• ই-পেপার

অহেতুক পেরেশানি থেকে মুক্তির দোয়া

ইসলামে উন্নত জীবনযাপনে প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
ইসলামে উন্নত জীবনযাপনে প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম অলসতা বা অন্যের ওপর নির্ভরশীলতাকে সমর্থন করে না; বরং ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল উপায়ে উপার্জনের লক্ষ্যে প্রয়োজনে কঠোর পরিশ্রমের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কারণ চেষ্টা ও পরিশ্রম ছাড়া কোনো কিছু পাওয়ার স্বপ্ন দেখা অবান্তর। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।’ (সুরা : নাজম, আয়াত :৩৯)

তাই দুনিয়ায় হালাল উপার্জন করার জন্য কোরআন-হাদিসের নির্দেশিত পদ্ধতিতে চেষ্টা করার গুরুত্বও অপরীসীম। পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করো এবং বেশি বেশি আল্লাহ স্মরণ করতে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ১০)

আয়াতদ্বয় প্রমাণ করে যে ইবাদতের পাশাপাশি বৈধ উপার্জনের জন্য চেষ্টা করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব।

ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল উপার্জনও এক ধরনের ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে উপার্জনের গুরুত্ব অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে আহার করতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০৭২)

যুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) সূত্রে মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে তার পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে আনা এবং তা বিক্রি করা, ফলে আল্লাহ তার চেহারাকে (ভিক্ষা করার লাঞ্ছনা থেকে) রক্ষা করেন, তা মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম, চাই তারা দিক বা না দিক।’ (বুখারি, হাদিস : ১৪৭১)

অর্থাৎ কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে কষ্ট করে উপার্জন করা অনেক বেশি সম্মানজনক।

সাহাবায়ে কেরামের জীবন ছিল এই শিক্ষার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মদিনায় হিজরতের পর অতি সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ঘি ও পনিরের ছোট ব্যবসা থেকে তিনি ধীরে ধীরে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম সফল ব্যবসায়ীতে পরিণত হন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে সততা, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম মানুষকে সফলতার শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। (সূত্র : আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা : ৩/৯৩, আল-ইসাবাহ : ৪/২৯১)

খাব্বাব ইবনে আরাত্ত (রা.) ছিলেন একজন দক্ষ কামার। তলোয়ার তৈরির শিল্পের মাধ্যমে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। আবার আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে রাখাল হিসেবে কাজ করতেন। এতে বোঝা যায়, ইসলামে কোনো হালাল পেশাই ছোট নয়; বরং মর্যাদা নির্ভর করে উপার্জনের বৈধতা ও কর্মের সততার ওপর। (সূত্র : সাহাবায়ে কেরামের আলোকিত জীবন)

কখনো কখনো পরিশ্রম করে হালাল উপার্জন করতে গিয়েও অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হতে হবে, তবে এতে দমে যাওয়া চলবে না; বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করে সব সমস্যা মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হবে। যেমন—সাহাবি সাদ ইবনে আইজ আল-ক্বারাজ (রা.) প্রথম দিকে বিভিন্ন ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু তিনি এতে হতাশ হয়ে কাজকর্ম ছেড়ে দেননি; বরং চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। পরবর্তী সময়ে নবীজি (সা.)-এর পরামর্শে ‘ক্বারাজ’ ব্যবসা শুরু করে সফলতা লাভ করেন। (তাহজিবুল কামাল : ১০/২৭৫)

এ ঘটনা আমাদের শেখায়, হালালভাবে চলতে গেলে কখনো কখনো পরীক্ষাস্বরূপ ব্যর্থতাও আসতে পারে, তবে এর মানে এই নয় যে জীবন সেখানেই থেমে যাবে; বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্যসহ তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করলে মহান আল্লাহই রাস্তা খুলে দেবেন।

হালালভাবে পরিশ্রমের অর্থ এই নয় যে সবাই অন্য পেশা ছেড়ে ব্যবসা/কারিগারি পেশায় ঝাঁপিয়ে পড়বে। সাহাবায়ে কেরামের কর্মজীবন শুধু ব্যবসা বা কারিগরি পেশায় সীমাবদ্ধ ছিল না। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দক্ষ প্রশাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। (তারিখুল খুলাফা : ১/১০৬-১০৭) মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) বিচারক ও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

(আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা ৭/২৭১-২৭২) আর আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.) আমানতদার প্রশাসক ও শিক্ষক হিসেবে উম্মাহর সেবা করেছেন। (আল ইস্তিআব : ৪/১৭১০)
এসব উদাহরণ প্রমাণ করে সমাজের কল্যাণে নিবেদিত প্রতিটি হালাল পেশাই ইসলামে সম্মানিত।

বর্তমান সমাজে দ্রুত ধনী হওয়ার মোহে অনেকেই হারাম উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অনেকে এমনও ধারণা পোষণ করেন যে বর্তমান যুগে চলতে গেলে এত হালাল-হারাম মানা সম্ভব নয়! অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো হালাল উপার্জনেই আল্লাহর রহমত ও বরকত নিহিত থাকে, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত দক্ষতা অর্জন করা, পরিশ্রমকে আপন করে নেওয়া এবং সততা ও আমানতদারিতার সঙ্গে হালাল জীবিকা অর্জন করা।

আজ পবিত্র কাবা শরিফ বার্ষিক ধৌতকরণ : সম্পন্ন হয়েছে সব প্রস্তুতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজ পবিত্র কাবা শরিফ বার্ষিক ধৌতকরণ : সম্পন্ন হয়েছে সব প্রস্তুতি
সংগৃহীত ছবি

আজ মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক পবিত্র স্থান পবিত্র কাবা শরিফ বার্ষিক ধৌতকরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে সুশোভিত হবে। এ উপলক্ষে দুই পবিত্র মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটির পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অত্যন্ত যত্ন, শৃঙ্খলা ও মর্যাদার সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হবে, যা বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের হৃদয়ে কাবা শরিফের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক।

প্রতিবছরের মতো এবারও কাবা শরিফ ধৌতকরণ কার্যক্রম সুপরিকল্পিত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথমে প্রস্তুতি পর্বে সকল প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। একই সঙ্গে ধৌতকরণ ও সুগন্ধিকরণের জন্য বিশেষ মিশ্রণ প্রস্তুত করা হয়। এ মিশ্রণে ব্যবহার করা হয় ১৫ লিটার পবিত্র জমজমের পানি, ১৫ লিটার তাইফের গোলাপ পানি, ১৫ লিটার গোলাপ তেল এবং ১০০ মিলিলিটার উৎকৃষ্ট মানের উদ (আগর) তেল। এ ছাড়া ধৌতকরণ চলাকালে কাবার গিলাফ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে দরজার আবরণের নিচের অংশ সতর্কতার সঙ্গে উপরে তুলে রাখা হয়।

এরপর শুরু হয় মূল ধৌতকরণ পর্ব। বিশেষভাবে প্রস্তুত করা কাপড়ের সাহায্যে জমজমের পানি ও তাইফের গোলাপ পানির মিশ্রণ দিয়ে কাবা শরিফের অভ্যন্তরের দেয়াল, স্তম্ভ এবং মেঝে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। সবশেষে সুগন্ধিকরণ ও ধূপন পর্ব। এ সময় কাবা শরিফের ভেতরের দেয়াল ও কোণাগুলো উৎকৃষ্ট মানের উদ তেল ও আম্বর দিয়ে সুগন্ধিত করা হয়। পরে মনোমুগ্ধকর সুগন্ধি ও ধূপের সুবাসে কাবার অভ্যন্তর ভরে ওঠে। এই আধ্যাত্মিক পরিবেশ প্রতিবছর মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে নতুন আবেগ ও ভালোবাসার সঞ্চার করে।

দুই পবিত্র মসজিদের সাধারণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে ব্যবহৃত প্রতিটি উপকরণ ও সরঞ্জাম আগেভাগেই সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশুদ্ধতা, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং সেবার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করেই সম্পন্ন করা হবে কাবা শরিফ ধৌতকরণের এই আধ্যাত্মিক আয়োজন।

