মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি শুধু একজন নবী নন; তিনি আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ রাসুল, সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ এবং ঈমানদারদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা সমুন্নত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি অবমাননা, বিদ্রূপ ও বেয়াদবির বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা মহানবী (সা.)-কে উপহাস করেছে, তাঁর বিরোধিতা করেছে এবং তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের অনেকেই দুনিয়াতেই ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছে। এটি আজ শুধু ইতিহাস নয়; বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে, আল্লাহর প্রিয় রাসুলের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৫)
মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো, তাঁকে সাহায্য করো এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করো।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৮–৯)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত করেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৭)
মক্কার পাঁচ বিদ্রূপকারীর করুণ পরিণতি
মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এমন পাঁচজন কুখ্যাত ব্যক্তি ছিল, যারা মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ, অপমান ও নির্যাতন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল। তারা হলো— ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস, হারেস ইবনে আইতাল ও আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি।
একদিন জিবরাঈল (আ.) মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হলে মহানবী (সা.) তাঁদের অত্যাচারের কথা উল্লেখ করেন। এরপর একে একে ওই ব্যক্তিরা সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে জিবরাঈল (আ.) তাদের শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি তার জন্য যথেষ্ট।’ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহ তাআলার ফয়সালা বাস্তবায়িত হতে শুরু করল।
১. ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা : একদিন খুজাআ গোত্রের এক ব্যক্তি তীর ঠিক করছিল। অসাবধানতাবশত একটি তীর ছিটকে এসে ওয়ালিদের আঙুলে আঘাত করে। সামান্য ক্ষতই পরে মারাত্মক হয়ে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে মৃত্যুবরণ করে।
২. আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব : সে সন্তানদের নিয়ে গাছতলায় বসেছিল। হঠাৎ আতঙ্কে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আমাকে বাঁচাও! কেউ আমার চোখে কাঁটা ঢুকিয়ে দিচ্ছে!’ তার সন্তানরা কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু সে আর্তনাদ করতে থাকল। শেষ পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্ধ অবস্থায় যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করে।
৩. আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস : তার মাথায় ভয়াবহ ফোড়া ও ক্ষত সৃষ্টি হয়। পুরো মাথা ক্ষতে ভরে যায় এবং সেই দুরারোগ্য ব্যাধিতেই তার মৃত্যু ঘটে।
৪. হারেস ইবনে আইতাল : সে এমন এক অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হয়, যাতে তার পেট হলুদ পানিতে ফুলে যায়। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয় যে মুখ দিয়েই পেটের ময়লা বের হতে থাকে। দীর্ঘ কষ্টের পর সে মৃত্যুবরণ করে।
৫. আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি : তায়েফ যাওয়ার পথে তার গাধা একটি কাঁটাযুক্ত ঝোপে বসে পড়ে। একটি কাঁটা তার পায়ে গভীরভাবে বিঁধে যায়। সেই ক্ষত বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়েছে ইমাম বায়হাকির আসসুনানুল কুবরা (৯/৮)-এ। ঐতিহাসিক ও সীরাতগ্রন্থগুলোতেও এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
১. মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ।
২. মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ করা বা তাঁর শানে বেয়াদবি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
৩. আল্লাহ তাআলা চাইলে দুনিয়াতেই অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারেন।
৪. মুসলমানের কর্তব্য হলো মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর মর্যাদা সমুন্নত রাখা।
৫. কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে শাস্তি না পেলেও আখিরাতের শাস্তি আরো কঠিন হতে পারে; তাই বাহ্যিক পরিণতি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।
আজকের যুগেও একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিজের কথা, লেখা, আচরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার—সবক্ষেত্রেই মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং তাঁর আদর্শকে ভালোবাসা, অনুসরণ ও প্রচারের মাধ্যমে প্রকৃত মহব্বতের প্রমাণ দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।




