক একটি বাস্তববাদী উদ্যোগ, কোনো রাজনৈতিক জোট নয়। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, পাকিস্তান সিপিইসি-এর মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেও অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার কারণে অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি তুলে ধরেছে। বিপরীতে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া চীনা বিনিয়োগ গ্রহণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত স্বাধীনতা ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশও একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ নীতিনির্ধারণ এবং দূরদর্শী কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শক্তিশালী প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা। প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত মনিটরিং, ঋণ টেকসইতা বিশ্লেষণ এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিশেষ করে চীনা বাজারে প্রবেশ বাড়ানো, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের ফলে বাংলাদেশের জন্য ব্রিকস (BRICS) এবং অন্যান্য উদীয়মান বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন যেহেতু ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, তাই বাংলাদেশের সঙ্গে তার বর্ধিত কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে ব্রিকস প্লাস কাঠামো, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) এবং এমনকি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে সীমিত অংশগ্রহণ বা পর্যবেক্ষক অবস্থানের সুযোগকে আরও বাস্তবসম্মত করতে পারে। একই সঙ্গে চীন মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও লজিস্টিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এসব প্ল্যাটফর্ম ও সংযোগ উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প অর্থায়ন, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি এবং জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে বহুপাক্ষিক কূটনীতি পরিচালনার সক্ষমতার ওপর।

সবশেষে বলা যায়, চীনের সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য একদিকে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বও তৈরি করেছে। এই অংশীদারিত্বের সফলতা নির্ভর করবে বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ওপর। বাংলাদেশ যদি এই ভারসাম্য সঠিকভাবে বজায় রাখতে পারে, তাহলে ভারত ও চীনের সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রেখেই টেকসই উন্নয়ন ও আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি সম্ভব হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

বাজেট পর্যালোচনা : কিছু পরামর্শ

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া
বাজেট পর্যালোচনা : কিছু পরামর্শ
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে সরকারের বাজেট ঘোষণার পর বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা একটি প্রথাগত ব্যাপার। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দেশের অর্থনীতিবিদ, চিন্তক ও বিদগ্ধজনের এসব আলোচনা-পর্যালোচনা থেকে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত মন্ত্রণালয় অথবা কর্তৃপক্ষ উপকৃত হন এবং বাজেটে কোনো ভ্রান্তি, দুর্বলতা, বৈষম্য কিংবা জনগণের ওপর কোনো অহেতুক চাপ বা অনাকাঙ্ক্ষিত বোঝা থাকলে তা সংসদে বাজেট পাশের আগেই সংশোধন করতে পারেন। সংসদ সদস্যরাও বাজেট অধিবেশনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করতে পারেন। 

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। ১১ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেট প্রণয়নের জন্য যথেষ্ট সময় না পেলেও জনকল্যাণমুখী, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহায়ক একটি বাজেট উপহার দিতে সরকারের সদিচ্ছা প্রশংসানীয়। তবে বৈশ্বিক অভিঘাত তথা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত কিংবা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তথা বাজেটকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এবারের বাজেটের আকার জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।

বাজেটের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। বাজেটের অর্থায়নের জন্য রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব ২৫ হাজার কোটি টাকা, করবহির্ভূত রাজস্ব (নন-ট্যাক্স রেভিনিউ) ৬৬ হাজার কোটি টাকা এবং অনুদান ধরা হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ঘাটতি পূরণের জন্য অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। উন্নয়নশীল দেশের জন্য বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশের কম হলে তা সহনীয়, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ রাজস্ব আয় না হলে ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে পারে, এমনকি ৫ শতাংশও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান।

আসন্ন বাজেট বাস্তবানের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পণ্য বাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন কৌশল বাস্তবায়ন ও অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীতকরণ ও মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কিছু দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের কথাও উল্লেখ করেছেন। যেমন ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণ, ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীতকরণ। একই সময়ের মধ্যে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশে এবং দেশের মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। প্রকাশ থাকে যে, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট বিনিয়োগ মাত্র জিডিপির ৩০ শতাংশের নিচে। 