আহলে বাইত : মহানবী (সা.)–এর পবিত্র পরিবার

মুফতি ওমর বিন নাছির
আহলে বাইত : মহানবী (সা.)–এর পবিত্র পরিবার
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হলেন মহানবী (সা.)। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। তাঁর প্রতি ঈমান, ভালোবাসা ও আনুগত্য যেমন ইসলামের মৌলিক দাবি, তেমনি তাঁর পবিত্র পরিবার—আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনও একজন মুমিনের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণেই প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আমরা দরুদ শরিফ পাঠ করার সময় শুধু মহানবী (সা.)-এর জন্য নয়, তাঁর পরিবারবর্গের জন্যও আল্লাহর কাছে রহমত ও বরকতের দোয়া করি— 


اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ
এটি শুধু একটি দোয়া নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর কাছে আহলে বাইতের মর্যাদা ও সম্মানের এক চিরন্তন ঘোষণা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ অনেক মুসলমান আহলে বাইত সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখেন না। কেউ তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে গিয়ে সীমা অতিক্রম করেন, আবার কেউ তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে উদাসীনতা দেখান। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো মধ্যপন্থা—আহলে বাইতকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান করতে হবে, তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে; তবে এমন কোনো বিশ্বাস পোষণ করা যাবে না, যা কোরআন ও সুন্নাহর সীমার বাইরে চলে যায়।

‘আহলে বাইত’ শব্দের অর্থ হলো ‘গৃহের লোক’ বা ‘পরিবারের সদস্য’। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে আহলে বাইত! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের থেকে সব ধরনের অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)

এই আয়াত আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতগুলো সরাসরি মহানবী (সা.)-এর পবিত্র স্ত্রীদের উদ্দেশে নাজিল হয়েছে। তাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সর্বসম্মত আকিদা হলো, উম্মাহাতুল মুমিনীন তথা মহানবী (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীরা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি আলী (রা.), ফাতিমা (রা.), ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হুসাইন (রা.) আহলে বাইতের বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত সদস্য। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত বিখ্যাত ‘হাদিসে কিসা’-তে আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন মহানবী (সা.) একটি চাদরের নিচে হাসান, হুসাইন, ফাতিমা ও আলী (রা.)-কে একত্র করে উপরোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪২৪)। এর মাধ্যমে তাঁদের বিশেষ ফজিলত ও সম্মান স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।

এতেই আহলে বাইতের পরিধি শেষ নয়। অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফকিহের মতে, বনু হাশিমের মুসলিম সদস্যরাও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহানবী (সা.)-এর চাচা আব্বাস (রা.) ও তাঁর বংশধর, আকিল (রা.)-এর পরিবার, জাফর (রা.)-এর পরিবার এবং হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধররা। মহানবী (সা.) তাঁদের প্রতিও বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং মুসলিম উম্মাহকে তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আহলে বাইতের সম্মান এতটাই মহান যে তাঁদের জন্য সাধারণ জাকাত ও সাদকা গ্রহণ হারাম করা হয়েছে। যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণনা করেন, মক্কা ও মদিনার মাঝখানে ‘গাদিরে খুম’ নামক স্থানে মহানবী (সা.) ভাষণ দিতে গিয়ে তিনবার বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।’ পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, তাঁর স্ত্রীরা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত এবং যাঁদের জন্য সাদকা হারাম, তাঁরাও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৮৪৬৪)
আর সদকার মালের পরিবর্তে আল্লাহ তাআলা তাঁদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদের (গনিমতের) নির্ধারিত অংশ রেখেছিলেন, যা তাঁদের মর্যাদারই বহিঃপ্রকাশ।

মহানবী (সা.) তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা সম্পর্কে বহু হাদিসে আলোকপাত করেছেন। গাদিরে খুমের ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ‘আমি যার অভিভাবক (ঘনিষ্ঠ বন্ধু), আলীও তার অভিভাবক। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালোবাসে, আপনি তাকে ভালোবাসুন এবং যে তাঁর শত্রুতা করে, আপনি তার শত্রু হন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৯৬১)। 

একই ভাবে তিনি ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘হাসান ও হুসাইন জান্নাতি যুবকদের নেতা।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস : ৩৭৬৮)। 
আর তাঁর প্রিয় কন্যা ফাতিমা (রা.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘ফাতিমা জান্নাতের নারীদের নেত্রী।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৭১৪)

