• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২২ জুন ২০২৬

মুমিনের নবী প্রেমে আলোকিত জীবন

মাওলানা আদনান জহির
মুমিনের নবী প্রেমে আলোকিত জীবন
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবী যখন জাহিলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল, মানবতা যখন পথহারা, অত্যাচার আর নৈতিক অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, তখন মহান আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির হেদায়েত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল মুহাম্মদ (সা.) প্রেরণ করেন। তাঁর আগমনে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী আলোকিত হয়, মূর্খতা ও কুসংস্কারের স্থান দখল করে জ্ঞান, ন্যায়, শান্তি ও মানবতার শিক্ষা। তিনি শুধু একজন নবী ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, সর্বোত্তম আদর্শ এবং আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা। তাই একজন মুমিনের জীবনে ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করা। এ ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং এটি ঈমানের প্রাণ, হৃদয়ের স্পন্দন এবং জান্নাতের পথে চলার অন্যতম প্রধান পাথেয়।

নবী প্রেম ঈমানের অপরিহার্য শর্ত
মহান আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসাকে ঈমানের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের সবকিছুর চেয়ে নবীজিকে বেশি ভালোবাসতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫)

এ হাদিস আমাদের শেখায় যে নবীজির ভালোবাসা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং এটি ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সর্বাধিক ভালোবাসার নির্দেশ
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করে বলেন, ‘বলুন, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তোমাদের পছন্দের বাসস্থান আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং তাঁর পথে জিহাদের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত।’ (সুরা : তাওবাহ, আয়াত : ২৪)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে একজন মুমিনের হৃদয়ে সর্বোচ্চ স্থানে থাকতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা।

ওমর (রা.)-এর ঈমান পূর্ণতার ঘটনা
একদিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবন ছাড়া সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রিয়।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘না, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয় হই, ততক্ষণ তোমার ঈমান পূর্ণ হবে না।’ তখন ওমর (রা.) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার নিজের জীবনের চেয়েও বেশি প্রিয়।’ তখন (সা.) বললেন, ‘এখন, হে ওমর! (তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে)।’ (সহিহ বুখারি)

এ ঘটনা আমাদের শেখায় যে প্রকৃত ঈমান তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন নবীজির ভালোবাসা নিজের প্রাণের ভালোবাসাকেও অতিক্রম করে যায়।


সাওবান (রা.)-এর হৃদয়স্পর্শী নবী প্রেম
সাহাবি সাওবান (রা.) নবীজির বিচ্ছেদ কল্পনা করেও অস্থির হয়ে পড়তেন। তিনি একদিন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমার কাছে আমার জীবন, পরিবার ও সন্তানদের চেয়েও অধিক প্রিয়। যখন আমি আপনাকে দেখতে পাই না, তখন অস্থির হয়ে পড়ি। আর যখন আপনার ও আমার মৃত্যুর কথা চিন্তা করি, তখন ভাবি—আপনি তো জান্নাতে নবীদের সর্বোচ্চ মর্যাদায় থাকবেন, আমি যদি জান্নাতে প্রবেশও করি, তবে হয়তো আপনাকে দেখতে পাব না।’ তাঁর এ গভীর ভালোবাসার প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা নবী, সিদ্দিক, শহিদ ও নেককারদের সঙ্গী হবে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৬৯)

এ আয়াত নবীপ্রেমিকদের জন্য এক মহাসুসংবাদ।

খুবাইব (রা.)-এর বিস্ময়কর নবী প্রেম
ইসলামের ইতিহাসে নবী প্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত খুবাইব (রা.)। শত্রুরা তাঁকে বন্দী করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত করেছিল। সেই মুহূর্তে আবু সুফিয়ান (তখনও মুসলিম হননি) তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি চাও, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ (সা.) এখানে থাকুন এবং তাঁকে হত্যা করা হোক, আর তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে নিরাপদে ফিরে যাও?’ খুবাইব (রা.) দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবার-পরিজনের মাঝে নিরাপদে থাকার বিনিময়েও এটা পছন্দ করি না যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র পায়ে একটি কাঁটাও ফুটুক।’ এই উত্তর শুনে কাফেররাও হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এমন নিখাদ ভালোবাসার নজির মানব ইতিহাসে বিরল।

নবী প্রেমের প্রকৃত আলামত
নবী প্রেম শুধু মুখের দাবি নয়; এর বাস্তব প্রমাণ থাকতে হবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