পর্যালোচনা 
অর্থ বরাদ্দের দিক থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা ও সমাজকল্যাণ খাতকে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬২ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৪৫ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ৩৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। স্বাভাবিকভাবেই বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণ বিভিন্ন খাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্ড বিতরণ। এ ছাড়া চালু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ ও বর্ধিত হারে অর্থায়ন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সঠিক ব্যক্তিদের হাতে সরকারি সুবিধা পোঁছে—অর্থাৎ দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলীয় মনোবৃত্তি কাজ না করে। 

শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, এ খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ সংকুচিত হয়েছে। কৃষিভিত্তিক ৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেট বরাদ্দের ৪.৯৯ শতাংশ। কৃষি খাতের বরাদ্দ কমানো ভালো লক্ষণ নয়। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য মোট বাজেটের কমবেশি ১০ শতাংশ অর্থ কৃষি খাতে বরাদ্দ করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবা খাতের দুটি বিভাগে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি ভালো উদ্যোগ। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এটি প্রয়োজন। তবে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ যা-ই হোক, বাজেট বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে হবে। সে জন্য প্রথম দিকেই মন্ত্রণালয়ভিত্তিক রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, বছরের কোন কোয়ার্টারে কত ব্যয় করা হবে। অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে অধিক ব্যয়ের প্রবণতা অপচয় ও দুর্নীতির সম্ভাবনা টেনে আনে। এ ছাড়া, অনেক মন্ত্রণালয় বরাদ্দকৃত অর্থ সম্পূর্ণ খরচ করতে পারে না। এটিও এক ধরনের অপচয়।

এবার বাজেটের অর্থায়নের প্রধান উৎস রাজস্ব বাজেট নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রতিবছরই রাজস্ব আহরণের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আহরণ করে। কিন্তু বিগত প্রায় এক যুগ যাবত কোনো বছরই এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারে না। 

এনবিআরের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী চালু অর্থবছরে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হতে পারে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে। এনবিআর এর বর্তমান নীতি কাঠামো, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আগামী অর্থবছর ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ প্রায় অসম্ভব। তবে এনবিআর এর গতানুগতিক কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়াতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন অন্তত প্রতিটি জেলায় কর, ভ্যাট ও কাস্টমস অফিস সম্প্রসারণ, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এনবিআর অটোমেশনের জন্য বিগত প্রায় ৫০ বছরে ২০টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা, স্বচ্ছতার অভাব, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন তথা এনবিআর এর নিজস্ব কর্মচারী-কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে অনীহা ও সীমাবদ্ধতা প্রকল্পগুলোর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনতে পারেনি। সে জন্য অটোমেশনে এনবিআর এর নিজস্ব জনবল অধিক হারে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনবিআর এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বাড়াতে হলে সব পর্যায়ে অটোমেশন অপরিহার্য। এর মাধ্যমে কর ফাঁকি ও দুর্নীতি রোধ হবে। 

দ্বিতীয়ত, দেশের জনগণের মধ্যে কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কর আদায়কারী কর্মকর্তা ও করদাতাদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। জনগণের করভীতি দূর করতে হলে কর্মকর্তাদের দ্বারা করদাতাদের হয়রানি দূর করার প্রশাসনিক পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে। 

তৃতীয়ত, রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে করজাল সম্প্রসারণ। অধিক সংখ্যক করদাতা বাড়ানোর জন্য কর জরিপের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক-চাকরিজীবীদের আয় অটোমেশন তথা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রদান এবং কর অফিসের সঙ্গে সংযুক্তিসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা আনয়ন অপরিহার্য। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে রাজস্ব অফিসের সঙ্গে চাকরি ও ব্যবসা সংযুক্ত রয়েছে। ফলে কর আদায়ে কোনো অসুবিধা হয় না। 

চতুর্থত—রাজস্ব সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার, বিধি-বিধান পরিপালন ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। 