 এসব হাদিস প্রমাণ করে যে আহলে বাইতের সদস্যরা শুধু নবীজির আত্মীয়ই নন; তাঁরা ইসলামের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তাই আহলে বাইতের প্রতি একজন মুমিনের প্রথম কর্তব্য হলো তাঁদেরকে অন্তর থেকে ভালোবাসা। এ ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি ঈমানের দাবি। দ্বিতীয় কর্তব্য হলো তাঁদের যথাযথ সম্মান করা এবং তাঁদের সম্পর্কে কোনো ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য বা বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব থেকে বিরত থাকা। তৃতীয় কর্তব্য হলো তাঁদের জীবনাদর্শ অনুসরণ করা। 
 আলী (রা.)-এর জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা ও সাহস, ফাতিমা (রা.)-এর ইবাদত, লজ্জাশীলতা ও ত্যাগ, ইমাম হাসান (রা.)-এর ধৈর্য ও উদারতা এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সত্যের জন্য আত্মত্যাগ—এসব প্রতিটি মুসলমানের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

তবে এ ক্ষেত্রেও ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা স্মরণ রাখা জরুরি। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয়, যাতে তাঁদেরকে নবুয়তের মর্যাদায় উন্নীত করা হয় বা তাঁদের সম্পর্কে এমন বিশ্বাস পোষণ করা হয়, যার কোনো ভিত্তি কোরআন ও সহিহ সুন্নাহে নেই। আবার অন্যদিকে তাঁদের মর্যাদা অস্বীকার করা, তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা কিংবা তাঁদের অবমূল্যায়ন করাও মারাত্মক অন্যায়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো—আহলে বাইত এবং সকল সাহাবায়ে কিরাম—উভয়ের প্রতিই ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করা। একজনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যজনকে হেয় করা কখনোই ইসলামের শিক্ষা নয়।

বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো— 
ইসলামের ইতিহাসে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে চিরস্থায়ী বেদনার স্মারক। ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শাহাদাত নিঃসন্দেহে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক অধ্যায়। এ ঘটনার পর মুসলিম সমাজে নানা মতভেদ ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়। কেউ আহলে বাইতের প্রতি অতিভক্তি দেখাতে গিয়ে অন্য সাহাবিদের অবমাননা করেছে, আবার কেউ সাহাবিদের সম্মান করতে গিয়ে আহলে বাইতের প্রাপ্য মর্যাদা উপেক্ষা করেছে। অথচ কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের যে পথ দেখিয়েছে, তা হলো ন্যায়, ভারসাম্য ও সংযমের পথ। এক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সাহাবায়ে কেরাম সবাই ছিলেন ‘মিয়ারে হক’ তথা ‘সত্যের মাপকাঠি’। তাই কোনো ভাবেই তাঁদের কারো প্রতি কোনো ধরণের বিদ্বেষ বা রূঢ়মনোভাব পোষন করা যাবে না। 

আহলে বাইত ছিলেন ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান, ইবাদত, ত্যাগ, ধৈর্য ও সত্যের পথে অবিচল থাকার জীবন্ত প্রতীক। তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় শুধু আবেগ নয়; বরং তাঁদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা, তাঁদের আদর্শকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দোয়া অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে সকল সাহাবায়ে কিরামের প্রতিও আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখা একজন সুন্নি মুসলমানের আকিদার অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করার, তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে যথাযথভাবে ভালোবাসার এবং সকল সাহাবায়ে কিরামের মর্যাদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেকোনো বিপদে যে দশ ভাবে রবের নৈকট্য লাভ হয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেকোনো বিপদে যে দশ ভাবে রবের নৈকট্য লাভ হয়
সংগৃহীত ছবি

কোনো মানুষের ওপর যদি এমন কোনো বিপদ আসে, যার আগে তার কোনো গুনাহ নেই, তাহলে বলা হয়, এটি তার ধৈর্যের পরীক্ষা এবং সওয়াবের আশায় তার মর্যাদা বৃদ্ধি করার একটি মাধ্যম। এই বিপদ কোনো গুনাহ মোচনের জন্য নাও হতে পারে; বরং এটি তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আসে, যাতে সে ধৈর্যের মাধ্যমে ধৈর্যশীলদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে পারে।

প্রত্যেক বিপদের মধ্যে ১০টি উপকার আছে, যার জন্য বান্দার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত—

