• ই-পেপার

৬ শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ৬০০ শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

ইসলামী ব্যাংকের আসল পরীক্ষা ব্যাংকটির নয়, রাষ্ট্রেরও

জাহিদ হোসেন, অর্থনীতিবিদ
ইসলামী ব্যাংকের আসল পরীক্ষা ব্যাংকটির নয়, রাষ্ট্রেরও
জাহিদ হোসেন

ইসলামী ব্যাংক এক দিনে সংকটে পড়েনি। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি হয়তো সংকটকে দৃশ্যমান করেছে; কিন্তু এর শিকড় বহু বছরের। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য আমাদের তাৎক্ষণিক ঘটনাপ্রবাহের বাইরে গিয়ে দেখতে হবে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থান, শাসনব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের আস্থার বিবর্তনকে।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক অভিমতে জাহিদ হোসেন লেখেন, গত কয়েক বছরে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে—অস্বাভাবিক মাত্রায় ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া, সম্পদের প্রকৃত মান নিয়ে প্রশ্ন, ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ এবং বিপুল প্রভিশন ঘাটতি; সেগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা ছিল না। এগুলো ইঙ্গিত করছিল যে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন নিরীক্ষা ও তদারক কার্যক্রমে সেই দুর্বলতার আরও স্পষ্ট চিত্র সামনে আসে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনার কাঠামোতে পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বোর্ড নিয়োগ করে এবং ব্যাংকটির ওপর নিবিড় তদারকি শুরু হয়। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য–সহায়তা এবং নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। আমানতকারীদের মধ্যে আস্থাও আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার হয়। শাখাগুলোতে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম আবার চালু হতে শুরু করে এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছিল।

তবে এই স্থিতিশীলতাকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার বলে ধরে নেওয়া ভুল হতো। কারণ, তারল্যসংকট সাময়িকভাবে মোকাবিলা করা গেলেও মূল সমস্যাগুলো তখনো রয়ে গিয়েছিল। একটি দুর্বল ব্যালান্স শিট, বিপুল অপ্রদর্শিত ক্ষতি এবং আস্থার ভঙ্গুর ভিত্তি ব্যাংকটিকে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছিল।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। আর্থিক খাতের নীতিগত দিকনির্দেশনা, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পরিবর্তন, শীর্ষ পর্যায়ে পদত্যাগ এবং নতুন নিয়োগ—এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দেয়। এসব সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং বিপক্ষে যুক্তি থাকতেই পারে; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এগুলো ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে কী ধরনের বার্তা পাঠিয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে বাস্তবতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা। কোনো ব্যাংকের আমানতকারীরা সাধারণত নিরীক্ষা প্রতিবেদন পড়ে সিদ্ধান্ত নেন না। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন আস্থা, প্রত্যাশা ও নিরাপত্তাবোধের ভিত্তিতে। ফলে কোনো ব্যাংক সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত তারল্যের ওপর পড়তে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটিই ঘটেছে। নির্বাচন-পরবর্তী কিছু পদক্ষেপ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও স্বাধীনতা নিয়ে আমানতকারীদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সেই উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয় গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্য এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার খবর। ফলাফল ছিল—বিশাল অঙ্কের আমানত উত্তোলন এবং তারল্যের ওপর নতুন চাপ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বর্তমান সংকটের জন্য কোনো একক ঘটনা বা কোনো একক সিদ্ধান্তকে দায়ী করা কঠিন। একটি শক্তিশালী ও সুস্থ ব্যাংক সাধারণত বিতর্কিত নিয়োগ বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সামাল দিতে পারে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো ব্যাংকটি এমন ধাক্কা সামলানোর মতো অবস্থায় ছিল না। দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা তাকে একটি আস্থার সংকটের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছিল।

এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল রাজনৈতিক বা আর্থিক সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকটের অভিঘাত; আর এই দুই উপাদান—আর্থিক দুর্বলতা ও আস্থার অবক্ষয় পরস্পরকে শক্তিশালী করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপ সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি। বোর্ড বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত মূলত একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় রয়েছে। স্বল্প মেয়াদে এটি পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি কোনো সমাধান নয়।

কারণ, এখানেই সামনে আসে আরও কঠিন প্রশ্ন—এই পুনর্গঠনের কাজটি করবে কে?

