• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ১৬ জুন ২০২৬

কাবা শরীফের গিলাফ নির্মাণের এক শতাব্দীর গৌরবময় যাত্রা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কাবা শরীফের গিলাফ নির্মাণের এক শতাব্দীর গৌরবময় যাত্রা
সংগৃহীত ছবি

মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু পবিত্র কাবা শরীফ। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের প্রতীক। তাই এই পবিত্র ঘরের গিলাফ বা আবরণ (কিসওয়া) শুধু একটি কাপড় নয়; বরং এটি ইসলামের ঐতিহ্য, শিল্পকলা ও পবিত্রতার এক অনন্য নিদর্শন। আর এই গিলাফ তৈরির ইতিহাসে সৌদি আরবের শাসকদের অবদান এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল রহমান আল সৌদ-এর হাত ধরেই আধুনিক যুগে কাবা শরীফের গিলাফ নির্মাণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৩৪৫ হিজরিতে (১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে) তিনি পবিত্র কাবার জন্য টেকসই ও উন্নতমানের নতুন গিলাফ তৈরির নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে কাবা শরীফের গিলাফ তৈরীর ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।

এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৩৪৬ হিজরিতে, তিনি মক্কার আজিয়াদ এলাকায় কাবা শরীফের গিলাফ তৈরির জন্য প্রথম সৌদি কর্মশালা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। ছোট্ট সেই কর্মশালাই পরবর্তীকালে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিশেষায়িত ইসলামী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

পরবর্তীকালে সৌদি শাসকদের ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতায় গিলাফ তৈরির এই ঐতিহ্য আরও সমৃদ্ধ হয়। বাদশাহ সাউদ বিন আব্দুল আজিজ-এর শাসনামলে গিলাফ উৎপাদন ও এর সংরক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। এরপর বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ-এর আমলে কারখানার সংস্কার এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়।

খালিদ বিন আব্দুল আজিজ-এর শাসনামলে গিলাফ শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানোন্নয়নের কাজ আরও গতিশীল হয়। পরে ফাহদ বিন আব্দুল আজিজ-এর সময়ে কারখানাটিকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা হয় এবং এর প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে উন্নত করা হয়।

এরপর আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ-এর শাসনামলে উম্মুল-জৌদ এলাকায় অবস্থিত ‘কিং আব্দুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর দ্য কাবা কভার’-এর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়। তিনি এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন, পৃষ্ঠপোষকতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বর্তমানে সৌদি যুবরাজ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ-এর নেতৃত্বে কাবা শরীফের গিলাফ তৈরির কাজে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তাঁর শাসনামলে ব্যবহৃত রেশমি কাপড়, স্বর্ণ ও রৌপ্য সুতা এবং সহায়ক প্রযুক্তির মান আরও উন্নত করা হয়েছে। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে গিলাফের সৌন্দর্য, স্থায়িত্ব ও শৈল্পিক মান নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

আজিয়াদের একটি সাধারণ কর্মশালা থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ উম্মুল-জৌদে অবস্থিত বিশ্বমানের এক বিশেষায়িত কমপ্লেক্সে রূপ নিয়েছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলমান এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা শুধু কাবা শরীফের গিলাফ নির্মাণের ইতিহাসই নয়, বরং পবিত্র দুই মসজিদের খেদমতে সৌদি আরবের অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধেরও উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে। পবিত্র এই ঘরের সেবা ও পরিচর্যা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা এক সম্মানিত আমানত, যা ভবিষ্যতেও একই নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে অব্যাহত থাকবে। ইনশাআল্লাহ। 

হাদিসের বাণী

মুমিন যেভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মুমিন যেভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে
সংগৃহীত ছবি

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার আগে যেকোনো নবিকে আল্লাহ তাআলা উম্মতের মধ্যে প্রেরণ করেছেন, তাদের কোনো-না-কোনো সাহায্যকারী ও সাথি-সঙ্গী ছিল, যারা তাঁর সুন্নতকে গ্রহণ করত এবং তাঁর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করত। এরপরে এমন এক জাতি তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো, যারা মানুষকে এমন বিষয়ের আদেশ করত, যা তারা নিজেরা করত না। আর তারা এমন জিনিস করত, যার ব্যাপারে তাদের আদেশ করা হয়নি। অতএব, তাদের বিরুদ্ধে যে হাতের মাধ্যমে প্রতিবাদ করবে, সে মুমিন। যে আন্তরিকভাবে প্রতিবাদ করবে, সেও মুমিন। যে মুখে প্রতিবাদ করবে, সেও মুমিন। আর এর পরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমানের স্তর নেই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৮০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১১১৫০)