জনসাধারণের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বাজেট ঘোষণার পর যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে, সে জন্য চাল, গম, ভোজ্য তেল, চিনি, মাছ-মাংস, পেঁয়াজ, আদা, মসলাসহ ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎসে করহার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। শিশুখাদ্যের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং মসলার ক্ষেত্রে আরডি ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ (শূন্য) শতাংশ করা হয়েছে। বাজেট ঘোষণার পর দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়েনি। তবে শুল্কছাড়ের সুবিধা ব্যবসায়ীরাই ভোগ করবে, জনগণের ভোগ্যপণ্যের মূল্য কমার কোনো লক্ষণ নেই। আরো বেশ কিছু ব্যবসাবান্ধব সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য যেমন— মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এসি, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ ব্যবহার্য ইলেকট্রনিক পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানি ও দেশীয় বিক্রয় ও রপ্তানিতে শুল্ক অব্যাহতি ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়ছে। এ ছাড়া ফ্লোট গ্লাস আমদানিতে ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের উপকরণ আমদানিতে যাবতীয় শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া কম্পিউটার ও এর যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস খাতে আমদানি ও উৎপাদনের জন্য শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে পর্যাপ্ত শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে দেশীয় গাড়ি উৎপাদনে পূর্বে প্রদত্ত সুবিধাই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে দেশীয় উৎপাদিত গাড়ি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। একইভাবে কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আমদানিতে শুল্ক কমানোর ফলে এসবের দেশীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পসহ সকল প্রকার রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এনবিআর কর্তৃক বন্ড অডিট করা হবে না। অনেকের মতে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পখাতে যে সুবিধা সরকার দিয়েছে, তাতে তাদের লাভের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, জনগণ এক সুফল পাক বা না-ই পাক। বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানীকৃত কাপড়, কাগজ, অন্যান্য কাঁচামাল ইত্যাদি উৎপাদনের কাজে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রয় করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এনবিআর কর্তৃক সম্পাদিত বন্ড অডিট অনেকটা প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। অডিট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের সে ভয় আর থাকবে না। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আরো বৃদ্ধির সম্ভবনা দেখা দেবে।

দেশীয় কম্পানির করপোরেট করসহ বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সুবিধা পাঁচ বছর বা ততোধিক সময় অপরিবর্তনীয় রাখার ব্যবস্থা ব্যবসা-বাণিজ্যে ও বিনিয়োগে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের কর প্রদানের স্বচ্চতাও নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও সরবরাহে উৎসে কর্তিত কর অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এবারের বাজেটে উৎসে কর্তিত করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীদের করের বোঝা কম হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। 

এ ছাড়া তরুণ, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয় ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসএমই খাতের পুরুষ উদ্যোক্তাদের ৫০ লাখ এবং নারী ও প্রতিবন্ধীদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্জিত আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত থাকবে। এসবই ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ। কিডনি ডায়ালিসিস সেবা ও ক্যান্সারের ওষুধ প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ।

তবে এবারের বাজেটে মধ্যবিত্ত ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ওপর করের চাপ বাড়বে। আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার করা হয়েছে, যা গত বছর বাজেট প্রণয়নের সময়ই নির্ধারণ করা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার এ সীমা চার লাখ টাকায় উন্নীত করলে নিম্ন আয়ের করদাতাদের করভার কিছুটা লাঘব হতো। অপরপক্ষে নিম্নতম করহার ৫ শতাংশ উঠিয়ে দেওয়া এবং ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন স্ল্যাব এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যক্তি করদাতাদের করভার ১৫-১৭ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। ব্যক্তিশ্রেণির কর নির্ধারণে নিজ জমিতে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ কর নির্ধারণ জমির মালিক ও নির্মাণকারী ডেভেলপারদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে। 

রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের মতে, এবারের বাজেটে তারা ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আমদানীকৃত স্ক্র্যাপের ওপর শুল্কবৃদ্ধির ফলে রডের মূল্য বাড়ছে, টাইলস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ইত্যাদির ওপরও অতিরিক্ত ডিউটি বসানো রয়েছে। উপরন্তু কলকারখানায় ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ছে। তার ওপর নির্মিত ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপ জমির মালিক ও ডেভেলপার উভয়ের করের বোঝা বাড়াবে। ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধি পেলে ক্রেতা পাওয়া দুষ্কর হবে। রিহ্যাব সরকারকে উল্লিখিত করারোপ বাতিল করার জন্য অনুরোধ করেছে। 