১. সুন্নতের অনুসরণ করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই নবী প্রেমের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ। ইবাদত, আচার-আচরণ, লেনদেন, পরিবার ও সমাজ—সর্বত্র তাঁর সুন্নত অনুসরণ করতে হবে।
২. অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা : যে ভালোবাসে, সে প্রিয়জনকে বেশি স্মরণ করে। তাই নবীপ্রেমিকের জিহ্বা সর্বদা দরুদে সিক্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)
৩. নবীজির সীরাত অধ্যয়ন করা : যত বেশি নবীজির জীবন জানব, তত বেশি তাঁকে ভালোবাসব। তাঁর জীবনচরিত, সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শ অধ্যয়ন করা নবী প্রেমকে গভীর করে।
৪. তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা : নবীজির নাম শুনলে দরুদ পাঠ করা, তাঁর সুন্নতকে সম্মান করা এবং তাঁর কোনো নির্দেশকে অবহেলা না করা প্রকৃত ভালোবাসার পরিচয়।
৫. দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করা : নবীজির আনা দ্বীনকে নিজে পালন করা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা নবী প্রেমের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ।
৬. আহলে বাইত ও সাহাবিদের ভালোবাসা পোষন করা : রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার ও সাহাবিদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করাও নবী প্রেমের অংশ। কারণ প্রকৃত প্রেমিক প্রিয়জনের প্রিয়জনদেরও ভালোবাসে।


নবী প্রেমের সর্বোচ্চ পুরস্কার
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যার সঙ্গে ভালোবাসা রাখে, কিয়ামতের দিন সে তার সঙ্গেই থাকবে।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিস নবীপ্রেমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালোবাসবে, তাঁর সুন্নত অনুসরণ করবে এবং তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন গড়বে, আল্লাহর রহমতে সে কিয়ামতের দিন তাঁর সঙ্গ লাভ করবে।

তাই নবী প্রেম কোনো আবেগঘন স্লোগানের নাম নয়; এটি ঈমানের প্রাণ, আত্মার খাদ্য এবং জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। প্রকৃত নবীপ্রেমিক সেই ব্যক্তি, যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরে, তাঁর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করে এবং তাঁর ভালোবাসাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। আসুন, আমরা শুধু মুখে ‘আমি নবীজিকে ভালোবাসি’ বলেই ক্ষান্ত না হই; বরং তাঁর নির্দেশিত পথে চলি, তাঁর সুন্নতকে জীবিত করি এবং নিজেদের জীবনকে তাঁর আদর্শে রঙিন করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সত্যিকার অর্থে আশেকে রাসুল হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য নসিব করুন।

লেখক : শিক্ষক, মাদরাসাতু ইউছুফিয়্যা সরাইল, বি-বাড়িয়া।

উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনে যেসব বিষয় লক্ষণীয়

মুফতি দিদার হুসাইন
উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনে যেসব বিষয় লক্ষণীয়
সংগৃহীত ছবি

আমাদের সমাজে মিরাস (উত্তরাধিকার) সংক্রান্ত অবহেলা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারো মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পদের সুষ্ঠু নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়, যার ফলে পরিবারে বিরোধ ও আত্মীয়তার বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কখনো কখনো এমনও ঘটনা ঘটে যে উত্তরাধিকার সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে মৃত ব্যক্তির দাফন পর্যন্ত আটকে থাকে (নাউজুবিল্লাহ)। অথচ শরিয়ত কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মৃত ব্যক্তির সম্পদের ওপর চারটি সুস্পষ্ট কর্তব্য নির্ধারণ করেছে।
কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা : মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে সর্বপ্রথম তার কাফন-দাফনের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা হবে। কারণ মৃত্যুর পর একজন মুসলিমের সম্মানজনক দাফন নিশ্চিত করা জীবিতদের ওপর ফরজে কিফায়া।

তবে যদি কোনো আত্মীয়-স্বজন বা শুভানুধ্যায়ী স্বেচ্ছায় নিজ সম্পদ থেকে এই ব্যয় বহন করেন, তাহলে মৃতের সম্পদ থেকে ব্যয় করা আবশ্যক থাকবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃতের সম্মান রক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের মৃতদের দ্রুত দাফন করো। (মুসলিম, হাদিস : ৯৪৪)

বিদায় হজে ইহরাম অবস্থায় এক ব্যক্তি উটের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও এবং তার নিজের দুটি কাপড়েই তাকে কাফন পরাও।’ (বুখারি, হাদিস : ১২৬৫)