এক. মানুষের দুর্বলতা ও আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতার স্মরণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তোমার পূর্ববর্তী জাতিগুলোর কাছে রাসুলদের পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর তাদের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম, যাতে তারা বিনীতভাবে আমার কাছে প্রার্থনা করে।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৪২)

দুই. আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করিয়ে দেওয়া : রোগ না হলে মানুষ সুস্থতার মূল্য বুঝতে পারে না। সম্পদ হারানোর অভিজ্ঞতা না হলে ধন-সম্পদের মূল্য উপলব্ধি হয় না। কারণ বিপরীত বিষয়ের মাধ্যমে জিনিসের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায়।

তিন. ধর্মীয় উদাসীনতা ও ঘুমন্ত অবস্থা থেকে মানুষকে জাগিয়ে তোলা : আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তাদের বড় শাস্তির আগে ছোট শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : আস-সাজদাহ, আয়াত : ২১)

চার. গুনাহ ও ভুলত্রুটি মাফ হওয়া : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি বিপদে ফেলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৪৫)

অর্থাৎ এমন বিপদ, যা তার স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে, সম্পদে ক্ষতি করে অথবা আনন্দকে দুঃখে পরিণত করে। কোনো কোনো মুসলিম মনীষী বলেন, ‘যদি বিপদ-মুসিবত না আসত, তবে আমরা কিয়ামতের দিন নিঃস্ব অবস্থায় উপস্থিত হতাম।’

পাঁচ. মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়া : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কখনো কখনো কোনো ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে নিজের আমল দ্বারা অর্জন করতে পারে না। তখন আল্লাহ তাকে এমন বিষয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করতে থাকেন যা সে অপছন্দ করে, অবশেষে তাকে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দেন।’ সহিহুল জামে, হাদিস : ১৬২৫)

ছয়. আত্মোপলব্ধি করা : বিপদ এলে এই চিন্তা করা যে আল্লাহ চাইলে বিপদ আরো বড় হতে পারত। তাই বান্দার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা। কারো কিছু সম্পদ নষ্ট হলে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে যে তার সব সম্পদ নষ্ট হয়নি।

সাত. বিপদ দুনিয়ায়ই সীমাবদ্ধ থাকা : দুনিয়ার বিপদ ক্ষণস্থায়ী এবং এর প্রভাবও সীমিত। সময়ের সঙ্গে মানুষ তা ভুলে যায় বা তা সহ্য করার শক্তি পায়। কিন্তু আখিরাতের বিপদ দীর্ঘস্থায়ী, কঠিন ও অত্যন্ত ভয়াবহ।

আট. উত্তম প্রতিদান লাভ : ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনের কারণে উত্তম প্রতিদান লাভ করা। উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি—কোনো মুসলিম যখন কোনো বিপদে আক্রান্ত হয় এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী বলে—‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’ এবং বলে—‘হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে উত্তম কিছু দান করুন।’ তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন। (মুসলিম, হাদিস : ৯১৮)

নয়. অগণিত সওয়াবের অধিকারী হওয়া : বিপদের চেয়ে তার প্রতিদান অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে প্রদান করা হবে।’ (সুরা : আয-ঝুমার, আয়াত : ১০)

দশ. দুনিয়াকেন্দ্রিক বিপদ অপেক্ষাকৃত ভালো : এর জন্য শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে দ্বিনের ওপর বিপদ আসেনি। এটি আল্লাহর বড় অনুগ্রহ। কারণ দুনিয়ার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু দ্বিনের ক্ষতি সবচেয়ে বড় ক্ষতি। রাসুলুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি দোয়া ছিল—‘হে আল্লাহ! আমাদের দ্বিনের মধ্যে আমাদের ওপর কোনো বিপদ চাপিয়ে দেবেন না। আর দুনিয়াকে আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা ও আমাদের জ্ঞানের চূড়ান্ত সীমা বানাবেন না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫০২)

সারকথা হলো মুমিনের কাছে বিপদ শুধু কষ্টের নাম নয়; বরং তা হতে পারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, গুনাহ মাফের কারণ, মর্যাদা বৃদ্ধির পথ এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার সোপান। তাই বিপদের সময় ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতার পথ অবলম্বন করাই ঈমানের সৌন্দর্য।