মানব ইতিহাসে কিছু ঘটনা শুধু একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেনি, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার গতিপথকে নতুন করে নির্মাণ করেছে। ইসলামের ইতিহাসে হিজরত এমনই এক মহিমান্বিত ঘটনা। এটি কোনো সাধারণ স্থানান্তর ছিল না, ছিল না শুধু মক্কা থেকে মদিনায় যাওয়ার একটি ভ্রমণ। বরং এটি ছিল ঈমান রক্ষার জন্য সর্বস্ব ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য অবিচল সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অধ্যায় এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও নির্ভরতার এক জীবন্ত প্রমাণ। হিজরতের মাধ্যমেই ইসলামের ইতিহাসে সূচিত হয় নতুন যুগ, প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র এবং বিশ্বময় ইসলামের বিজয়যাত্রার ভিত্তি রচিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কার বুকে তাওহিদের আহ্বান নিয়ে দাঁড়ালেন, তখন সমাজের প্রচলিত শিরক, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর এই দাওয়াত কুরাইশ নেতাদের স্বার্থে আঘাত হানে। ফলে শুরু হয় নির্যাতনের এক দীর্ঘ অধ্যায়। মুসলমানদের ওপর নেমে আসে অকথ্য অত্যাচার। কেউ উত্তপ্ত মরুভূমির বালুর ওপর শুয়ে নির্যাতিত হচ্ছেন, কেউ শিকলে বন্দী, কেউ বা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার। তিন বছরব্যাপী শি'বে আবি তালিবের অবরোধ মুসলমানদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। একদিকে অত্যাচার, অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যা করার গভীর ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে মক্কার পরিবেশ মুসলমানদের জন্য ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে উঠতে থাকে।
এমন কঠিন সময়ে ইয়াসরিব (পরবর্তীতে মদিনা) থেকে আগত কিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি ইসলামের আলো গ্রহণ করেন এবং আকাবার ঐতিহাসিক বাইআতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিজেদের শহরে আমন্ত্রণ জানান। তারা প্রতিশ্রুতি দেন, নিজেদের জীবন ও সম্পদের মতো করেই তাঁকে রক্ষা করবেন। এরই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে মুসলমানরা ধীরে ধীরে মদিনায় হিজরত করতে শুরু করেন। অবশেষে যখন কুরাইশরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হত্যার জন্য বিভিন্ন গোত্রের যুবকদের নিয়ে চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে, তখন আল্লাহর নির্দেশে তিনি মক্কা ত্যাগ করেন।
সেই রাতটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় রাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের বিছানায় শয়ন করতে বললেন সাহাবি আলী (রা.)-কে। তারপর তিনি বেরিয়ে পড়েন তাঁর প্রিয় সঙ্গি আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে। তারা আশ্রয় নেন সাওর গুহায়। শত্রুরা যখন গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্তর ছিল আল্লাহর ওপর অটল ভরসায় পরিপূর্ণ। সেই সময়ের ঘটনাকে স্মরণ করে আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘তিনি তাঁর সঙ্গীকে বললেন, ‘দুঃখ কোরো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : তাওবা,আয়াত : ৪০)
এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে হিজরতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—যার সঙ্গে আল্লাহ আছেন, তার বিরুদ্ধে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি একত্রিত হলেও তাকে পরাজিত করতে পারে না।
মদিনায় পৌঁছার পর ইসলামের ইতিহাসে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমেই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলেন এবং এমন একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যার ভিত্তি ছিল ঈমান, ন্যায়বিচার, সাম্য ও মানবিকতা। যে মুসলমানরা মক্কায় নির্যাতিত ও অসহায় ছিলেন, তারাই অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও আদর্শ জাতিতে পরিণত হন। এভাবেই হিজরত ইসলামের বিজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
হিজরতের তাৎপর্য শুধু ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। হিজরত আমাদের শেখায়, ঈমানের জন্য ত্যাগ ছাড়া সফলতা আসে না। মুহাজির সাহাবিগণ নিজেদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন—সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করেছিলেন। তাদের এই ত্যাগ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা নির্যাতিত হওয়ার পর আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়ায় উত্তম আবাস দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪১)
হিজরত আমাদের আরও শেখায় যে, মুসলমানদের শক্তি তাদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের মধ্যে নিহিত। মদিনায় আনসাররা মুহাজিরদের যেভাবে বরণ করে নিয়েছিলেন, তা মানব ইতিহাসে ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। কুরআন ঘোষণা করে., ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
তবে হিজরতের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো আত্মিক হিজরত। আজ আমাদেরকে মক্কা থেকে মদিনায় যেতে হবে না, কিন্তু গুনাহ থেকে তওবার দিকে, অন্যায় থেকে ন্যায়ের দিকে, শিরক থেকে তাওহিদের দিকে, গাফেলতি থেকে আল্লাহর স্মরণের দিকে এবং হারাম থেকে হালালের দিকে অবশ্যই হিজরত করতে হবে। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুহাজির সে, যে আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন এমন সবকিছু পরিত্যাগ করে।’ (সহিহ বুখারি)
নতুন হিজরি বছর আমাদের সামনে উপস্থিত হলে হিজরতের সেই মহান স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর পথে করা কোনো ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না। মক্কার নিপীড়িত মুসলমানদের সেই কষ্টময় যাত্রাই শেষ পর্যন্ত বদর, মক্কা বিজয় এবং ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসারের পথ সুগম করেছিল। তাই হিজরতের শিক্ষা হলো—কঠিনতা সাময়িক, কিন্তু আল্লাহর প্রতিশ্রুতি চিরন্তন; ত্যাগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার প্রতিদান অনন্ত; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য সবকিছু ছেড়ে দিতে পারে, আল্লাহ তাকে এমন সম্মান দান করেন, যা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হিজরতের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করার, গুনাহ থেকে নেকির দিকে হিজরত করার এবং ঈমান, ত্যাগ ও তাকওয়ার আলোকে জীবন গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।