অন্য হাদিসে এসেছে, উহুদের যুদ্ধে যখন মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) শহীদ হন, তখন তাঁর কাফনের জন্য শুধু একটি চাদর অবশিষ্ট ছিল। খাব্বাব (রা.) বর্ণনা করেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের নির্দেশ দিলেন যেন আমরা তা দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিই এবং তার পায়ের ওপর ‘ইজখির’ (এক প্রকার সুগন্ধি ঘাস) দিয়ে দিই। (বুখারি, হাদিস : ১২৭৬, মাআরিফুল কোরআন : ২/৩২০, আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ : ৬/৪৪০)

ঋণ পরিশোধ করা : দ্বিতীয় কর্তব্য হলো মৃত ব্যক্তির সব ঋণ পরিশোধ করা। তার ওপর কারো হক থাকলে মিরাস বণ্টনের আগেই তা আদায় করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘(মিরাস বণ্টন হবে) তার কৃত অসিয়ত পূরণের পর এবং ঋণ পরিশোধের পর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১)

ঋণের গুরুত্ব এত বেশি যে শহীদের মতো মহান মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তির গুনাহও ঋণের কারণে অবশিষ্ট থাকতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করা হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৮৫-১৮৮৬, আহকামুল কোরআন, জাসসাস (রহ.) কৃত, ২/১২০, আল মাবসুত, সারাখসি (রহ.) কৃত, ৯/২০৩, মাআরিফুল কোরআন : ২/৩২০)

স্ত্রীর অনাদায়ী মোহরও ঋণের অন্তর্ভুক্ত : স্বামীর ওপর স্ত্রীর মোহর যদি অনাদায়ী থাকে, তবে সেটিও শরিয়তের দৃষ্টিতে ঋণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজে এ বিষয়ে মারাত্মক অবহেলা রয়েছে। যদি স্ত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে মোহর মওকুফ না করেন, তবে তা স্বামীর ওপর ঋণ হিসেবেই বহাল থাকবে। জবরদস্তি, সামাজিক চাপ বা মানসিক বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে মোহর মাফ করিয়ে নিলে শরিয়তে তা গ্রহণযোগ্য নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪)

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পূরণ করার যোগ্য হলো সেই শর্ত, যার মাধ্যমে তোমরা নারীদের লজ্জাস্থানকে নিজেদের জন্য হালাল করেছ (অর্থাৎ মোহরানা)।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭২১)

বৈধ অসিয়ত পূর্ণ করা : তৃতীয় কর্তব্য হলো মৃত ব্যক্তির বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন করা। ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ থেকে তার বৈধ অসিয়ত পূরণ করা হবে। যেমন—নামাজের কাজার ফিদয়া আদায়, রোজার ফিদয়া প্রদান—এ ধরনের অন্যান্য বৈধ অসিয়ত।

কিছু অসিয়ত আছে এমন, যা কার্যকর করা যাবে না। যেমন—অবৈধ কাজের অসিয়ত, কোনো ওয়ারিশের অনুকূলে বৈষম্যমূলক অযৌক্তিক অসিয়ত (অন্য ওয়ারিশদের অনুমতি ছাড়া)। (আল মাবসুত : ৯/২০২, মাআরিফুল কোরআন : ২/৩২০, আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ : ৬/৪৪০)

তার বৈধ অসিয়তসমূহ পরিত্যক্ত সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ থেকে আদায় করতে হবে। এ সীমার মধ্যে থেকেই অসিয়ত বাস্তবায়ন করা শরিয়তের বিধান। যদি এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ দ্বারা সম্পূর্ণ অসিয়ত পূরণ করা সম্ভব না হয়, তবে অবশিষ্ট সম্পদ থেকে তা পূরণ করা আবশ্যক নয়; বরং এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্তই তা সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে সব ওয়ারিশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মত হলে এবং তাদের মধ্যে কেউ অপ্রাপ্তবয়স্ক না থাকলে, পরিত্যক্ত সম্পদের অতিরিক্ত অংশ থেকেও অসিয়ত পূর্ণ করা যেতে পারে। (আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ : ৬/১১৪, ইমদাদুল মুফতিন, পৃ. ৮৬৩)