প্রশাসক তারল্যসংকট মোকাবিলা করতে পারেন, দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে পারেন এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি থেকে রক্ষা করতে পারেন; কিন্তু কোনো প্রশাসক দীর্ঘমেয়াদি অর্থে একটি ব্যাংক পুনর্গঠন করতে পারেন না। একটি ব্যাংকের পুনরুদ্ধারের জন্য দরকার মূলধন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সংস্কার, ঋণশৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা। এগুলো এমন কাজ, যার জন্য একটি সক্ষম ও স্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের প্রয়োজন। প্রশাসক আগুন নেভাতে পারেন; কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজন স্থপতি।

সমস্যা হলো—যে পরিবেশে এমন একটি বোর্ড সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই পরিবেশই যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তিদের অংশগ্রহণকে সবচেয়ে বেশি নিরুৎসাহিত করে। বহু বছর ধরে বিতর্ক, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নানা ধরনের স্বার্থ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে স্বাভাবিকভাবেই অনেকে অনাগ্রহী থাকবেন। কারণ, সেখানে শুধু একটি দুর্বল ব্যালান্স শিটের দায় নয়, একটি জটিল উত্তরাধিকারও বহন করতে হয়। বোর্ডে যোগ দেওয়া মানে শুধু আর্থিক পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেওয়া নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে একটি গভীরভাবে বিভক্ত ও অবিশ্বাসপূর্ণ পরিবেশে কাজ করার চ্যালেঞ্জ। ফলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার ভিত্তিতে পরিচালনা করার জন্য দরকার বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা; কিন্তু সেই বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে আবার এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যেখানে পেশাদার সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হবে না। পুনর্গঠনের প্রযুক্তিগত পথ মোটামুটি পরিষ্কার; কঠিন হলো সেই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সেই পথ অনুসরণ করা সম্ভব।

এ কারণেই ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট শেষ পর্যন্ত শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ কি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি করতে পারবে? রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে প্রয়োজনীয় সময় ও স্বাধীনতা দেবে; এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমানতকারীরা কি বিশ্বাস করতে পারবেন যে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পেশাদার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নয়?

ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি ব্যাংক নয়; এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ আমানত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে লাখ লাখ গ্রাহক, অসংখ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং পুরো ইসলামী ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনসাধারণের আস্থা। ফলে এর সংকট দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না–ও থাকতে পারে। আস্থার সংকটের প্রকৃতি হলো এটি এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়তে পারে; বিশেষত যখন জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে যে সমস্যাটি কি একটি ব্যাংকের, নাকি শাসনব্যবস্থার।

এখানেই বর্তমান সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত। একটি ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান বহু বছর আর্থিক দুর্বলতা নিয়ে টিকে থাকতে পারে, যদি মানুষ বিশ্বাস করে যে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে; কিন্তু যখন সেই বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়, তখন সংকট শুধু ব্যালান্স শিটে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আস্থার সংকটে রূপ নেয়।

সুতরাং আজকের প্রশ্ন কেবল ইসলামী ব্যাংককে কীভাবে বাঁচানো যায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করতে পারবে, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না হয়ে পেশাদার সক্ষমতা ও জবাবদিহির বিষয় হবে?

কারণ, ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু তার ব্যালান্স শিট দ্বারা নির্ধারিত হবে না, তা নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নের উত্তরে—রাষ্ট্র কি নিজেকে যথেষ্ট সংযত রাখতে পারবে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো সুস্থ হওয়ার সুযোগ পায়? যদি না পারে, তাহলে পরবর্তী সংকটও হয়তো কোনো হিসাবপত্র থেকে আসবে না। সেটিও আসবে আস্থার অবক্ষয় থেকে, একটি সংকেতের মাধ্যমে।

লেখক : বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ

সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
সীমান্তে পুশ ইন প্রতিরোধে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান
সংগৃহীত ছবি

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার রামরামপুর সীমান্ত। সম্প্রতি অবৈধ পুশ ইন চেষ্টা ঠেকানোর সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নির্দেশ দিয়েছিল গুলির। বিজিবির এক সদস্যের পাল্টা হুঁশিয়ারি ছিল এমন—‘আপনি গুলি করলে আমি বসে থাকব? আমার কাছে গুলি নেই?’ বিজিবি সদস্যের এমন উচ্চারণই যেন স্পষ্ট করে তুলেছে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সীমান্ত রক্ষায় নিজেদের ইস্পাত কঠিন মানসিকতাকে, যা অনুরণিত হচ্ছে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীদের কণ্ঠে কণ্ঠে। ছাড় দিচ্ছে না এক কদমও। 