প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বিনিয়োগকৃত সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ হারে করারোপ পেনশনার, ক্ষুদ্র ও মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা হিসেবে দেখা দেবে। যদিও সরকার বলছে, এটি অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচিত হবে এবং পরবর্তী সময়ে সমন্বয় করে কর নির্ধারণ করা যাবে। ব্যাংক হিসাবের সুদ, সঞ্চয়পত্র বা অন্যান্য বিনিয়োগের মুনাফা থেকে কর কেটে রাখা অনেকের মতে এনবিআরের একটি অনৈতিক কাজ। কর আদায় বৃদ্ধির জন্য এ সহজ কাজটির বিকল্প হিসেবে করজাল বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতির সুবিধা বন্ধ করা ইত্যাদি পদক্ষেপের ফলে অনেক বেশি রাজস্ব বাড়বে, যা এনবিআরের গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়ন এবং গতিশীল করার জন্য কর প্রদান ও রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা উঠিয়ে দিয়ে এনবিআর সারা বছর কর প্রদানের নিয়ম চালু করেছে। প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিশেষ প্রণোদনা ও আর্থিক ছাড় এবং তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে বিলম্বের মাসুল ও জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে করদাতারা বিলম্ব না করে যথাসময়ে কর প্রদানে উৎসাহিত হবেন।

এবারের বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য আগামী ৫ বছরের একটি কর কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এ কাঠামো অনুযায়ী ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত আয়সীমা আগামী ২ বছর বলবৎ থাকবে। ২০২৮-২৯ কর বর্ষ থেকে ২ বছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ সালের জন্য করমুক্ত আয়সীসা হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া কর আদায়কে প্রগ্রেসিভ হারে করার জন্য ২০২৮-২৯ করবর্ষ থেকে ৩৫ শতাংশের আর একটি উচ্চ স্ল্যাব সৃষ্টি করা হয়েছে। ৫ বছরের কর কাঠামোর পূর্বাভাষ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে।

বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতন্ত্রায়ণের জন্য এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্যে ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। 

এগুলো হচ্ছে— (১) সবার জন্য উন্নয়ন (২) মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা (৩) সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা (৪) বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি (৫) ব্যবসা সহজীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ (৬) আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা (৭) জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা (৮) তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ (৯) পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা (১০) দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। 

সে লক্ষ্যে বাজেটের প্রতিপাদ্যই ছিল, ‘গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’। তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো— ভঙ্গুর ব্যাংক খাত, দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি, বেসামাল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতির কতিপয় দুর্বল দিক। যেমন—বর্ধিত হারে ঋণের সুদ প্রদান, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষিতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রভাবে আমদানীকৃত দ্রব্যাদির উচ্চমূল্য। এসব মাথায় রেখে অর্থনীতির ‘ভঙ্গুর’ দশা দূর করার জন্য সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং অপচয় রোধ করে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই বার্ষিক বাজেট উন্নয়নের কার্যকর নিয়ামক হিসেবে পরিগণিত হবে।

লেখক : সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, সাবেক রাষ্ট্রদূত


 

মন্ত্রীর মর্যাদা ভারতে, বাংলাদেশে নিছক রাষ্ট্রদূত

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
মন্ত্রীর মর্যাদা ভারতে, বাংলাদেশে নিছক রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে মোদি সরকার ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ায় বাংলাদেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, টক শোব্যক্তিত্ব ও ইউটিউবার সাংবাদিক মনে হয় বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাঁদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, তাঁরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন যে ‘এবার কী হবে বাংলাদেশের?’ কথায় কথায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র দপ্তরে তলবের দিন শেষ! অথবা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দিল্লির নতুন চালে কী করবে ঢাকা!’ তাঁদের মতে, হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে ইউনিয়ন মন্ত্রী পদে উন্নীত করে ভারত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর তথা বাংলাদেশকে এমন বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে যে ভারত যদি কোনোভাবে বাংলাদেশের স্বার্থবিরুদ্ধ কিছু করে, তাহলে বাংলাদেশ সে বিষয়ে কৈফিয়ত চাওয়ার জন্য হাইকমিশনারকে ডেকে পাঠাতে পারবে না। ভারতের ওপর কোনো কারণে যদি বাংলাদেশের কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রয়োজনও পড়ে, তাহলে হাইকমিশনার উচ্চ পদমর্যাদার কারণেই বাংলাদেশ তা করতে পারবে না এবং কোনো সংকটকালে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর ক্ষেত্রে প্রোটোকলজনিত জটিলতার মধ্যে পড়বে ইত্যাদি। যদি প্রোটোকল কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে, তাহলে তা নিষ্পত্তির সহজ ও তাৎক্ষণিক উপায় হচ্ছে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে অভিজ্ঞ কোনো রাজনীতিবিদকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দিয়ে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা। তাহলেই তো হিসাব চুকে গেল। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকারও তাই করবে।

এ বিষয়ে ভিয়েনা কনভেনশন কী বলে?