মিরাস বণ্টন করা : ওপরের তিনটি কর্তব্য সম্পন্ন করার পর অবশিষ্ট সম্পদ শরিয়তের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হবে—এটিই চতুর্থ ও চূড়ান্ত কর্তব্য। দুঃখজনকভাবে এ ক্ষেত্রেই সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলা দেখা যায়। অনেকে মনে করেন, সম্পদ যেহেতু পরিবারেই আছে, তাই এখনই ভাগ করার প্রয়োজন নেই; আবার কেউ প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফলে দুর্বল ওয়ারিশদের হক নষ্ট হয়। অথচ ব্যক্তির ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গেই তার পরিত্যক্ত সম্পদে শরিয়ত নির্ধারিত ওয়ারিশদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, পুরুষদের জন্য রয়েছে মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে অংশ এবং নারীদের জন্যও রয়েছে অংশ। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭)

মিরাসে কারো প্রাপ্য অংশ থেকে তাকে বঞ্চিত করা শুধু সামাজিক অন্যায় নয়; এটি আল্লাহ নির্ধারিত অধিকারে হস্তক্ষেপ, যা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

জাকাতের হিসাবে ব্যবহৃত উটের বিভিন্ন পরিভাষা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জাকাতের হিসাবে ব্যবহৃত উটের বিভিন্ন পরিভাষা
সংগৃহীত ছবি

আরব উপদ্বীপের মরুময় জীবনে উট শুধু একটি পশু নয়; বরং জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর অংশ। প্রাচীন আরবদের ভাষাগত ঐতিহ্যে উটের জীবনচক্র ও তার বয়সভিত্তিক নামকরণের সূক্ষ্ম বর্ণনা আজও গবেষকদের বিস্মিত করে।

নবজাতক থেকে শুরু করে পূর্ণবয়স্ক ও বৃদ্ধ উট পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা শব্দ ও পরিভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে আরবরা উটকে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মর্যাদায় স্থান দিয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে উটের বয়স ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে বিভিন্ন নাম ব্যবহৃত হয়।

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ উটকে ‘জামাল’ এবং স্ত্রী উটকে ‘নাকাহ’ বলা হয়। পাশাপাশি উটের জাত, রং ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীও বিভিন্ন শ্রেণি বিভাগ প্রচলিত ছিল; যেমন—মাজাহিম, মাগাতিরসহ নানা বংশগত নাম, যা আজও উটপ্রেমী ও মালিকদের মধ্যে ব্যবহৃত হয়।

আরবি ভাষায় উটের বয়সভিত্তিক নামকরণ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সাধারণভাবে উটের বয়স অনুযায়ী ব্যবহৃত কয়েকটি প্রসিদ্ধ নাম হলো—জন্ম থেকে দুধপানকালে উটের বাচ্চাকে ‘হিওয়ার’ বলা হয়। এক বছর পূর্ণ হলে ‘ফাসিল’, দুই বছর পূর্ণ হলে ‘ইবনু মাখাদ’, তিন বছর পূর্ণ হলে ‘ইবনু লাবুন’, চার বছর পূর্ণ হলে ‘হিক্ক’, পাঁচ বছর পূর্ণ হলে ‘জাযা’, ছয় বছর পূর্ণ হলে ‘সানিয়্য’, সাত বছর পূর্ণ হলে ‘রুবাঈয়্য’, আট বছর পূর্ণ হলে ‘সাদিস’, ৯ বছর পূর্ণ হলে ‘বাজিল’, ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব ‘মুখলিফ’ বা ‘জামাল’ বলা হয়।

এ ছাড়া স্ত্রী উটের ক্ষেত্রে ‘বিনতু মাখাদ’—দুই বছরের মাদি উট, ‘বিনতু লাবুন’—তিন বছরের মাদি উট, ‘হিক্কাহ’ চার বছরের মাদি উট, ‘জাযাআহ’—পাঁচ বছরের মাদি উট আর প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী উটনীকে ‘নাকাহ’ বলা হয়।
এই নামগুলোর বেশির ভাগই ইসলামী ফিকহে, বিশেষ করে জাকাতের উটের নিসাব নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। তাই এগুলো শুধু ভাষাগত নয়, ইসলামের দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা।

