• ই-পেপার

ইতিবাচক ধারায় স্বাস্থ্য খাত : বাজেটে নতুন সম্ভাবনা

ফুটবলপাগল বাংলাদেশ কেন বিশ্ব ফুটবলে এত পিছিয়ে?

অদিতি করিম
ফুটবলপাগল বাংলাদেশ কেন বিশ্ব ফুটবলে এত পিছিয়ে?

বাংলাদেশজুড়ে এখন চলছে ফুটবল উন্মাদনা। রাতভর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার উৎসব। গোটা দেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত, আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। অবশ্য এর বাইরেও কয়েকটি দলের সমর্থকও নেহাতই কম নয়। এমবাপ্পের ফ্রান্স, রোনালদোর পর্তুগাল, হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড, হাকিমির মরক্কো, চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির সমর্থক আছেন অনেক। এবারের বিশ্বকাপে দুটি ড্র করে হইচই ফেলে দেওয়া ৬ লাখ মানুষের দেশ নবাগত কেপ ভার্দের বাংলাদেশি সমর্থক নিশ্চিতভাবেই সে দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে শহর থেকে গ্রামে বড় স্কিনে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফুটবল খেলা দেখা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের খেলার দিন টিএসসি চত্বর যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলে রূপ নেয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নয়, বিভিন্ন স্তরের মানুষ খেলা দেখতে আসেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এখানে খেলা দেখতে এসে আপনি মনে করতেই পারেন হয়তো কোনো স্টেডিয়ামে খেলা দেখছেন। লিওনেল মেসির বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড করার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে এসে খেলা উপভোগ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাসের মধ্যে রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসো বলেন, ‘আমি নিজের দেশের মতো অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, আমি আর্জেন্টিনায় আছি।’ এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করা হয়। বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা সব হলে। ঢাবি ছাড়াও সারা দেশে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপ উপলক্ষে চলে জমকালো আয়োজন। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নয়, এখন পাঁচতারকা হোটেল থেকে বিভিন্ন ক্যাফে এবং রেস্টুরেন্টে চলছে বিশ্বকাপের বিশেষ আয়োজন। বাসাবাড়িতেও বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাত জেগে খেলা দেখার ধুম পড়েছে। তরুণ-তরুণীরা তাদের পছন্দের দলের জার্সি গায়ে খেলা উপভোগ করেন। অনেকেই পুরো বিশ্বকাপের সময় পছন্দের জার্সি পরেই থাকেন। সারা বাংলাদেশ যেন ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকায় ছেয়ে গেছে। তার ফাঁকফোকর দিয়ে কিছু ফ্রান্স, জার্মান ও পর্তুগালের পতাকা দেখা যায়। কয়েকটি গ্রাম তো আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকার সাজে সাজানো হয়েছে। এই দুই দলের সমর্থকরা দলের বিজয়ে মিছিল করেন। নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে মিষ্টি বিতরণ করেন। অনেকে আবার খেলা উপলক্ষে গরু খাসি কোরবানি দিয়ে সমর্থকদের আপ্যায়ন করেন। দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি এবং উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনাও ঘটছে। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় তো চলছে ট্রল আর কমেন্টের প্রতিযোগিতা।

বিশ্বকাপ যেন আমাদের সব ভুলিয়ে দিয়েছে দেড় মাসের জন্য। আমাদের চারপাশে অভাব অনটন, অনিশ্চয়তা, হতাশা আর উৎকণ্ঠা পাশে রেখে আমরা মেতে উঠেছি বিশ্বকাপ উন্মাদনায়। বিশ কোটি মানুষের এই দেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যিনি ফুটবল পছন্দ করেন না, কিংবা বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। এদেশের মানুষ ফুটবল পাগল। এই দেশে উৎসবের উপলক্ষ খুব কম। বিশ্বকাপ ফুটবল যেন আমাদের এক মহা উৎসবের আমেজ এনে দেয়।

কিন্তু ফুটবলপাগল এই দেশটি কখনো বিশ্বকাপ খেলেনি। বিশ্বকাপ তো দূরের কথা, স্বাধীনতার পর এশিয়া কাপ ফুটবল খেলেছিল একবার ১৯৮০ সালে। এ বছর নারী ফুটবল দল নারী এশিয়া কাপ ফুটবলে অংশগ্রহণ করে। সাফ ফুটবলেও আমাদের রেকর্ড ভালো না। ২০০৩ সালে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তারপর এই আসরেও আমাদের সাফল্য নেই। ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১। কোটি ভক্তের এই দেশে ফুটবলের কেন এমন করুণ দশা?  ফিফার এক গবেষণায় জানা যায়, একটি দেশের ফুটবলের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো দর্শকদের। কোনো দেশে যদি ফুটবল জনপ্রিয় হয় তাহলে সেই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণা কতটা সঠিক? বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের সঙ্গে তুলনীয়। কিন্তু তবুও কেন আমাদের ফুটবল রুগ্ণ, মৃতপ্রায়? বিশ্বকাপ নিয়ে এত উত্তেজনার মধ্যে আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।  বাংলাদেশের ফুটবল এখনো যে টিকে আছে সেটা দেশের বৃহত্তম শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরার অবদান। বসুন্ধরা বাংলাদেশের ফুটবলের এখন একমাত্র ভরসা।