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার স্থলসীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মহাপরিচালকের দৃঢ় ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিজিবির অকুতোভয় সদস্যরা নস্যাৎ করে দিচ্ছে বিএসএফের অবৈধ পুশ ইন অপচেষ্টাকে। এখন পর্যন্ত গত এক মাসে ৬০০টি অবৈধ পুশ ইন চেষ্টা সফল হতে দেয়নি বিজিবি। 

বিজিবির সঙ্গে একতাবদ্ধ হয়ে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে জুওয়ান-বুড়োরাও। অবৈধ পুশ ইন প্রতিরোধে গাছের মগডালে ওঠে নজরদারি করছে শিশু-কিশোররা। এমন ভিডিও-ছবি ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিএসএফের পুশ ইন চেষ্টার বিপরীতে বিজিবির কঠোর অবস্থানের সঙ্গে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন সীমান্তবাসীরাও।

বিজিবির দৃঢ়তার ফলেই কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুরে বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টার তিন দিন পর সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করা নারী-শিশুসহ ১২ জনকে গত সোমবার (১৫ জুন) ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। প্রতিটি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। জোরদার করা হয়েছে টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম। সীমান্ত সুরক্ষায় ক্ষিপ্র ও তৎপর রয়েছে তারা। রাতের নিরাপত্তায় ব্যবহার করা হচ্ছে থার্মাল ও ইনফ্রারেড ড্রোন।

চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর দিকনির্দেশনায় সীমান্তবাসীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ বুকে বুক মিলিয়ে সীমান্তকে সুরক্ষিত করেছে বিজিবি। সীমান্ত হত্যা, পুশ ইন, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, দক্ষিণ-পূর্বে মায়ানমার সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নতুন উদ্দীপনায় রুখে দাঁড়াতে দেশপ্রেমে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক বিজিবিকে দেখেছে দেশের মানুষ। গত মে মাস থেকে সীমান্তের বিভিন্ন অংশ দিয়ে বিএসএফের অব্যাহতভাবে লোকজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানোর বা পুশ ইন চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। একবারের জন্যও বিজিবি পিঠ দেখায়নি, বুক দেখাচ্ছে। জনআকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশার নতুন টোনে কথা বলছে, বিএসএফকে মোকাবেলা করেছে।পুশ ইন নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এবার দিল্লিতে চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলনে বসেছিল বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের। মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলনে আলোচনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে পুশ ইন ও সীমান্ত হত্যার বিষয়টি। বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারকে পুশ ইন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সীমান্ত এলাকায় হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য বিএসএফ ডিজিকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও তিনি বলেছেন। সম্মেলনে উভয় পক্ষের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের সারসংক্ষেপ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

কিন্তু এরপরও সম্মেলনে বিজিবির অবস্থান নিয়ে অনুমাননির্ভর তথ্য, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সীমান্তরক্ষী বাহিনীটিকে নিয়ে গোলমাল পাকানোর ট্রায়াল রান শুরু হয়েছে। বেশ কিছু বিষয়ে জেনে-শুনে অসত্য, মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ানকে ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’ বা ‘বিকল্প তথ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করার পরিবর্তে একটি মিথ্যাকে গ্রহণযোগ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করার কসরত বিরাজমান। সত্যাসত্য বিচার-বিশ্লেষণ না করে অনেকেই আবার গুজবের ঢোল বাজাচ্ছেন। বর্তমান বাস্তবতায় মাথা নত না করে সাহসের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময়টিতে এমন ভয়াবহ প্রবণতা সচেতনদেরও নিমজ্জিত করছে চরম বিষাদে। 

বিজিবির প্রেস উইং জানিয়েছে, মহাপরিচালক পর্যায়ের এই সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩১টি এবং ভারতের পক্ষ থেকে ২১টি এজেন্ডা উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব এজেন্ডাসমূহের ওপর অনুষ্ঠিত আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের প্রামাণিক দলিল ‘জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস’ (জেআরডি) বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক স্বাক্ষর করেছেন। তবুও দেখা গেলো, সীমান্ত হত্যাকে বিজিবি ডিজি সীমান্তে সংঘটিত মৃত্যু বলে উল্লেখ করেছেন এমন কথায় বিষ ছড়ানো হচ্ছে। অথচ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক দলিল যা জয়েন্ট রেকর্ড অব ডিসকাশনস (জেআরডি) নামে পরিচিত সেখানে কিন্তু ‘বর্ডার কিলিং’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো রকম শৈথিল্য প্রদর্শন করে বিজিবি নিজেদের শক্ত অবস্থান থেকে সরে আসেনি। 