আরব সমাজে উট মরুভূমির জীবনধারণের অপরিহার্য সহচর। দীর্ঘ মরু পথ অতিক্রম, বাণিজ্য কাফেলার যাতায়াত, পানি ও পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই উট ছিল প্রধান অবলম্বন। এর দুধ, মাংস, চামড়া ও পশম ছিল দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কঠিন মরু পরিবেশে দীর্ঘ সময় পানি ছাড়া বেঁচে থাকা এবং দূরপথ অতিক্রম করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে উটকে মরুভূমির ‘জীবনরেখা’ বলা হতো।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলো জানায়, উট প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সক্ষম ছিল, যা প্রাচীন বাণিজ্যিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছিল। আধুনিক যানবাহনের আগমনের আগে আরব অঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল এই প্রাণীটি। উটকে ঘিরে আরব সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ মৌখিক ঐতিহ্যও। কাফেলা চলার সময় মেষপালক ও কাফেলা-নেতারা যে সুরেলা গান গাইতেন, তা ‘হুদা’ নামে পরিচিত ছিল। উটের স্বাভাবিক ডাক ও শব্দও আরব ভাষায় আলাদা আলাদা পরিভাষায় চিহ্নিত করা হতো, যা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও ভাষার গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য ছিল উটের গায়ে বিশেষ চিহ্ন বা ‘দাগ’ দেওয়া, যার মাধ্যমে মালিকানা শনাক্ত করা হতো। গোত্রভিত্তিক সমাজে এটি ছিল একটি প্রচলিত ও গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উট এখন আর শুধু পরিবহনের মাধ্যম নয়; বরং আরব পরিচয়, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিভিন্ন উৎসব, গবেষণা কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে উট সম্পর্কিত পরিভাষা ও ঐতিহ্য আবারও নতুনভাবে আলোচনায় আসছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, আরব ঐতিহ্যে উটের এই বিস্তৃত ও সূক্ষ্ম বিবরণ শুধু একটি প্রাণীর ইতিহাস নয়; বরং এটি মরুভূমির মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক জীবন্ত দলিল।

রুকু থেকে উঠে যে দোয়াটি পড়লে ফেরেশতারা সওয়াব লেখার প্রতিযোগিতা করেন

অনলাইন ডেস্ক
রুকু থেকে উঠে যে দোয়াটি পড়লে ফেরেশতারা সওয়াব লেখার প্রতিযোগিতা করেন
প্রতীকী ছবি

দোয়া হলো ইবাদতের অংশ। ভাগ্য পরিবর্তনে দোয়ার বিকল্প কিছু নেই। এজন্য বিপদ-আপদ কিংবা দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি অথবা কল্যাণ চেয়ে বরাবরই মুমিনরা সৃষ্টিকর্তার দরবারে দু’হাত তুলে ধরেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, সৎকর্ম ব্যতীত অন্য কিছু আয়ুষ্কাল বাড়াতে পারে না এবং দোয়া ব্যতীত অন্য কিছুতে তাকদীর (ভাগ্য) রদ হয় না। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৪০২২)

অন্যদিকে নামাজ অন্যতম ফরজ ইবাদত। পবিত্র কুরআনে ৮২ বার নামাজের কথা এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩)। আবার হাদিসেও একাধিকবার নামাজ আদায়ের কথা এসেছে। সেই সঙ্গে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ওয়াক্তমতো নামাজ আদায়ের ওপরও। এমনকি খোদ মহান আল্লাহর কাছেও যথাসময়ে সালাত আদায় করা অধিক প্রিয় আমল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২)

এ ক্ষেত্রে নামাজ আদায়ের সময় বিশেষ কিছু দোয়া রয়েছে যেগুলোর বিশেষ ফজিলত রয়েছে। এরমধ্যে আছে রুকু শেষে বিশেষ দোয়ার কথাও। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ইমাম যখন ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদা’ বলেন তখন তোমরা ‘আল্লাহুম্মা রাব্বানা লাকাল হামদ্‌’ বলবে। কেননা, যার এ উক্তি ফেরেশতাদের সঙ্গে একই সময়ে উচ্চারিত হয়, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৬০)

অপর একটি হাদিসে রুকু শেষে বিশেষ একটি দোয়া পড়ার কথাও এসেছে, যা পড়লে ফেরেশতারা বান্দার সওয়াব লেখার জন্য প্রতিযোগিতা করেন। রিফা’আ ইবনু রাফি যুরাকী (রা.) বলেন, একবার আমরা রাসুল (সা.) এর পেছনে নামাজ পড়ছিলাম। তিনি যখন রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদা’ বললেন, তখন এক সাহাবী ‘রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ্‌, হামদান কাছিরান তাইয়্যিবান মুবারাকান ফিহি’ বললেন।

পরবর্তীতে নামাজ শেষ করে রাসুল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, কে এমনটা বলেছিল। তখন ওই সাহাবী বললেন, আমি। জবাবে রাসুল (সা.) বললেন, আমি দেখলাম ৩০ জনের বেশি ফেরেশতা এর সাওয়াব কে আগে লিখবেন, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৭৭০; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৬৩)