দুনিয়াজুড়ে দেশে দেশে ফুটবল সংস্কৃতির অভিভাবক হলো ক্লাব। সেই প্রথম থেকেই ফুটবলকে লালন-পালন, নতুন প্রতিভার বিকাশ, ধারাবাহিকতার সঙ্গে খেলোয়াড় সৃষ্টি এবং খেলাকে জনপ্রিয় করার পেছনে ফুটবলের প্রাণভোমরা ক্লাবগুলোর অবদান সব সময় স্মরণীয়। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আর্সেনাল, ম্যানসিটি প্রভৃতি অ্যাকাডেমির কার্যক্রম তো ফুটবল দুনিয়ার আলোচিত এবং অনুকরণীয়।  স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ক্লাবগুলো কখনো পরিকল্পনামাফিক একদম ‘এন্ট্রি লেবেল’ থেকে খেলোয়াড় সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি। স্থানীয় রেডিমেড এবং বাফুফের অনুমোদিত খেলোয়াড়রাই ভরসা। এতে দেশের ফুটবল স্বাবলম্বী হতে পারেনি। গত ৫৩ বছরের ফুটবল মাঠের ছবি দেশের ফুটবলের সঙ্গে প্রতারণার দলিল। এই অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করে বসুন্ধরা গ্রুপ। বসুন্ধরা কিংস প্রথম স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পেশাদার ফুটবল ক্লাব। যারা বিশ্বে ক্লাব ফুটবলের আদলে বাংলাদেশের ফুটবল কাঠামোকে পাল্টানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ক্লাবটি দেশের ফুটবলের প্রেক্ষাপট এবং রং পাল্টে দিয়েছে। প্রথম থেকেই হেঁটেছে ফুটবলে সংস্কারের পথ ধরে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমে ক্লাবটি দেশের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এবং এর বাইরে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশে একমাত্র ‘সত্যিকারের পেশাজীবী’ ক্লাব হিসেবে আলোচনার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে। ঘরোয়া পেশাদার ফুটবল লড়াইয়ে সাফল্যের ক্ষেত্রে অতীতের সব ধরনের রেকর্ড ভঙ্গ করে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। আধুনিক চিন্তা-ভাবনায় উজ্জীবিত ক্লাবটি প্রথম থেকেই দেশের ক্লাব ফুটবলে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে। ক্লাবটি হতে পেরেছে অন্যান্য ক্লাবের কাছে আদর্শ। ক্লাবটি দেশের ফুটবলের প্রেক্ষাপট এবং রং পাল্টে দিয়েছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মানোন্নয়ন, ক্রীড়াচর্চাকে পৃষ্ঠপোষকতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পেছনে আছে গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের খেলাধুলার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং ভালোবাসা। কিন্তু বসুন্ধরার মতো অন্য কোনো শিল্প উদ্যোক্তা বা শিল্পগোষ্ঠী ফুটবলের মান উন্নয়নে এগিয়ে আসেনি। এটা দুঃখজনক। বসুন্ধরা কিংস ছাড়া অন্য ক্লাবগুলো এখনো পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করতে পারেনি। আবাহনী, মোহামেডান কিংবা ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো একসময়ের জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর নির্দিষ্ট আয়ের উৎস নেই। চাঁদা এবং ক্লাবে হাউজি খেলার টাকা দিয়ে ক্লাব কোনোরকমে চালানো যায় হয়তো কিন্তু ফুটবলের মান উন্নয়ন করা যায় না। বাংলাদেশে কমবেশি ত্রিশটির মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আছে। প্রত্যেকে যদি একটা ক্লাবের দায়িত্ব নেয়, বসুন্ধরা কিংসের আদলে ক্লাব গড়ে তোলে তাহলে আমাদের ফুটবলের সুদিন আসতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। এজন্য শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলতে হবে সরকারকে।

পাশাপাশি কৈশোর থেকে ফুটবলার গড়ে তোলার জন্য গড়ে তুলতে হবে ফুটবল একাডেমি। এই একাডেমি সারা দেশ থেকে ফুটবল প্রতিভা খুঁজে বের করবে। তাদের পরিপূর্ণ এবং সমন্বিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগামী দিনের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলবে। এসব একাডেমি হবে ভবিষ্যতের সেরা ফুটবলার সৃষ্টির কারখানা। বর্তমানে বাংলাদেশে বসুন্ধরা ফুটবল একাডেমি এবং বিকেএসপি ছাড়া আর কোনো একাডেমি নেই। এ ধরনের একাডেমি গড়ে তুলতে না পারলে শুধু ফুটবল নয়; কোনো খেলারই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এসব একাডেমি হবে ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিভা বিকাশের মূল ভিত্তি। এ ধরনের ক্রীড়া একাডেমি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে। যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের উদ্যোগ নেবে তাদের দিতে হবে বিশেষ প্রণোদনা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

বাংলাদেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাফুফে (বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন)। বাফুফেকে ফুটবলের মান উন্নয়নে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশের ফুটবল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়নি। ফুটবল বিকাশের একমাত্র পরীক্ষিত উপায় হলো ক্লাব ফুটবলের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।

