‘প্রতিবছরই বেড়িবাঁধের কাজ হয়; আবার বর্ষা আইলেই ভাঙে, বাড়িঘর ভাঙে। এহন সব সহ্য হয়ে গেছে। তয় বর্ষায় মৌসুমজুড়ে মনের মধ্যে ভয় করে, কখন বসতভিটা নদীতে হারায়ে যায়। সাথে চইলা যায় বাপ-দাদার কবরও।’
কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর গলাচিপার রতনদী তালতলী ইউনিয়নের নিজহাওলা গ্রামের বাসিন্দা বারেক রাঢ়ী। তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে দিশাহারা এই প্রবীণ আরো বলেন, ‘১০ বছরে চারবার বাড়ি করেছি। এখন যে বাড়ি সেটাও হয়তো থাকবে না। এহন সব সহ্য হয়ে গেছে। তবে মরার আগে আর নতুন বাড়ি করতে পারমু না। শক্তি ও অর্থ কোনোটাই নাই।’
শুধু বারেক রাঢ়ী নন, তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে আতঙ্কে দিন কাটছে ৫০০ পরিবারের। এ নদীর করাল গ্রাসে হারিয়ে গেছে বহু বাড়িঘর, সঙ্গে কবরস্থানও। তাই জীবনের শেষ মূহূর্তে এসে চরম হতাশা বারেকের মতো মানুষদের।
বেড়িবাঁধ ভাঙনের আতঙ্কে রয়েছেন রতনদী তালতলী ইউনিয়নের নিজহাওলা, বন্যাতলী স্লুইসের উত্তর ও দক্ষিণ পাশ, গ্রামর্দনের চার গ্রামের বাসিন্দারা।
এদিকে ঢেউয়ের তোড়ে ওই এলাকার বেড়িবাঁধের পাড় ভেঙে ধসে পড়ছে। বন্যাতলী লঞ্চঘাটের উত্তর পাশের বেড়িবাঁধের অন্তত ৫০০ মিটার সড়ক ধসে গেছে।
রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী লঞ্চঘাটের উত্তর পাশের বাসিন্দা শাহজাহান হাওলাদার বলেন, ‘নদীভাঙনে আমাগো সব হারাইছি। চার চারবার করে বাড়ি করেও সর্বস্ব হারাইছি। এখন কোনোভাবে জীবিকা নির্বাহ করছি। বেড়িবাঁধ দেওয়ার পরও প্রায় সাড়ে আট একর জমি নদীতে হারিয়ে গেছে।’
শাহজাহানের ভাষ্য, ‘এখন আর এসব বেড়িবাঁধ দিয়ে কিছুই হবে না, আমাদের টেকসই বাঁধ চাই। ব্লক দিয়ে বাঁধ দেওয়া দরকার। বারবার ভাঙা আর গড়ার খেলায় আমি এখন পুরোটাই নিঃস্ব।’
একই ইউনিয়নের গ্রামর্দন এলাকার ফরিদ হাওলাদার বলেন, ‘আমার ঘরসহ সব কেড়ে নিছে সর্বনাশা তেঁতুলিয়া। কয়েক দফা ভাঙনের পর ১২ বছর আগে পরিবার-পরিজন নিয়ে একই ইউনিয়নের কাটাখালী শ্বশুরবাড়িতে থাকি।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার চোখেই ২০০ থেকে আড়াই শ ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে দেখেছি। নদীর উত্তাল ঢেউয়ে বেড়িবাঁধের পাড় প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে। এখন রাস্তাও ভাঙছে।’
নিজহাওলা গ্রামের সত্তার রাঢ়ীর স্ত্রী লুৎফা বেগম বলেন, ‘আমার বাপের বাড়ি একই ইউনিয়নের পাতাবুনিয়া গ্রামে। বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়িতেই আছি। এক সময় যে বাড়ি থেকে গাছের ডালপালা পাতা কুড়ায়ে রান্নাবান্না করতাম, অনেক আগেই নদীগর্ভে হারায়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী একসময় এখানে ফসল ফলাতেন, জমিতে চাষাবাদ করতেন। এহন সব কিছুই স্মৃতি। এই নদীর ভাঙনে ৫০ একরের ওপর জমি নদীতে ভেঙে গেছে। এহন আমরা নিঃস্ব।’
রতনদী তালতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা খান বলেন, রতনদি তালতলী ইউনিয়নের ৮, ৯ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বন্যাতলী অংশের বেড়িবাঁধ এলাকা ভাঙনকবলিত। এখানে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। তেমনি গ্রামর্দন অংশেরও একই অবস্থা।
ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভাঙনে প্রতিবছর নদীরগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বেড়িবাঁধ, সড়ক, কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি। ভাঙন প্রতিরোধ ও ওয়াপদা মেরামত করা না হলে বন্যাতলী, নিজহাওলা, টাইট্টাবুনিয়া, ভাইয়ার হাওলা, পাতাবুনিয়া,গ্রামর্দ্দন এলাকার মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাই নদীভাঙন রোধে জরুরি পদক্ষেপ আশা করছি।’
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুর হক বলেন, ‘ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছি। তারা জানান রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী লঞ্চঘাটের উত্তর পাশের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ রক্ষায় ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। বর্ষা মৌসুমের তীব্রতার আগেই কাজ শুরু হবে।’