কূটনৈতিক সম্পর্কবিষয়ক ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, ‘একটি রাষ্ট্র যখন অন্য রাষ্ট্রে তার রাষ্ট্রদূত পাঠায়, তখন গ্রহণকারী রাষ্ট্র প্রেরণকারী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের তার দেশের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রিত্বের পদবিকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য নয়।’ কনভেনশনের অধীনে ‘মিশনপ্রধানকে স্বাগতিক রাষ্ট্র একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে মর্যাদা দান করে। “মিশনপ্রধান” বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়, যাকে প্রেরণকারী রাষ্ট্র এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ করে যে তিনি ওই এখতিয়ার অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করবেন।’ এ সম্পর্কে ভিয়েনা কনভেনশন আরও স্পষ্ট করেছে যে ‘কোনো ব্যক্তি যদি প্রেরণকারী রাষ্ট্রে একজন অভ্যন্তরীণ মন্ত্রীও হন, তবু মিশনপ্রধান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বা ক্ষেত্রবিশেষে সরকারপ্রধানের কাছে তাঁর পরিচয়পত্র উপস্থাপনের পর গ্রহণকারী রাষ্ট্রে তাঁকে পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদাসম্পন্ন একজন কূটনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়, তাহলে এই মর্যাদা লাভের জন্য তাঁর অভ্যন্তরীণ মন্ত্রিত্বের পদবি আইনগত কোনো শর্ত নয়।’ ভারত এর আগেও একাধিক দেশে পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে তারা রাষ্ট্রদূত হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাগতিক দেশে মন্ত্রী হিসেবে নয়।

এই প্রেক্ষাপটে হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর ‘কেবিনেট মন্ত্রী’ উপাধি বাংলাদেশে তাঁর কূটনৈতিক পদমর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কোনো কারণ নেই। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তাঁর নিজ দেশে যে পদমর্যাদারই হোন না কেন, তাঁকে গ্রহণকারী দেশ তাঁর পদবির পার্থক্যনির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদা প্রদান করবে। দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে হঠাৎ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ব্যাপারটি এমন নয়। মিশনপ্রধান হিসেবে প্রেরণকারী রাষ্ট্রকে অবশ্যই গ্রহণকারী রাষ্ট্রের গোপন সম্মতি গ্রহণ করতে হয়েছে। ঢাকা থেকে সদ্য বিদায়ি ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় বর্মাকে তাঁর নতুন কর্মস্থল ব্রাসেলসে বদলি করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একজন রাজনীতিবিদ আরিফ মোহাম্মদ খানকে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হবে মর্মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের সূত্র উদ্ধৃত করে গত এপ্রিল মাসে ভারত ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। বিজেপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বিতর্কিত রাজনীতিবিদ আরিফ মোহাম্মদ খান ভারতীয় মুসলিমদের কাছে ‘চরম মুসলিমবিদ্বেষী মুসলিম’ এবং ‘আরএসএস এর শো’ বয় হিসেবে চিহ্নিত।

বিজেপি সরকার তাঁকে কেরালা ও বিহারের গভর্নর হিসেবে মনোনীত করেছিল। গভর্নর হিসেবে তাঁর নিয়োগের আগে উভয় রাজ্যে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আপত্তি উঠেছিল। ভারতীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে তাঁকে একজন ‘মুসলিম বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে মুসলমানদের অভিযোগ হলো, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে অশুভ ও ধ্বংসাত্মক ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে ১৯৮৬ সাল থেকে আরিফ মোহাম্মদ খান তাঁর মুসলিম পরিচয়কে নিজ সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য নয়, বরং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর আক্রমণ করতে, হিন্দু জনমতকে প্রভাবিত করতে এবং কংগ্রেস ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বিরুদ্ধে আরএসএস-বিজেপি জোটকে আদর্শগত শক্তি জোগাতে ব্যবহার করেছেন।