বর্তমান ফুটবল যুগের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন চলছে। এই মেসিকে কিন্তু আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন তৈরি করেনি, করেছে বার্সেলোনা। ছোটবেলায় শারীরিক বৃদ্ধি-সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগা এক লাজুক ছেলের বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প রূপকথাকেও হার মানায়। শৈশবে গ্রোনদোলি ও নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজে খেলার সময় তার গ্রোথ হরমোন সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসার খরচ বহন করতে না পারায় মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি স্পেনে পাড়ি জমান এবং বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেন। আজকের মেসির জন্ম হয় আসলে বার্সেলোনা ক্লাবে। শুধু মেসি নন, সব ফুটবল তারকার আসল জীবন শুরু হয় ক্লাব থেকে। বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন জীবন দিতে হলে ক্লাব ফুটবলের জাগরণ ঘটাতে হবে।  মৃতপ্রায় ফুটবলকে বাঁচিয়ে রেখেছে বসুন্ধরা কিংস। দেশের ফুটবলের জাগরণ ঘটাতে হলে বসুন্ধরার মতো আরও পরিপূর্ণ ক্লাব গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে বাফুফে এবং সরকারকে দিতে হবে সহযোগিতা। একটি পরিকল্পনার আলোকে আমাদের ফুটবলকে ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা খেলাধুলাকে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। কোটি কোটি ফুটবলভক্তের এই দেশে ফুটবল এত পিছিয়ে থাকবে, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

অদিতি করিম, লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : [email protected]

সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল জরুরি

মন্‌জুরুল ইসলাম
সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল জরুরি

চার মাস বয়সি সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বিরোধী দল। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারকে বেশি দিন সময় দেওয়া হবে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বললেও এটাই তাঁদের মনের কথা। সেভাবেই তাঁরা অগ্রসর হচ্ছেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। অবশ্য দেশের জনগণ তাঁদের প্রতি ১৯৭১ সাল থেকেই সতর্ক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দল বিএনপি নেতা-কর্মীরা কতটুকু সতর্ক সেটাই দেখার। সরকার পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে দুই স্তরবিশিষ্ট দেয়াল তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কাউকে মন্ত্রী করেছেন আবার কাউকে উপদেষ্টাও নিয়োগ দিয়েছেন। সেই দুই স্তরের দেয়াল ভেদ করেও অনেক ভুলত্রুটি ইতোমধ্যে দেশবাসীর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। অপ্রিয় সত্য এখনো অনেকে সাহস করে বলতে পারছেন না। কারণ সত্যকথনে শত্রু বাড়ে। রাজনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতার বাইরে থাকেন তখন তাঁদের সামনে অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বলা যায়। তাঁরাও হাসিমুখে সেই সত্য কথাটি শুনতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁরাই যখন ক্ষমতাবান হন তখন সত্য কথা হজম করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। চারপাশে চাটুকারবেষ্টিত হয়ে থাকার কারণে সত্য হজম করতে পারেন না। পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক এপিএস নামক সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরদের কারণে তাঁরা অন্য কারও কথাকে গুরুত্ব দেন না। শেষ পর্যন্ত এদের কারণেই ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। সে কারণে সরকারকে শুধু মন্ত্রী, উপদেষ্টাবেষ্টিত থাকলেই হবে না। সত্য কথা বলতে পারে, কোনটা ভুল, কোনটা সঠিক সেটা যারা বুঝতে এবং সাহস করে বলতে পারে এমন একটি সেলও গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ইতোমধ্যে সারা দেশে মন্ত্রী-এমপিদের স্বজন ও এপিএসের সুকর্ম-কুকর্ম জনগণকে ভাবিয়ে তুলছে। তাই বিরোধী দলের হুঁশিয়ারির আগে নিজেদের হুঁশ হতে হবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু ক্ষমতা নয়, আত্মসমালোচনার সক্ষমতা। যে সরকার নিজের ভুল দেখতে পারে, সমালোচনা গ্রহণ করতে পারে এবং সময়মতো সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সেই সরকারই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করে। অন্যদিকে ক্ষমতার চারপাশে যখন চাটুকারের বৃত্ত তৈরি হয়, তখন ভুলগুলো ধীরে ধীরে বড় বিপদে পরিণত হয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারকে ঘিরে নানান ধরনের আলোচনা দেখা যাচ্ছে। একদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরও বলেছেন, সরকারকে বেশি সময় দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন, যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ দুই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দুটি দিক সামনে নিয়ে আসে। একদিকে রয়েছে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টির চেষ্টা, অন্যদিকে সরকারকে স্থিতিশীলভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার অপরিহার্যতা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সরকারকে সময় দেওয়া হোক বা না হোক, সরকারের ভিতরে ভুলত্রুটি থাকলে সেগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন করা জরুরি। কারণ সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ সব সময় বিরোধী দল নয়; অনেক সময় সরকারের ভিতরের দুর্বলতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং সুবিধাভোগী চক্রই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, জনপ্রিয় সরকারও শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে। ক্ষমতার আশপাশে এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা নিজেদের স্বার্থে সরকারের ভাবমূর্তি ব্যবহার করে। মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠজনেরা কখনো কখনো এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, যার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো কোনো মন্ত্রী, এমপি ও তাঁদের স্বজন কিংবা ব্যক্তিগত সহকারীর (এপিএস) বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগ সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আবশ্যকতা থাকলেও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই যে এ ধরনের ঘটনা জনগণের মধ্যে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণ মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে শুধু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বা মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত দিয়ে নয়। তারা বিচার করে মাঠপর্যায়ে কী ঘটছে, ক্ষমতার আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা কী করছেন। এ কারণেই সরকারের ভিতরে একটি কার্যকর ‘ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল’ গঠন করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। এ সেলের কাজ হবে সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সমালোচনা ও জনগণের অসন্তোষের কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা। এটি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা হবে না, কোনো রাজনৈতিক প্রচার ইউনিটও হবে না। বরং এটি হবে সত্য অনুসন্ধানী একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কাঠামো, যার প্রধান কাজ হবে সরকারের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংশোধনের পথ দেখানো।