শিক্ষা ও বিধান
১. প্রত্যেক নবিরই নিবেদিতপ্রাণ অনুসারী ছিল। তাই দ্বীনের প্রসার ও সংরক্ষণে সৎ অনুসারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. সুন্নতের অনুসরণ সফলতার মূল চাবিকাঠি। মুমিন নবির সুন্নতকে গ্রহণ করে এবং তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করে। তাই শুধু মুখে আনুগত্যের দাবি নয়, বরং আমলের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হয়।
৩. কথা ও কাজের মিল থাকা আবশ্যক। একজন দাঈ, আলেম, নেতা বা অভিভাবকের জন্য এটি বিশেষ সতর্কবার্তা।
৪. বিদআত ও মনগড়া কাজ থেকে সতর্ক থাকা উচিত। কেননা দ্বীনের ক্ষেত্রে মনগড়া সংযোজন বা পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়।
৫. অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ঈমানের দাবি। অন্যায়, জুলুম ও গুনাহ দেখে নীরব থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে হবে।
৬. অন্যায় প্রতিরোধের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যথা-
ক. হাতের মাধ্যমে (ক্ষমতা থাকলে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া)।
খ. জবানের মাধ্যমে (উপদেশ, নসিহত ও প্রতিবাদ করা)।
গ. অন্তরের মাধ্যমে (অন্যায়কে ঘৃণা করা ও মেনে না নেওয়া)।

এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যে নবির সুন্নত অনুসরণ করে, নিজের কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। অন্যায়ের প্রতি অন্তত অন্তরের ঘৃণাও ঈমানের অপরিহার্য দাবি; আর অন্যায়ের প্রতি উদাসীনতা ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ।

শরিয়তের বিধান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা নিষিদ্ধ

মুফতি আবদুল্লাহ নুর
শরিয়তের বিধান নিয়ে হাসি-ঠাট্টা নিষিদ্ধ
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ মানুষের কল্যাণে যুগে যুগে দ্বিন ও শরিয়তের বিধান দিয়েছেন। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো শরিয়তের বিধানগুলোকে মান্য করা এবং তাকে সম্মান করা। এটা তার ঈমানের দাবি ও নিদর্শন। পক্ষান্তরে ইসলামের কোনো বিধান, নিদর্শন বা শরিয়তের কোনো অংশ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ, যা মানুষের ঈমান পর্যন্ত বিনষ্ট করে দিতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তুমি তাদেরকে প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম। বোলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসুলকে বিদ্রুপ করছিলে? ঈমান আনার পর তোমরা দোষ ঢাকার চেষ্টা কোরো না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)

তাফসিরবিদরা বলেন, তাবুক অভিযানের সময় কিছু লোক সাহাবায়ে কেরাম ও দ্বিনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিল, তখন এই আয়াত নাজিল হয়। আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে দ্বিনকে নিয়ে উপহাস করা কুফরির নামান্তর।

কোরআনের অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘এটাই বিধান; আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনগুলোর সম্মান রক্ষা করে, তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩২)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধি-বিধান ও দ্বিনের প্রতীক বিষয়গুলোকে সম্মান করা আল্লাহভীতির লক্ষণ, বিপরীতে তা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও বাঁকা মন্তব্য করা তাকওয়া পরহেজগারির পরিপন্থী কাজ।

মহানবী (সা.)-ও এ বিষয়ে উম্মতকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বান্দা কখনো এমন একটি কথা বলে, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। কিন্তু সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না, অথচ এর কারণে সে জাহান্নামে পতিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৭৭)

বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, পারস্পরিক কথাবার্তা, আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কে অনেকেই ইসলামের বিধান, দাড়ি, হিজাব, নামাজ, কোরবানি কিংবা অন্য কোনো বিধান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে থাকে। অনেকের দৃষ্টিতে এটাকে বাকস্বাধীনতার অংশ বা তুচ্ছ বিষয় মনে হলেও শরিয়তে এটি অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কারণ এতে দ্বিনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এবং মানুষের অন্তরে দ্বিনের প্রতি অবজ্ঞা সৃষ্টি হয়।