পুশইন, সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ, মাদক চোরাচালান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ টু দ্য পয়েন্টে আলোচিত হয়েছে, জেআরডিতেও নথিবদ্ধ রয়েছে। এসব বিষয়বস্তুর সত্যতা সোমবার (১৫ জুন) প্রথম দফায় বিজিবির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ও পরবর্তীতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুনরায় দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তে বিজিবি বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের মাধ্যমে যেখানে দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা-বিশ্বাসের ভিত্তিকে সুসংহত করছে ঠিক তখন অবান্তর-অবাস্তব বিষয়কে মূল উপজীব্য করে বাহিনীর নেতৃত্বকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টায় নতুন করে হাইপ উঠানো হচ্ছে। 

আলোচিত-সমালোচনা হচ্ছে ‘পজিশন পেপার’ বিনিময় নিয়েও। সত্য-মিথ্যা মাপার থার্মোমিটারেও যেন গলদ ধরা পড়েছে। কারও কারও হয়তো জানা নেই, মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচ্য বিষয় ও এজেন্ডা পয়েন্টের শুধুমাত্র শিরোনাম বিনিময় নতুন নয়। এটি পুরোনো, প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত একটি প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে ‘গোপন তথ্য ফাঁস’ বা ‘নিরাপত্তা ব্যত্যয়’ এর বিষয়টি সংগতিপূর্ণ নয় মোটেও।

বিজিবির মতো বিএসএফও গত ১৪ মে অর্থাৎ বৈঠকের প্রায় একমাস পূর্বে তাদের এজেন্ডা পয়েন্টসমূহ বিজিবি সদর দপ্তরে প্রেরণের পর তাঁরা সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এখন কোনো উদ্দেশে বিভ্রান্তিকর ও একপক্ষীয় মন্তব্যে বিষয়টিকে ফোকাস করা হচ্ছে সে নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। শুধু তাই নয়, আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাধারণত দেশটিতে সফররত বাহিনী প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাতের রীতি বা প্রথা দীর্ঘদিনের। বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলনে সবসময়ই এই প্রথা বা রেওয়াজ চালু রয়েছে। স্বাভাবিক কূটনৈতিক রীতি অনুসরণ করেই বিজিবি মহাপরিচালক দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। 

গত বছর বিজিবি যখন ঢাকায় ৫৬তম সম্মেলনের আয়োজক ছিল তখন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। তখন এ নিয়ে কোনো হৈচৈ হয়নি। কূটনৈতিক রীতি মেনেই এ ধরনের সাক্ষাতের বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারিত হয়। সরকারের অনুমতির পরই আয়োজক দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অতিথি দেশের বাহিনীপ্রধান সাক্ষাৎ করেন। যেখানে বিজিবি ও বিএসএফের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র সঙ্গে বিজিবির প্রতিনিধি দলের সাক্ষাতেও বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইন বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন। ঠিক যেন জানান দিয়েছেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অখণ্ড, এই মাটি কারো দয়ার বিষয় নয়।

সীমান্তে দিন-রাত অতন্দ্র পাহারায় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিচল বিজিবি। সুগভীর দেশপ্রেম, সততা, বুদ্ধিমত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, আনুগত্য, তেজ ও উদ্দীপনাই এই বাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাগত দক্ষতার মাপকাঠি। সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও মনে করেন, এখন বিভাজনের সময় নয়। অপতথ্যে বিজিবি সদস্যদের মনোবল নষ্ট করার পরিবর্তে উৎসাহ দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ালে দেশের জন্য মঙ্গল হবে। ধৈর্য ও বিচক্ষণতা এই সময়ে যেমন কাম্য তেমনি সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা জাতীয় স্বার্থেই সময়ের সুতীব্র প্রয়োজন।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।

বেনজীর গ্রেপ্তার : রুই-কাতলাও ধরা পড়ছে সরকারের জালে!

