উপকূলীয় অঞ্চলের অল্প লবণাক্ত পানিতে গলদা চিংড়ি ও রুই মাছের মিশ্র চাষে সাফল্য পেয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি (এফএমআরটি) ডিসিপ্লিনের একদল গবেষক।
ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-ট্রফিক অ্যাকোয়াকালচার (আইএমটিএ) নামের এই নতুন ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মাছে বেড়েছে পুষ্টিগুণ।
সাধারণ পুকুরে মাছ বা চিংড়িকে দেওয়া বাড়তি খাবার ও মলমূত্র পচে পানি দূষিত হয়। তবে অত্যাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মিশ্র চাষ পদ্ধতি আইএমটিএ মূলত ‘একের বর্জ্য, অন্যের খাবার’ নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। এই পদ্ধতিতে মূল মাছ ও গলদা চিংড়ির পাশাপাশি পুকুরে প্রাকৃতিক ছাঁকনি হিসেবে মিঠা পানির ঝিনুক এবং ক্ষতিকর উপাদান শুষে নেওয়ার জন্য পদ্ম ও গুপি ঘাসের মতো জলজ উদ্ভিদ রাখা হয়।
গবেষকরা সাধারণ পুকুরে শুধু চিংড়ি ও মাছ চাষের বদলে আইএমটিএ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, যেখানে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে ১২০ বর্গমিটারের ১২টি মাটির পুকুরে এই পরীক্ষা চালানো হয়। এই পদ্ধতিতে মাছ ও চিংড়ির পাশাপাশি পুকুরে জলজ উদ্ভিদ হিসেবে পদ্ম ও গুপি ঘাস এবং মিঠা পানির ঝিনুক ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে আইএমটিএ পদ্ধতিতে চাষ করা পুকুরে বেশ কিছু অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। এই পদ্ধতিতে চাষ করা পুকুরে গলদা চিংড়ি এবং 'জি-৩ রুই' মাছের বৃদ্ধি, বেঁচে থাকার হার এবং সামগ্রিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেশি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এই পদ্ধতিতে খামারিদের লাভের পরিমাণও অনেক বেশি। যেখানে সাধারণ পদ্ধতিতে লাভের হার ছিল ৪১ শতাংশ, সেখানে আইএমটিএ পদ্ধতির সবচেয়ে সফল প্রয়োগটিতে (ট্রিটমেন্ট ৩) লাভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ শতাংশ।
এছাড়া এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছ ও চিংড়িতে মানবদেহের জন্য উপকারী এসেনশিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড এবং পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ সাধারণ মাছের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে। পুকুরে পদ্ম, গুপি ঘাস ও ঝিনুক ব্যবহারের ফলে পানির গুণগত মান ভালো ছিল এবং ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুপ্ল্যাঙ্কটনের বৈচিত্র্য বেড়েছে, যা মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যের চমৎকার উৎস।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. লিফাত রাহী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়েই চলেছে, যা মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য একটি বড় হুমকি। এমন পরিস্থিতিতে অল্প লবণাক্ত পানিতে গলদা চিংড়ি ও রুই মাছের এই পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক আইএমটিএ চাষ পদ্ধতি দেশের প্রান্তিক খামারিদের জন্য নতুন সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করবে।
পাশাপাশি, এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছ ও চিংড়িতে পুষ্টিগুণ অনেক বেশি থাকায় এটি ভোক্তা পর্যায়েও নিরাপদ ও পুষ্টিকর আমিষের চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলেও উল্লেখ করেন ড. লিফাত।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি (এফএমআরটি) ডিসিপ্লিন পরিচালিত এই গবেষণায় ১০ জন গবেষক অংশ নেন। দলের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. লিফাত রাহী। এতে আরো যুক্ত ছিলেন মো. মুসফিকুর রহমান সরকার, ওয়াসিম আকরাম, নুর ফাতেমা এবং তানভীর শাহরিয়ার সোহাগ।
এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশ থেকে অংশ নেন মো. রাশেদুল ইসলাম ও মো. ইকবাল হোসেন। ইএফজি অ্যাকোয়া ফার্মের পক্ষ থেকে যুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ শওকত আলী ও মোহাম্মদ আব্দুল বাতেন ভূঁইয়া এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ-আল মামুন।