ফিকহের কিতাবগুলোতে শরিয়তের বিধি-বিধান নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করাকে কুফরির কারণ বলা হয়েছে। ফাতাওয়ায়ে আলমগিরিতে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি শরিয়তের কোনো বিষয় নিয়ে বিদ্রুপ করে, সে কাফির হয়ে যায়।’ (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ২/২৫৯)

ইমাম ইবনু নুজাইম (রহ.) বলেছেন, ‘দ্বিন বা দ্বিনের কোনো বিধান নিয়ে উপহাস করা কুফরি।’ (আল বাহরুর রায়িক : ৫/১৩৪)

তবে মনে রাখতে হবে, শরিয়তের কোনো বিধানের দলিল, প্রয়োগ পদ্ধতি বা ফিকহি ব্যাখ্যা নিয়ে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা আর বিদ্রুপ করা এক বিষয় নয়। ইসলাম চিন্তা, গবেষণা ও প্রশ্নকে উৎসাহিত করে; কিন্তু উপহাস ও অবজ্ঞাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনার প্রতি বিনয় ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। কোনো বিধানের হিকমত বা প্রজ্ঞা তার বোধগম্য না হলেও এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করা যে আল্লাহর প্রতিটি বিধানই কল্যাণকর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে ফয়সালা করে দিলে কোনো মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীর সেই বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকে না।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৬)

পরিশেষে বলতে চাই, ইসলামের বিধি-বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা শুধু একটি নৈতিক অপরাধ নয়; বরং তা ঈমানের জন্যও মারাত্মক হুমকি। দেশের প্রচলিত আইনও তা অনুমোদন করে না। একজন মুসলমানের উচিত দ্বিনের প্রতিটি বিধানকে সম্মান করা, অন্যদেরও এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহিত করা এবং কথাবার্তা ও আচরণে এমন সব বিষয় থেকে দূরে থাকা, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন। আমিন।

ভেজাল খাদ্যে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় মানবসমাজ

মাওলানা আব্দুর রহমান
ভেজাল খাদ্যে যেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় মানবসমাজ
সংগৃহীত ছবি

খাদ্যে ভেজাল কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। শিশুখাদ্যে ভেজাল সর্বনাশ করে গোটা একটি প্রজন্মের শরীর, জীবনীশক্তি, মেধা ও আয়ুর। স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভেজাল এবং এক বা একাধিক রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো খাবার খেলে মানুষের বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি ও স্মরণশক্তি হ্রাস পায়। মানুষ মেধাহীন হয়ে পড়ে। শরীরের জিনজাত স্নায়ুকোষগুলোর আয়ুও এসব ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো খাবার খাওয়ার ফলে কমে যায়। দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, স্বাদ গ্রহণের শক্তি, ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

শরীরে বাসা বাঁধে মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা রোগ-ব্যাধি। ইসলামে পণ্যে ভেজাল প্রদান সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ মর্মে কোরআনের দলিল নিম্নে আলোচিত হলো—

১. মহান আল্লাহ বলেন, ‘শৃঙ্খলা স্থাপনের পর তোমরা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫৬)

উক্ত আয়াতে সাধারণভাবে সব ফ্যাসাদ থেকে নিষেধ করা হয়েছে।(তাফসিরে কুরতুবি : ৭/২২৬)
তন্মধ্যে খাদ্যদ্রব্য বা পণ্যে ভেজাল প্রদান অন্যতম।

২. আল্লাহ বলেন, ‘যখন সে ফিরে যায় (অথবা নেতৃত্বে আসীন হয়), তখন সে পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টির এবং শস্য ও প্রাণী বিনাশের চেষ্টা করে। অথচ আল্লাহ অশান্তি পছন্দ করেন না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২০৫)

উক্ত আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অন্যতম রূপ হলো, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করা। যার প্রভাব তাদের জীবন, সন্তান-সন্ততি, ফল-ফসল ও গবাদি পশুর ওপর গিয়ে পড়ে। এসব খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রদানের ফলে ঘটে থাকে।

৩. মহান আল্লাহ বলেন, ‘ন্যায্য কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করবে না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৫১)