আহসান হাবিব বরুন
বেনজীর গ্রেপ্তার : রুই-কাতলাও ধরা পড়ছে সরকারের জালে!
বেনজীর আহমেদ

ক্ষমতা মানুষকে অনেক কিছু দিতে পারে—প্রভাব, প্রতিপত্তি, সম্পদ, ভয় প্রদর্শনের সামর্থ্য এবং কখনো কখনো নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার বিভ্রমও। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সৌন্দর্য হলো, প্রকৃতি ও ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কাউকেই ছাড় দেয় না। সময়ের আদালত অনেক দেরিতে বসলেও তার রায় সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষগুলোকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। কারণ এটি কেবল একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের খবর নয়; এটি এমন এক ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রশ্ন, যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে অনেকের কাছে অপ্রতিরোধ্য, অজেয় এবং জবাবদিহির ঊর্ধ্বে বলে মনে হয়েছে।

তাই বেনজীরের এই গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ বেনজীর আহমেদ শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি সময়ের প্রতীক, একটি ক্ষমতার কাঠামোর প্রতীক এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর অন্যতম মুখ।

আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা প্রশাসনিক অসদাচরণের অভিযোগে প্রকৃত অর্থে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জবাবদিহির মুখোমুখি করার নজির খুবই কম। অনেক সময় জনমতের চাপ সামাল দিতে কিংবা আইনের শাসনের একটি প্রতীকী চিত্র তুলে ধরতে কিছু ছোটখাটো ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করা রুই-কাতলাদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছে।

সেই বাস্তবতায় বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের ঘটনাটি একটি নতুন বার্তা বহন করে। এটি দেখিয়ে দেয় যে রাষ্ট্র যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আইনি প্রস্তুতি নিয়ে এগোতে চায়, তাহলে পৃথিবীর কোনো প্রান্তই অপরাধীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে না।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ইন্টারপোলের সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ও বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী দুবাই থেকে এমন একজন প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন হিসেবেই বিবেচিত হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই ঘটনার আরেকটি রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। দেশের বাইরে অবস্থানরত বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছেও এটি একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা উত্তর আমেরিকায় অবস্থান করে যারা মনে করেন অতীতের ক্ষমতা, অর্থ কিংবা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তাদের জন্য স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, তাদের জন্য এই ঘটনা নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করছে। অন্তত জনমনে এমন ধারণা আরো শক্তিশালী হয়েছে যে আইনের দীর্ঘ হাত একসময় অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাকে অনেকেই আওয়ামী লীগের দেশত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন। যারা বিদেশের মাটিতে বসে দ্রুত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন, তাদের কাছেও এই গ্রেপ্তার একটি নতুন ও বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। পৃথিবী এখন অনেক ছোট। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যুগে কোনো প্রভাব, কোনো অর্থ, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা বিদেশি আশ্রয় আর চূড়ান্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে আমার কাছে এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি অন্যত্র।

এখানে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই। ২০০৮ সালে আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মরত ছিলাম। ১/১১ সরকারের সময়ে পুলিশ সংস্কার নিয়ে আমি বেনজীর আহমেদের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সে সময় তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি অর্থ ও উন্নয়ন হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আজকের বিতর্কিত ও আলোচিত বেনজীরকে ঘিরে জনমনে যে চিত্রটি বিদ্যমান, সেই মানুষটিকে তখন আমার মোটেও দাম্ভিক বা অহংকারী মনে হয়নি। বরং তাকে একজন মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রতিশ্রুতিশীল পুলিশ কর্মকর্তা বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই মানুষটিকেই আমরা এক ভিন্ন রূপে দেখেছি। এখানেই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—সমস্যা কি শুধু একজন বেনজীর আহমেদ, নাকি সেই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কাঠামোও, যা একজন কর্মকর্তাকে ধীরে ধীরে এতটা ক্ষমতাবান, এতটা প্রভাবশালী এবং শেষ পর্যন্ত এতটা বিতর্কিত করে তুলতে পারে?

আমি বিশ্বাস করি, কোনো বেনজীর একদিনে তৈরি হন না। তাকে তৈরি করে একটি সংস্কৃতি, একটি রাজনৈতিক পরিবেশ এবং একটি শাসনব্যবস্থা। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো থাকলেও বহু সময় তার আড়ালে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতার চর্চা হয়েছে। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহির অভাব, প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এবং ব্যক্তি-নির্ভর শাসনব্যবস্থা মিলেই এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে কিছু কর্মকর্তা নিজেদের রাষ্ট্রের সেবক নয়, বরং রাষ্ট্রের মালিক ভাবতে শুরু করেন।

আজকের বেনজীর একদিন হঠাৎ করে তৈরি হননি। ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রশ্রয়, জবাবদিহির অভাব এবং ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি মিলেই এমন বাস্তবতার জন্ম দেয়। ফলে কেবল একজন ব্যক্তির পতনে সন্তুষ্ট হলে চলবে না; বরং সেই পরিবেশ এবং সংস্কৃতিরও অবসান ঘটাতে হবে, যা নতুন নতুন বেনজীর তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে।

আমার কাছে বেনজীরের গ্রেপ্তারের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই। এটি শুধু অতীতের অভিযোগ ও বিতর্কের বিচার প্রক্রিয়ার বিষয় নয়; এটি বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্যও একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। প্রশাসন, পুলিশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের যেকোনো স্তরে যারা ক্ষমতার মোহে নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন, যারা মনে করেন পদ-পদবি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাদের চিরস্থায়ী নিরাপত্তা দেবে, তাদের জন্য এই ঘটনা গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। আমরা কি শুধু একজন ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করেই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি সেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটাব, যা ক্ষমতার অপব্যবহারকে উৎসাহিত করে? আমরা কি শুধু লেজ ধরে টানাটানি করব, নাকি সমস্যার মূল শিকড়ে হাত দেব?

কারণ প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে, নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এবং ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধে পরিণত করতে হলে প্রয়োজন আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

রাষ্ট্রকে ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে, প্রতিষ্ঠানকে দলের চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে এবং আইনকে ক্ষমতার চেয়ে শক্তিশালী করতে হবে।

নচেৎ ইতিহাসের চাকা ঘুরতেই থাকবে। নাম বদলাবে, মুখ বদলাবে, কিন্তু বেনজীরেরা হারিয়ে যাবে না।

একজনের পতনের পর আরেকজনের উত্থান ঘটবে। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি সেই অন্তহীন চক্র ভাঙতে প্রস্তুত, নাকি আমরা আবারও একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখব?

এখানে একটি সত্য আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত। রাজনীতিবিদ, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, বেসামরিক প্রশাসনের সদস্য কিংবা ব্যবসায়ী—পদ ও পরিচয় যাই হোক না কেন, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদের অহংকার কখনো কোনো মানুষকে প্রকৃত শান্তি দিতে পারে না। বিলাসবহুল বাড়ি, বিদেশি ব্যাংক হিসাব কিংবা ক্ষমতার চাকচিক্য হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার বিবেকের কাছে নির্দোষ থাকার শক্তি।

পৃথিবীতে গভীর রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ার মতো বড় প্রাপ্তি খুব কমই আছে। আর সেই প্রশান্তি অর্থ, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব দিয়ে কেনা যায় না; সেটি অর্জন করতে হয় সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং নৈতিক সাহসের মাধ্যমে।

পরিশেষে বলতে চাই, হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারকে শুধুমাত্র একজন সাবেক আইজিপির গ্রেপ্তার হিসেবে মনে রাখবে না। তারা এটিকে মনে রাখবে এমন এক মুহূর্ত হিসেবে, যখন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ক্ষমতার দুর্গে আঘাত হানার সাহস দেখিয়েছিল। যখন রাষ্ট্র অন্তত প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে পদ-পদবি, অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে তুলে দিতে পারে না।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সরকার আসবে, সরকার যাবে; রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হবে, ক্ষমতার পালাবদল হবে; কিন্তু কোনো নাগরিককে বিচার এড়াতে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে না, কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতার জোরে নিজেকে রাষ্ট্রের চেয়ে বড় ভাবার সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে আইনের নিরাপত্তা ভোগ করবে সাধারণ মানুষও, আবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিও একই আইনের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হবে। সুতরাং নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন যদি সত্যিই বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে এখনই নতুন অঙ্গীকারের সময়। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান; ক্ষমতা নয়, জবাবদিহি; ভয় নয়, স্বাধীনতা; আনুগত্য নয়, ন্যায়বিচার—এই দর্শনের ওপরই গড়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
ই-মেইল: [email protected] 

সীমারেখার রাজনীতি

জিল্লুর রহমান
সীমারেখার রাজনীতি

সীমারেখার রাজনীতি

১. বাজেটের অঙ্ক, টাকার প্রশ্ন

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিঃসন্দেহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। সংখ্যার ভাষায় এটি এক মহাকাব্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো, কৃষি-প্রায় সবখানেই বরাদ্দ বেড়েছে। সরকারের বক্তব্য পরিষ্কার : মানুষকে কেন্দ্র করে উন্নয়নের ধারাকে আরও শক্তিশালী করা হবে। কাগজকলমে আপত্তি করার খুব বেশি কিছু নেই। শিক্ষায় বিনিয়োগ দরকার, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ দরকার, সামাজিক সুরক্ষা দরকার। একটি সুস্থ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদে এগোতে পারে না। এ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ খুব কম।

কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রতি বছরই যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। টাকা কোথায়? আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই ব্যয়ের তালিকা সামনে আসে। কে কত পেল, কোন মন্ত্রণালয় কত বাড়তি বরাদ্দ পেল, কোন খাতে নতুন প্রকল্প হলো-এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু সেই অর্থ কোথা থেকে আসবে, সেটি নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে একটি অদ্ভুত প্রবণতার মধ্যে পড়েছে। আমরা ব্যয় নিয়ে ক্রমেই বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়েছি, কিন্তু আয় নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম বাস্তববাদী হয়েছি। অর্থনীতির মৌলিক সত্য হচ্ছে, রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টি করে না; রাষ্ট্র সম্পদ সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে। সম্পদ সৃষ্টি করে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও বাজার। এ কারণেই বেসরকারি খাতের প্রশ্নটি আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামাজিক উন্নয়ন অবশ্যই উন্নয়ন, কিন্তু শুধু সামাজিক ব্যয় উন্নয়ন নয়। নতুন সম্পদ সৃষ্টি ছাড়া সামাজিক ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না।

একসময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল- ‘Money is no problem।’ বছরের পর বছর এই বাক্য নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। কেউ বলেছেন এটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, কেউ বলেছেন অতিরিক্ত আশাবাদ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো এখন সত্যিই ‘Money।’ পরিকল্পনার অভাব নেই। প্রকল্পের অভাব নেই। স্বপ্নেরও অভাব নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পদ কোথায়?

তার ওপর কালোটাকা সাদা করার সুযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। বাস্তববাদী অর্থনীতিবিদরা হয়তো বলবেন, কিছু অর্থ বাজারে ফিরবে। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক বার্তাটি কী? যে নাগরিক নিয়ম মেনে কর দেন, আর যে বছরের পর বছর কর ফাঁকি দেন-রাষ্ট্র কি তাদের একই কাতারে দাঁড় করাবে? অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত শুধু টাকার বিষয় নয়। এটি আস্থার বিষয়। আর আস্থা একবার হারিয়ে গেলে তা বাজেট বক্তৃতা দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না।

২. কাঁটাতারের ওপারে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে একটি অদ্ভুত দ্বৈধতা আছে। ঢাকায় বৈঠক হয়, দিল্লিতে করমর্দন হয়, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। তারপর সীমান্তে গিয়ে দেখা যায় অন্য এক বাস্তবতা। সাম্প্রতিক ‘পুশইন’ ইস্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে বন্ধুত্বের ভাষা, অন্যদিকে সীমান্তে উত্তেজনা। এ যেন একই বইয়ের দুই বিপরীত অধ্যায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম জটিল সীমান্ত। একই ভাষা, একই ইতিহাস, একই সংস্কৃতি, একই নদী-কিন্তু মাঝখানে কাঁটাতার। অনেক সময় মনে হয়, সীমান্তের দুই পাশের মানুষ একই গল্পের দুই চরিত্র।

নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ একই আকাশের নিচে একই বেদনা অনুভব করে। কথাটি কূটনৈতিক শোনাতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে গভীর বাস্তবতা আছে। বর্ষার মেঘ পাসপোর্ট দেখে আসে না। নদীর পানি ভিসা নিয়ে প্রবাহিত হয় না। প্রকৃতির কোনো সীমান্ত নেই। সীমান্ত আছে রাষ্ট্রের। সেই কারণেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আবেগের চেয়ে বাস্তববাদ বেশি জরুরি। ভারত এখন ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্পের কথা বলছে। প্রযুক্তি, সেন্সর, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সব মিলিয়ে নতুন ধরনের সীমান্ত নিরাপত্তা।

প্রযুক্তি দরকার। কিন্তু প্রযুক্তি কখনো বিশ্বাসের বিকল্প নয়। ভালো প্রতিবেশী হতে হলে আগে একে অপরের সীমারেখাকে সম্মান করতে হয়। রবার্ট ফ্রস্টের বিখ্যাত কবিতার একটি লাইন আছে-Good fences make good neighbours. ভালো বেড়া কখনো শত্রুতা সৃষ্টি করে না। বরং ভুল বোঝাবুঝি কমায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও সম্ভবত এখন সেই বাস্তববাদী পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে আবেগের পাশাপাশি সীমারেখার গুরুত্বও সমানভাবে স্বীকৃত হবে।