কী কারণে শেষ পর্যন্ত আরিফ মোহাম্মদ খানকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে, তা জানা না গেলেও বাংলাদেশে তাঁকে হাইকমিশনার পদে নিয়োগ করা হলে, দুই দেশের সম্পর্ক আরও অবনতি হতে পারত আঁচ করে, অথবা তাঁর সম্পর্কে বাংলাদেশের নিজস্ব মূল্যায়নও তাঁকে নিয়োগ না করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা যেতে পারে। আরিফ খানের পরিবর্তে বিজেপি সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং গত ১২ জুন তিনি তাঁর রাজনৈতিক কেন্দ্র কলকাতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে সড়কপথে বেনাপোল স্থলবন্দর অতিক্রম করেন। বেনাপোলে তিনি অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সঙ্গে ২০ কোটি (বাংলাদেশের) অ্যাড করেছি। ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না। দেখছেন না আমি হেঁটে চলে এসেছি। একই আকাশ একই বাতাস। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাইবোন। আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ...বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। যারা আমাদের ভাইবোন ও মা-তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

দিনেশ ত্রিবেদীর কথাগুলো বাংলাদেশের অনেকের ভালো লাগেনি। বাংলাদেশে যাঁরা ভারতবিরোধী, তাঁরা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। তাঁরা ভারতের ১৪০ কোটির সঙ্গে বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষকে যুক্ত করে সবকিছু একসঙ্গে করতে চান না। তাঁরা ভাইবোনও হতে চান না। এর আগে ২০১৯ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এম এ মোমেন ভারত সফরে গিয়ে সেখানকার সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন যে ‘ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর মতো।’ তাঁকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। বৃহৎ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক রক্ষা এবং পারস্পরিক স্বার্থেই তা জোরদার করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উভয় দেশের জন্য কল্যাণকর। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’বিষয়ক বক্তব্যের সাত বছর পর জাতীয় সংসদে বিএনপিদলীয় সদস্য জি এম সিরাজ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে বলেছেন, ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্স হতে পারে। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ প্রতিবেশী এবং প্রতিবেশীর সম্পর্কের ডিভোর্স হতে পারে না। প্রতিবেশীকে আমরা কখনো অস্বীকার করতে পারি না, না ভারত পারবে, না বাংলাদেশ পারবে।’ তিনি সম্মানজনকভাবে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্ব নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়াকে অনাকাক্সিক্ষত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর ভারতের খবরদারি করার কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো দেশের কূটনীতিকরা ভিয়েনা কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী ব্যাপক দায়মুক্তি পেয়ে থাকেন। তবে কোনো কোনো কূটনীতিক যে দেশে তিনি তাঁর দেশের হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন, সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর মতো ভূমিকা রাখলে বা অবাঞ্ছিত বক্তব্য প্রদান করলে, সেই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী প্রকাশ্যে বা গোপনে তৎপরতা চালানোর অভিযোগ উঠলে গ্রহণকারী রাষ্ট্র যেকোনো সময় মিশনপ্রধান বা মিশনের কূটনৈতিক কর্মীদের যেকোনো সদস্যকে ‘পারসন নন গ্রাটা’ বা অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ঘোষণা করে এবং এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা না করেই প্রেরণকারী রাষ্ট্রকে অবহিত করতে পারে যে মিশনপ্রধানকে বা মিশনের অন্য কোনো কর্মী গ্রহণযোগ্য নন। এ ধরনের ক্ষেত্রে, প্রেরণকারী রাষ্ট্র যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হয় প্রত্যাহার করবে, অথবা মিশনে তাঁর দায়িত্বের অবসান ঘটাবে। এমনকি কনভেনশনে কোনো কূটনীতিককে স্বাগতিক দেশে প্রবেশ করার আগেই তাঁকে অগ্রহযোগ্য ঘোষণা করতে পারে। দিনেশ ত্রিবেদী যা বলেছেন, তা তাঁর কূটনৈতিক দায়মুক্তির অবস্থান থেকেই বলেছেন। এ নিয়ে অহেতুক উদ্বেগ, সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করে দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করাই বাঞ্ছনীয় হওয়া উচিত।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক