প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দেশের মানুষের জন্য মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যখাত ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং ভোগান্তি কমাতে রাজধানীসহ বড় শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসার জন্য গ্রামের মানুষকে আর শহরমুখী হতে হবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েই আধুনিক চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এতে একদিকে মানুষের ভোগান্তি কমবে, অন্যদিকে তৃণমূলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে তোলা হবে স্বাস্থ্য ইউনিট, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সুবিধাসহ জরুরি বিভাগ, ইনডোর ও আউটডোর সেবা এবং আধুনিক প্যাথলজি সুবিধা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে প্রতিটি হাসপাতালে একজন নারী ও একজন পুরুষ ফিজিওথেরাপিস্টের পদ থাকবে।
জেলা হাসপাতালগুলোতেও আধুনিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ করা হবে। সেখানে ক্যান্সার ও কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তৃণমূলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট’ গঠন এবং ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা (হেলথ স্ক্রিনিং) কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে বলা হয়, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। যেখানে চিকিৎসা থাকবে সবার নাগালে। যুক্তরাজ্যের জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) মডেলের আদলে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। প্রতিটি ইউনিটের অধীনে তিনটি করে প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (কমিউনিটি ক্লিনিক) থাকবে। প্রতিটি কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন তিনজন প্রশিক্ষিত কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার।’
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সরকার প্রত্যেক নাগরিককে একটি ইলেকট্রনিক হেলথ (ই-হেলথ) কার্ড দেবে। এ কার্ডের মাধ্যমে দেশের যেকোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসক রোগীর আগের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন। এ লক্ষ্যে খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী- এই পাঁচ জেলায় ২৫ লাখ ই-হেলথ কার্ড বিতরণের পাইলট প্রকল্পে ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানান, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে শিগগিরই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীও নিয়োগ দেবে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে দুজন করে মিডওয়াইফ থাকবেন। এতে স্বাভাবিক প্রসবসহ বিভিন্ন ধরনের মাতৃস্বাস্থ্যসেবা আরো সহজলভ্য হবে।
তিনি জানান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লা বিভাগে ২০০ শয্যার পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে। প্রতিটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা, কেন্দ্রীয় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অবকাঠামো আরো শক্তিশালী করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্যখাতে বড় পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে কার্যকর সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার কেন্দ্রে উন্নীত করতে হবে।












