বাজারে আসছে রংপুরের হাঁড়িভাঙা আম। রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমীন সোমবার (১৫ জুন) দুপুরে জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকায় একটি বাগানে গাছ থেকে আম সংগ্রহ করে বাজারজাত করার কাজ উদ্বোধন করেন।
পরে হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান বিপণন কেন্দ্র পদাগঞ্জ হাট পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। এ সময় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এর আগে পদাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হাঁড়িভাঙা আম চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক।
এদিকে আম ঘিরে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ তৈরি হলেও দীর্ঘদিনের কিছু মৌলিক সমস্যার সমাধান না হওয়ায় হতাশ চাষিরা।
চাষিরা জানান, আম উৎপাদন এলাকায় সড়ক উন্নয়ন, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এবং স্থানীয়ভাবে ব্যাংকের শাখা স্থাপনের জন্য বছরের পর বছর দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনায় নানা সংকটে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, রংপুরের মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জসহ এই অঞ্চলে এ বছর দুই হাজার ৫৬৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪০-৪১ হাজার মেট্রিক টন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় ধান ও প্রচলিত ফসলের ওপর নির্ভরশীল ছিল মিঠাপুকুরসহ এই অঞ্চলের মানুষ। তবে, হাঁড়িভাঙা আমের বাণিজ্যিক চাষ জনপ্রিয় হওয়ার পর বদলাতে শুরু করে স্থানীয় অর্থনীতি।
পদাগঞ্জের আম চাষি আ. আজিজ জানান, হাজার হাজার কৃষক আম চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে। নতুন বাগান গড়ে উঠেছে। মৌসুমে হাজার হাজার শ্রমিক বাগান পরিচর্যা, আম সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেজিং ও পরিবহনের কাজে যুক্ত হন। পরিবহন, ঝুড়ি ও কার্টন ব্যবসা, আড়ত এবং খুচরা বাজারেও সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান।
তবে, কৃষকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে। অনেক বাগান এলাকায় এখনো কাঁচা বা ভাঙাচোরা সড়ক। মৌসুমে ট্রাক ও পিকআপ চলাচলে সমস্যা হয়। বৃষ্টি হলে দুর্ভোগ আরো বাড়ে।
কৃষকদের ভাষ্য, ভালো সড়ক না থাকায় তাদের পরিবহন খরচ বাড়ে এবং অনেক সময় দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। এতে আমের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্থানীয় চাষি নজিবুল ইসলামের দাবি, উৎপাদন এলাকা থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন করা গেলে পরিবহন ব্যয় কমবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত আম সরবরাহ করা সম্ভব হবে। হাঁড়িভাঙা আম একটি মৌসুমি ফল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে কৃষকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু উৎপাদন এলাকায় এখনো আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় চাষিরা আম সংরক্ষণের সুযোগ পান না।
আরেক আম চাষি হামিদুর রহমান বলেন, বাজারে দাম কমে গেলে আম ধরে রাখার কোনো উপায় থাকে না। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। একটি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেতে পারেন।
হাঁড়িভাঙা উৎপাদন এলাকায় বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হলেও স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত ব্যাংকিং সুবিধা নেই বলে অভিযোগ কৃষকদের। তাদের মতে, মৌসুমে কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। কিন্তু ব্যাংকের শাখা ও সহজ আর্থিক সেবা না থাকায় অনেককে দূরে গিয়ে লেনদেন করতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটিই অপচয় হয়।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক শাখা স্থাপন করা হলে কৃষিঋণ, আম বিক্রির অর্থ লেনদেন এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সহজ হবে।
আমচাষি মারুফ হোসেন বলেন, হাঁড়িভাঙা এখন শুধু একটি ফল নয়; এটি এই অঞ্চলের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন, সংরক্ষণ সুবিধা এবং আর্থিক সেবার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সড়ক উন্নয়ন, কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এবং ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে হাঁড়িভাঙা আমকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন এই কৃষক।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, জেলা প্রশাসনের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে হাঁড়িভাঙা আমের অবকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তাঘাট সংস্কার, ওয়াশ ব্লক তৈরি এবং ব্যাংকের শাখা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া আম পরিবহনের সুবিধার্থে ম্যাঙ্গো ট্রেনের ব্যবস্থাসহ সব ধরনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।