এ আয়াতে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে, যেভাবেই তা হোক না কেন। আর খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রদান ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বিধায় তা হারাম।

৪. মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ ভক্ষণ কোরো না এবং অন্যের সম্পদ গর্হিত পন্থায় গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তোমরা জেনেশুনে তা বিচারকদের কাছে পেশ কোরো না।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)
আয়াতটি দুদিক থেকে খাদ্যে ভেজাল প্রদান হারাম হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে—

ক. অন্যায়ভাবে যেকোনো পন্থায় মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করতে আয়াতে নিষেধ করা হয়েছে। তন্মধ্যে খাদ্যে ভেজাল অন্যতম।

খ. ক্রেতা নির্ভেজাল ও নিরাপদ পণ্য ক্রয় এবং এর দ্বারা পরিপূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার জন্য বিক্রেতাকে সম্পূর্ণ মূল্য প্রদান করে। যদি পণ্যে ভেজাল থাকে তাহলে কখনো কখনো তা মূল্য কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। এভাবে ভেজাল প্রদানের ফলে পণ্যের মূল্য যতটুকু কম হবে ততটুকু বিক্রেতা ক্রেতার মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করেছে বলে গণ্য হবে।

৫. মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না, তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা ছাড়া।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

এ আয়াতও দুদিক থেকে উক্ত আয়াতটি ভেজাল হারাম হওয়ার দলিল বহন করে—

ক. যেকোনো পন্থায় অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ করা। পণ্যে ভেজাল প্রদান এর অন্যতম মাধ্যম।

খ. ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো সম্মতি। এমনকি কিছুসংখ্যক মালেকি বিদ্বান একে প্রথম রুকন হিসাবে গণ্য করেছেন। আর এটা স্বতঃসিদ্ধ যে পণ্য ক্রয়কারী ভেজাল ছাড়াই তা ক্রয় করতে সম্মত হয়। কেননা ভেজালে প্রতারণা ও ক্ষতি রয়েছে। তাই কোনো পণ্যে ভেজাল পরিদৃষ্ট হলে তা সম্মতিকে নষ্ট করে দেয়। অতএব প্রমাণিত হলো যে পণ্যে ভেজাল প্রদান হারাম।

৬. আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা (অবাধ্যতার মাধ্যমে) আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে খিয়ানত কোরো না এবং (এর অনিষ্টকারিতা) জেনেশুনে তোমাদের পরস্পরের আমানতসমূহে খিয়ানত কোরো না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৭)

যা কিছু মানুষ অন্যকে আদায় করে সে বিষয়ে আমানতের খিয়ানত হারাম হওয়ার ব্যাপারে আয়াতটি আম বা ব্যাপক। (তাফসিরে কুরতুবি)

তন্মধ্যে খাদ্যদ্রব্যও রয়েছে। আর মানুষ পণ্যের গুণাগুণ, কার্যকারিতা, মাপ ও ওজন প্রভৃতি বিষয়ে কাউকে বিশ্বস্ত মনে না করলে তার কাছ থেকে তা ক্রয় করে তার দ্বারা উপকৃত হতে চাইবে না। পণ্যে ভেজাল প্রদান এর বিপরীত। কাজেই প্রমাণিত হলো যে পণ্যে ভেজাল প্রদান হারাম।

৭. মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

আল্লাহ তাআলা সর্বাবস্থায় এবং সব কথা ও কাজে সত্যবাদিতা অবলম্বন করাকে আবশ্যক করেছেন। এটি এসব বিষয়ে মিথ্যা হারাম হওয়ার প্রমাণ বহন করে। পণ্যে ভেজাল প্রদানও এর অন্তর্ভুক্ত। কারণ মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে ভেজাল জিনিস বাজারজাত করা হয়। এতে ক্রেতাকে ধোঁকা দিয়ে চড়ামূল্য হাতিয়ে নেওয়া হয়।

৮. আল্লাহ বলেন, ‘দুর্ভোগ মাপে কম দানকারীদের জন্য। যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদের মেপে দেয় বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১-৩)

উক্ত আয়াতগুলো পণ্য আদান-প্রদানের সময় সঠিকভাবে তা মাপা ও ওজন করা আবশ্যক হওয়া এবং মাপে ও ওজনে কম দেওয়া হারাম হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে। কারণ তা প্রতারণা।