৩. রাজনীতি : বক্তৃতা নয়, প্রতিষ্ঠান

রাজনীতির একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, আমরা প্রায়ই ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানকে গুলিয়ে ফেলি। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ সব সময়ই প্রবল। নেতা অনেক সময় প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে যান। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা ভিন্ন। একজন নেতা একটি নির্বাচন জিততে পারেন। কিন্তু একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রতিষ্ঠান। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও সেখানেই। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা বেড়েছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা কমেছে, কিন্তু অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। এখন জনগণ শুধু বক্তৃতা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়- বিদ্যুতের অবস্থা কী? বিনিয়োগ কোথায়? কর্মসংস্থান কত তৈরি হলো? বিচারব্যবস্থা কতটা কার্যকর? আইনশৃঙ্খলা কতটা উন্নত হলো?

অর্থাৎ রাজনীতি এখন ধীরে ধীরে আবেগের পরীক্ষাগার থেকে প্রশাসনিক সক্ষমতার পরীক্ষাগারে প্রবেশ করছে। এটি ভালো লক্ষণ। কারণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ফলাফল। উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, রাজনীতিবিদ পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবেন, রাষ্ট্রনায়ক পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাবেন। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই চ্যালেঞ্জ। আমরা কি আগামী নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা করব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্য? এ প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে।

৪. সীমারেখার দর্শন

আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন, কারও কাছাকাছি থাকা মানেই প্রভাবশালী হওয়া। কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রের আশপাশে ঘোরাফেরা করছেন, ছবি তুলছেন, নাম ব্যবহার করছেন-তাহলেই যেন তিনি ক্ষমতাবান। বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। প্রভাব আর প্রবেশাধিকার এক জিনিস নয়। প্রকৃত প্রভাব আসে বিশ্বাস থেকে। অনধিকার প্রবেশ থেকে নয়। আমাদের সময়ের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনেকেই সমালোচনাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছেন। তারা পরিবর্তন চান না, তারা মনোযোগ চান। বিশৃঙ্খলা তাদের জ্বালানি। প্রতিক্রিয়া তাদের অক্সিজেন। আর মনোযোগ তাদের মুদ্রা। এ কারণেই সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সমালোচক সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন। অনেক সময় তারা কেবল নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার ভয় পান।

একটি পুরোনো প্রবাদ আছে- ‘Never wrestle with a pig. You both get dirty, and the pig likes it.’ রাজনীতি, সমাজ, এমনকি ব্যক্তিগত জীবনেও কথাটি প্রযোজ্য। যারা বিশৃঙ্খলার প্রতি আসক্ত, তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র বিতর্ক নয়। সীমারেখা। কারণ কোনো পরিবার সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো প্রতিষ্ঠান সীমারেখা ছাড়া টেকে না। কোনো রাষ্ট্র সীমারেখা ছাড়া টেকে না। এমনকি গণতন্ত্রও সীমারেখার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আইনের সীমা ছাড়া স্বাধীনতা অরাজকতায় পরিণত হয়। ক্ষমতার সীমা ছাড়া নেতৃত্ব কর্তৃত্ববাদে পরিণত হয়। সম্পর্কের সীমা ছাড়া ভালোবাসা নির্ভরতায় পরিণত হয়। সীমারেখা নিষ্ঠুরতা নয়। সীমারেখা হলো শাসন।

শেষ কথা

এ সপ্তাহের চারটি ঘটনা-বাজেট, সীমান্ত, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা-একই গল্পের চারটি সংস্করণ। বাজেট আমাদের শিখিয়েছে সম্পদের সীমা আছে। সীমান্ত আমাদের শিখিয়েছে ভূখণ্ডের সীমা আছে। রাজনীতি আমাদের শিখিয়েছে ক্ষমতার সীমা আছে। আর জীবন আমাদের শিখিয়েছে মানুষেরও সীমা আছে। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র নিজেদের সীমা ভুলে যায়। আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থ নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতাও নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি আত্মনিয়ন্ত্রণ।

যে রাষ্ট্র নিজের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সমৃদ্ধ হয়। যে দেশ নিজের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে নিরাপদ থাকে। যে নেতা নিজের ক্ষমতার সীমা বোঝেন, তিনি দীর্ঘস্থায়ী হন। আর যে মানুষ নিজের জীবনের সীমারেখা আঁকতে পারেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই শান্তিতে থাকেন। কারণ সভ্যতার ইতিহাস মূলত একটিই গল্প বলে, স্বাধীনতা কখনো সীমারেখার বিপরীতে দাঁড়ায় না; স্বাধীনতা টিকে থাকে সীমারেখার ভিতরেই।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