সাধারণত সরকারপ্রধানকে খুশি করতে তাঁর কাছে ইতিবাচক তথ্যই বেশি পৌঁছে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মীরা প্রায়ই সাফল্যের খবর তুলে ধরতে আগ্রহী থাকেন। কিন্তু ব্যর্থতা, অসন্তোষ বা দুর্নীতির তথ্য অনেক সময় গোপন থেকে যায়। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে বাস্তব চিত্রের পরিবর্তে একটি সাজানো চিত্র উপস্থিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। একটি ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল এ সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ সেলে প্রশাসন, অর্থনীতি, গণমাধ্যম, সমাজবিজ্ঞান ও সুশীল সমাজের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাঁরা নিয়মিতভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রকল্পের কার্যক্রম মূল্যায়ন করবেন। কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে, কোথায় জনভোগান্তি বাড়ছে, কোথায় নীতিগত দুর্বলতা রয়েছে এসব বিষয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দেবেন। বিশেষ করে মন্ত্রী, এমপি, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও এপিএসদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু সময় দেখা যায়, কোনো মন্ত্রী বা এমপি ব্যক্তিগতভাবে সৎ হলেও তাঁর আশপাশের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেন। ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগবাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে এপিএস হয়ে ওঠেন মন্ত্রী-এমপির চেয়ে ক্ষমতাবান। এসব কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়েই বর্তায়।

বিশ্বের অনেক দেশেই ক্ষমতাসীনদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ নৈতিকতা কমিশন বা অভ্যন্তরীণ তদারকি কাঠামো রয়েছে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, সরকারের ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে অনেক সময় বিরোধীদের চেয়ে ক্ষমতার আশপাশে থাকা অসাধু ব্যক্তিরাই বেশি ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে সরকার পরিচালনার কাজে বহু উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকে আরও কার্যকর করা। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা থাকলেই হবে না; সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও কিছু মানুষের প্রয়োজন। এমন মানুষ দরকার, যারা কোনো ভয় বা সংকোচ ছাড়াই সত্য কথা বলতে পারবেন। যারা শুধু সরকারের প্রশংসা করবেন না, বরং প্রয়োজনে সরকারের সিদ্ধান্তের দুর্বলতাও তুলে ধরবেন। রাজনীতিতে একটি প্রচলিত কথা আছে-ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো মানুষ সত্য বলা বন্ধ করে দেয়। শাসকের চারপাশে তখন এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে সবাই সন্তুষ্টির খবর শোনাতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রকৃত উপকার করেন সেই ব্যক্তি, যিনি সাহসের সঙ্গে ভুলগুলো চিহ্নিত করেন। কারণ ভুল জানা গেলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে; কিন্তু ভুল আড়াল করা হলে তা একসময় সংকটে পরিণত হয়।

বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতায় বাংলাদেশ নানান ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সব ক্ষেত্রেই সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জনগণের আস্থা ধরে রাখা। আর জনগণের আস্থা ধরে রাখার অন্যতম উপায় হচ্ছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল সেই জবাবদিহিতার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এটি সরকারের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার জন্য নয়; বরং সমালোচনার ভিতরে থাকা সত্য খুঁজে বের করার জন্য। এতে সরকার যেমন নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হবে, তেমন অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সত্য বলার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের জন্যও সেটি প্রযোজ্য। যে সরকার নিজের ভুল শুনতে রাজি থাকে, সেই সরকারই শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী হয়। তাই সরকারের চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী নয়, সত্য বলার সাহসী মানুষও থাকা দরকার। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল গঠন সেই লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় সতর্কতা, আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। মন্ত্রী, এমপি, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি সরকারের প্রকৃত শক্তি তার ভুল না হওয়ায় নয়; বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সংশোধন করার সক্ষমতায়। সেই সক্ষমতা অর্জনের জন্যই সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল প্রয়োজন।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় : প্রত্যাশা ও অর্জন

ড. মো. মিজানুর রহমান
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায় : প্রত্যাশা ও অর্জন
সংগৃহীত ছবি

বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পুনর্বিন্যাস এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক অংশীদারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ একদিকে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ ঘাটতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এই বাস্তবতায় অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দেশটিতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বা সৌজন্যমূলক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে সফরটি প্রত্যাশা, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ঘটনা হিসেবে স্থান করে নেয়।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর। স্বাধীনতার পর থেকে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশ এবং সম্ভাবনাময় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে বাণিজ্য, শিক্ষা, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়।

বিশেষ করে ১৯৮০-এর দশক থেকে মালয়েশিয়ার দ্রুত শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বিপুল পরিমাণ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হয়। বাংলাদেশ এই শ্রমবাজারের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্ক কেবল শ্রমবাজারনির্ভর না থেকে শিক্ষা ও জ্ঞান বিনিময়েও বিস্তৃত হয়। বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করার সুযোগ পায়।

একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন মডেল এবং অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল অতীতের সহযোগিতার ওপর নয়, বরং ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির ধারণা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের সময়কালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে দেখা হয়। তার সময়ে উন্নয়নশীল মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। সেই ধারাবাহিকতায় মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও বিকশিত হতে শুরু করে, যদিও তখন তা সীমিত পরিসরে ছিল। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় মালয়েশিয়ার সঙ্গে শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থান লাভ করে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় অবদান রাখে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগও বৃদ্ধি পায়।

তবে এই পর্যায়ের সম্পর্ক মূলত শ্রমশক্তি রপ্তানিকেন্দ্রিক ছিল এবং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর বা শিল্পভিত্তিক সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবুও এই সময়কালে গড়ে ওঠা মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সংযোগ পরবর্তী সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল বেশির ভাগ ভারত কেন্দ্রিক ফলে মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম দেশগুলোর সাথে দেশের অর্থনৈতিক সংযোগে তেমন বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। অথচ রোহিঙ্গা সংকটের সময় মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায়।

তবে বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে প্রত্যাশিত মাত্রায় মালয়েশীয় বিনিয়োগও দেশে প্রবাহিত হয়নি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে সম্ভাবনা থাকলেও তা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সম্পর্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও অর্থনৈতিক গভীরতা এখনো সম্ভাবনার তুলনায় সীমিত রয়ে গেছে। এই বাস্তবতাই সাম্প্রতিক সফরকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে শ্রমবাজার নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশীদারি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়ার নির্বাচন কেবল কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক বার্তা বহন করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্প্রসারণের ইঙ্গিত এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়ায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য শুধু শ্রমবাজার নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, হালাল শিল্প এবং উচ্চমূল্যের উৎপাদন খাতে মালয়েশিয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে এই সফরকে কূটনৈতিক সৌজন্যের পাশাপাশি একটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা যায়। একই সঙ্গে এই সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুমুখীকরণের একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন অংশীদার খোঁজার যে বৈশ্বিক প্রবণতা রয়েছে, বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছে। সফরকালে মালয়েশিয়ার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক অংশগ্রহণ দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। 

বৈঠক ও আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে উভয় দেশই সম্পর্ককে আরো গভীর ও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। অতীতে শ্রমবাজার, অভিবাসন নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যে কিছু টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, এই সফর তা প্রশমিত করে নতুন করে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে।

মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ছিল বহুমাত্রিক। শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন—সবকিছু মিলিয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক অগ্রগতির লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ছিল শ্রমবাজার। মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং ভিসা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থানই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় এই খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে মালয়েশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ চেয়েছে যে মালয়েশিয়ার বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো দেশটিকে একটি উৎপাদন ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করুক। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং শিল্প উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাণিজ্য সম্প্রসারণও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল, যেখানে বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চায়, কারণ বর্তমান বাণিজ্য কাঠামো এখনো ভারসাম্যহীন।

শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রত্যাশা ছিল। কারিগরি প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানবসম্পদকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য ছিল। একই সঙ্গে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও আলোচনায় ছিল।

এই প্রত্যাশার বিপরীতে দুই দেশ শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে মালয়েশিয়ার মনোভাব বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের চেয়ে ভবিষ্যৎ সুযোগের দিকেই বেশি অগ্রগতি দেখা গেছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদন শিল্প, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও এগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কাঠামো তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৈচিত্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ কর্মসূচির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে।

এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো তাৎক্ষণিক চুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক আস্থা ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী হওয়া। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনেক সময় এই আস্থাই পরবর্তী বড় অর্থনৈতিক চুক্তির পথ তৈরি করে। এই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা; নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর খাতে শ্রমশক্তির সরবরাহ এবং পাশাপাশি মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প উৎপাদন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিল্প দক্ষতা উন্নয়ন এবং হালাল শিল্পে সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এসব আশ্বাসের বাস্তব মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে, ঘোষণার মাধ্যমে নয়।

বর্তমান সফরে বাংলাদেশ নিজেদেরকে শুধু শ্রমশক্তির উৎস নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় উৎপাদন ও বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং যৌথ শিল্প উদ্যোগের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে দেশটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হতে চায়। এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে সম্পর্ক শ্রমবাজারনির্ভর কাঠামো থেকে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হতে পারে।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময় হলেও এর স্থায়িত্ব ও গভীরতা নিশ্চিত করতে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব, যেখানে অতীতে মধ্যস্বত্বভোগী, উচ্চ খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ না থাকা—যেমন ভূমি ব্যবস্থাপনা জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—মালয়েশিয়ার মতো বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতাও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, কারণ বাংলাদেশ আমদানি বেশি করলেও রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবও সম্পর্কের স্থিতিশীল অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুই দেশের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও ফলাফলভিত্তিক কাঠামোয় নিয়ে আসা প্রয়োজন। একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সেবা খাতকে একক কাঠামোয় আনা যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশি কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়বে। যৌথ বিনিয়োগ তহবিল গঠন করে অবকাঠামো, জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ করা যেতে পারে। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন—যেমন সরাসরি বিমান ও সমুদ্রপথ সংযোগ—ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রকৃত অর্থনৈতিক অগ্রগতি নির্ভর করে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের ভূমিকার ওপর।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক এখন একটি নতুন অর্থনৈতিক পর্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাৎক্ষণিক বড় অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা ও নীতিগত ভিত্তি তৈরি হওয়া, যার ওপর ভবিষ্যৎ সহযোগিতা দাঁড়াতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, কাঠামোগত সংস্কার এবং কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা। সঠিকভাবে এগোতে পারলে এই অংশীদারিত্ব শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের সমন্বয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সেতুবন্ধনে পরিণত হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

কান্নায় মোড়ানো অতীত

আবু তাহের

অনলাইন ডেস্ক
কান্নায় মোড়ানো অতীত

পেছন ফিরে তাকানো মানে অতীতপানে দেখা এবং না-দেখার বড়াই করা কারো কারো অভ্যাস। উভয় প্রকৃতির মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি। একজনের সঙ্গে তো বছর চারেক মেসজীবনও কাটিয়েছি। সজ্জন ছিলেন সেই নূরুল ইসলাম। যার ঘরোয়া নাম নূরু। আজ, বহু বছর পর পিছন ফিরে দেখতে পাই : ১৯৭২ সালের অক্টোবরে তীক্ষ্ণ যৌবনপুষ্ট চার বন্ধু পেয়ারু, হেলাল, বাদল ও আমি বাসস্থান খুঁজছি। সন্ধানও পাচ্ছি। কিন্তু বাড়িওয়ালা যে-ই না জেনে গেলেন যে হবু ভাড়াটেরা ব্যাচেলর অমনি বেঁকে বসলেন, ‘মাফ চাই বাবাজীবনরা! ফ্যামিলি নাই, ম্যারিজ করে নাই এরকুম কাউরে বাড়ি দিবার পারুম না।’ বিস্তর সাধ্যসাধনার পর নরমদিল বাড়িওয়ালা একজন পাওয়া গেল বটে, তবে তার দর শুনে উঠল গায়ে কম্পজ্বর।

প্রতি কামরায় কোনো রকমে দুই ব্যক্তির শয়নব্যবস্থা করা যায়, দুই কামরা আর বারান্দায় টেবিল পেতে আহার গ্রহণ সম্ভব। এ ধরনের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া সাড়ে তিনশ’ টাকা। পঞ্চাশ টাকা কম দেওয়ার প্রস্তাব দিই আমরা। বলি, চাচা আমরা অল্প বেতনের চাকুরে। একটু মেহেরবানি করেন। বাড়িওয়ালা জানান, তার পক্ষে মেহেরবান হওয়া অসম্ভব। তার সংসার বিরাট। ঘরজামাই পুষছেন, নাতিনাতনি আছে তিনটা, আছে গ্র্যাজুয়েট দুই খাটাস (অর্থাৎ তার ছেলে), যাদের নীতি ‘বাবার হোটেলে খাই/কোনো চিন্তা নাই।’ এরা পাড়ায় মাস্তানি করে বেড়ায়। সন্ত্রাসের মামলায় আসামি হয়। পুলিশের ভয়ে গা-ঢাকা দেয়। প্রতি তিন মাস অন্তর এরকম অবস্থা দাঁড়ায়। তখন তারা পিত্রালয়ের বাইরে আত্মগোপনে থাকে। ওদের আত্মগোপনের সময়কালেই কেবল তার কলিজায় একটু ঠান্ডা বাতাস লাগে।

আমরা মরছি যন্ত্রণায় আর বাড়িওয়ালা শোনাচ্ছেন অপদার্থ দুই পুত্রপ্রাপ্তিজনিত বেদনার কাব্য। পেয়ারু বলে, বাড়ি জোগাড়ের জন্য মনে হচ্ছে আমাদেরও মাস্তানিতে নামতে হবে চাচা। তিনশ’ টাকায় কোথায় বাড়ি পাই যদি খোঁজ দিতেন...। বাড়িওয়ালা বলেন, ‘তা তো পারব না বাবা। তবে তোমরারে একটা বুদ্ধি দিবার পারি। আরো একজন পার্টনার নাও। পাঁচজনে মিলা বাড়ি নিলে মাথাপিছু ভাড়া পড়বে ৭০ টাকা।’ আমরা রাজি। অগ্রিম ভাড়া বাবদ দেড়শ’ টাকা দেওয়া হলো। স্বস্তিতে যেন জ্বর নেমে গেল। মগবাজার রেলক্রসিং লাগোয়া ঘুমটি ঘরের বেঞ্চিতে বসে চায়ের অর্ডার দিলাম আমরা। কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে চা বানাচ্ছেন দোকানি। পেয়ারু হঠাৎ বলে ‘ইউরেকা’!

দোকানের টিনের দেয়ালে সাঁটানো ৭ ইঞ্চি আকৃতির সাদা কাগজে মোটা হরফে লেখা-‘সঙ্গী হিসেবে থাকার জন্য মেস খুঁজছি। সন্ধানপ্রার্থী : নূরুল ইসলাম, ফোন নং...।’ হেলাল বলে, কী বুঝলি? দুর্ভাগ্য কখনো একা আসে না। এক্কেরে হাঁচা কথা। এখন বোঝা গেল, সৌভাগ্যও দোকলা হইয়া আসে। ঘর পাইছি। ঘরবসতের সাঙাতও পাইলাম! বাদল বলে, ‘এখনই নাচিস না। নূরুলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। দেরি করলে অন্য জায়গায় ফিটিং দিয়ে ফেলতে পারে।’ এক ঘণ্টার মধ্যে ফোনে কথা হলো। নূরুল ইসলাম এজিবির উচ্চমান সহকারী। সে জানায়, এটা সৌভাগ্য যে আমাদের মতো ভদ্রজনদের সঙ্গে বসবাসের সুযোগ রাব্বুল আলামিন তাকে দিলেন।

২. দিন সাতেকের মধ্যেই আমরা নূরুল ইসলামের গুণমুগ্ধ হতে শুরু করি। ফলত, বাদল তাকে ‘নূরু ভাই’ বলে সম্বোধন করে। নূরুও বলে ‘বাদলদা’। নিজগুণে মেসের ম্যানেজার পদে উন্নীত হয় সে। বলে, ওয়াইফের খুব দুঃখ কেরানিগিরি করছি। এবার তাকে চিঠি লিখে জানাব, ‘সখী, ম্যানেজার হয়েছি মেসে/ফুর্তিতে গাও গীত ঝেড়ে গলা কেশে।’ ম্যানেজার নূরুর ফর্মুলা মেনে আমরা সপ্তাহে দুই দিন গরুর গোশত, দুই দিন খাসির গোশত, দুই দিন মাছ, দুই দিন মুরগি আর এক দিন নিরামিষ তরকারি খাই।

তখন উৎকৃষ্ট গরুর গোশতের সের (কেজির প্রচলনের আগে) সাড়ে তিন টাকা। সাধারণ গরুর গোশত পাওয়া যেত প্রতি সের তিন টাকায়। একবার গভীর রাতে নূরুর কান্নার আওয়াজে আমার ঘুম ভেঙে যায়। পৃথক বিছানায় নূরু আর আমি থাকতাম একই কামরায়। ‘কাঁদছো কেন?’ জানতে চাইলে সে বলে, ‘স্বপ্নের ভিতর কাঁদছিলামরে।’ মাস কয়েকের মধ্যেই লক্ষ্য করি, যেদিনই নিরামিষ খেতাম আমরা, সেদিন গভীর রাতে নূরু কাঁদে। তবে কি সপ্তাহের বিশেষ দিনেই স্বপ্নের ভিতর কেঁদে ওঠা নূরুর জন্য নিয়ম করে দিলেন বিধাতা?

বিষয়টি আমাদের খুব ভাবায়। আমরা স্থির সিদ্ধান্তে এলাম : ওর এই কান্না ঘুমের ভিতরকার কান্না নয়। এক রাতে খাবার খাওয়ার পর মেসের সব বাসিন্দা বাড়ির সামনের মাঠে গল্প করছিলাম। এ সময় পেয়ারু বলে, আচ্ছা নূরু, তুমি নিরামিষের রাতে কেন কান্না কর? নূরু বলে, পেছন ফিরে তাকালে অনেকে আনন্দে ভাসে। ফেলে আসা দিনগুলোর সুখদায়ক স্মৃতি নাড়াচাড়া করে মানুষ প্রফুল্ল হয়। তখন মনে মনে তো হাসেই, সশব্দেও হেসে ওঠে। আবার পরাগ ছড়ানো স্বপ্ন ভরানো দিন আর আসবে না, এই বোধ তাকে কাঁদায়ও খুব। আমি কাঁদি দুঃখদিনের ঘটনাগুলোর দিকে তাকিয়ে, স্মৃতির ধাক্কায়।

কান্নায় মোড়ানো অতীতবলতে বলতে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে নূরুল ইসলাম। হেলাল তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই কান্নার দমক প্রবল হয়ে ওঠে। পরদিন সকালে নাশতার টেবিলে আবার ওর কান্নার প্রসঙ্গ আসে। নূরু জানায়, নিম্নবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। ছয় বছর বয়সে মা মারা গেছেন। বাবার মৃত্যুকালে নূরুর বয়স ৯ বছর। দাদা-দাদি তাকে লালন করেন। দাদা ছিলেন পেশায় ঘরামি। আয় ছিল সামান্য। তবে স্বপ্নটা ছিল বড়। নাতির পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতেন। আর্থিক কষ্ট এতটাই তীব্র ছিল যে বছরের প্রায় সব দিনই দুই বেলা নিরামিষ তরকারি দিয়ে ভাত খেতে হয়েছে। দাদি এজন্য খুব আফসোস করতেন। বলতেন, হায়রে আল্লাহ! নাতিটার পরীক্ষার কয়টা দিনও তুমি একটু আমিষ খাওয়ানোর কপাল আমাগোরে দিলা না!

ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষার আগে এক রাতে ঘুম ভেঙে যায় নূরুর। রাত তখন দেড়টা। লণ্ঠনের মৃদু আলোয় নূরু দেখতে পায়, মেঝেতে পাতা জায়নামাজে সেজদায় দাদি বলছেন, ইয়া রাহমানুর রহিম, নাতিটারে তুমি রক্ষা কর। দাদা-দাদি না থাকলেও ওর লেখাপড়া চালাইয়া যাওনের তৌফিক তুমি দিও। এখন তো তুমি ওরে নিরামিষ খাওয়াইয়া রাখছ। বড় হইলে যখন আয়রোজগারি হবে তখন তারে পরান ভইরা গোশ্তের সালুন খাওনের ক্ষমতা দিও পরওয়ারদিগার।

দাদা-দাদি তাকে বলেছিলেন, ভাই গো, গরিবের গলায় পাও দিয়া রোজগারপাতি বাড়ানোর চেষ্টা কখনো করবা না। উপরওয়ালা সইব না। মাইনষের ক্ষতি করবা না। পারলে তাগো উপকার করবা। সুদিনের দেখা পাইয়া দুর্দিনের মধ্যে থাকা মাইনষেরে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার চিন্তারে কখনো পাত্তা দিবা না।

আমরা দেখেছি, নূরু অবিরাম পরোপকারে এগিয়ে যায়। গরিবের কল্যাণে যথাসাধ্য করে। কালক্রমে সে সরকারি উচ্চপদে চাকরি করেছে। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায়ে নেমেছে। বিত্ত হয়েছে অনেক। সে এখন সুখী পিতা। সুখী দাদা। সুখী নানা। তিন-চার বছর পর আমাদের সঙ্গে ওর হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। দামি গাড়ি থেকে নেমে সে হাতে ধরে আমাদেরও পেছনের দিনগুলোয় নিয়ে যায়। ফুটপাতের পাশে টেবিলে সাজানো দোকানে চা-বিস্কুট খাওয়ায়। এভাবে খেয়ে এবং খাইয়ে তার তৃপ্তি। মজা করে বলে : নিরামিষখেকো বন্ধুটারে এখনো তোমরা মনে রাখ, এই ফিলিং বুকের ছাতিটার প্রস্থ পঞ্চাশ ইঞ্চি বানাইয়া ফেলেছে রাইট নাউ।

৩. অবশ্যই আমরা নূরুকে মনে রেখেছি। ওকে মনে রাখতেই হয়। যারা অকপট, ন্যায়ানুরাগী ও সত্যাশ্রয়ী তাদের ভুলে থাকা যায়? পেয়ারু (সহিদ উদ্দিন মাহমুদ), হেলাল (বদরুল ইসলাম) আর বাদল (অরুনবরণ নাগ) যতদিন বেঁচেছিল বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট মৌসুমে নূরুর প্রিয় ফুটবল টিমকে কেন্দ্র করে বিনোদনদীপ্ত গল্প করেছে। আমিও ওই বিনোদনের ভাগ নিয়েছি।

মনে পড়ে আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল ম্যাচের দিনে সকাল থেকে নূরুল ইসলামের উত্তেজনা। তার প্রিয় টিম মোহামেডান যেদিন হারত সেদিন নূরুর চেহারা দেখে পেয়ারু বলত, ‘চেহারাখান এরকম কালো হইছে কেন বন্ধু। তোমার ফাদার-ইন-ল-পটল তুললেন নাকি?’ নূরুর জবাব : আবাহনীর চামচাদের চিন্তাভাবনার কালার দেখি আলকাতরায় চুবানো গামছার মতো!

ফুটবলবিষয়ক চিন্তা-উদ্দীপক তথ্য সংগ্রহ করার বাতিক নূরু এখনো বজায় রেখেছে। চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলে সে কেপ ভার্দে দলের সমর্থক। বলে, গরিবের পক্ষে ছিলাম, আছি, দম বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত থাকব ইনশাআল্লাহ।

নূরু থেকে সর্বসাম্প্রতিক পাওয়া চারটি তথ্য নিবেদন করছি- (ক) ইংল্যান্ড দলের স্ট্রাইকার ছিলেন গ্যারি লিনেকার। তিনি বলতেন, ‘ফুটবল একটি সহজ খেলা। বাইশটা লোক একটি বলের পেছনে ৯০ মিনিট দৌড়ায়। কিন্তু শেষতক সব সময় জিতে যায় জার্মানি।’

(খ) ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের রাইট উইংগার ছিলেন জর্জ বেস্ট (৫৯ বছর বয়সে ২০০৫ সালে মৃত্যু)। বেস্ট বলেন, ‘মদ খাওয়া, পাখি পোষণ ও দ্রুতগতির গাড়ি কেনার পেছনে আমি প্রচুর টাকা উড়িয়েছি। বাদবাকি খাতে যা খরচ করেছি তা ছিল অপব্যয় মাত্র।’

(গ) ডেভিড বেকহাম (ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার) সম্পর্কে জর্জ বেস্ট দারুণ বলে গেছেন। বেস্ট বলেন : বেকহাম বাম পায়ে কিক করতে পারে না। হেড করতে জানে না। ট্যাকলও করতে পারে না। গোলও তেমন দিতে পারে না সে। শুধু এগুলোই ওর গলদ, তার অন্য সব কাজ ঠিক।

(ঘ) ব্রিটিশ ফুটবলার পিটার ক্রাউচ ছিলেন চৌকশ স্ট্রাইকার। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে খেলে ২২টি গোল করেন। দুইটি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে খেলেছেন তিনি। প্রশ্নের জবাবে চটকদার কথা বলা তাঁর স্বভাব। সাংবাদিকরা একবার প্রশ্ন করেন, ‘যদি ফুটবলার না হতেন, তাহলে আপনি কী হতে চাইতেন?’ পিটার ক্রাউচ বলেন, ‘কুমারী।’

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন