নিঃসন্দেহে হজ পরম সৌভাগ্যের বিষয়। প্রতিটি মুসলমান এই সৌভাগ্য অর্জন করতে চায়। মুসলিম সমাজের একটি ঐতিহ্য হলো হাজিরা যখন হজের সৌভাগ্য অর্জন করে মাতৃভূমিতে ফেরে তখন তাঁদেরকে অভ্যর্থনা জানান। এর মাধ্যমে তাঁর অর্জন ও ফিরে আসার আনন্দ প্রকাশ করা হয়।
হাজিদের অভ্যর্থনা জানানোর বিধান
ফকিহরা বলেন, হাজিদের অভ্যর্থনা জানানো মুসলিম রীতির অন্তর্ভুক্ত, এটা ইবাদতের অংশ নয়। এটা এমন একটি রীতি, যা সরাসরি কোরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তবে একাধিক হাদিস থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) এই বিষয়ে নিষেধ করেননি, যা বৈধতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
আল্লামা ইবনুল মুনির (রহ.) বলেন, ফিকহের দৃষ্টিতের হজ থেকে আগত মানুষকে অভ্যর্থনা জানানো বৈধ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি অস্বীকার করেননি, বরং দুজন শিশুকে তাঁর অভ্যর্থনায় উপস্থিত করায় তিনি খুশি হয়েছেন এবং তাদের সামনে ও পেছনে বসিয়েছেন। (ইরশাদুস সারি : ৩/২৭৮)
ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে একটি পরিচ্ছেদের শিরোনাম দিয়েছেন ‘হজ থেকে প্রত্যাবর্তনকারীদের স্বাগত জানান’, যা ইমাম বুখারি (রহ.)-এর কাছে বিষয়টি বৈধ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। (সহিহ বুখারি, হজ অধ্যায়)
নবীযুগে হাজিদের অভ্যর্থনা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে হজ, ওমরাহ, যুদ্ধ বা অন্য কোনো সফর থেকে কোনো কাফেলা ফিরলে তাদের অভ্যর্থনা বা স্বাগত জানানো হতো। আয়েশা (রা.) বলেন, আমরা মক্কা থেকে হজ বা ওমরাহ করে ফিরলাম। আমাদেরকে দুজন আনসার বালক স্বাগত জানাল, তারা নিজ পরিবারের সদস্যরা সফর থেকে ফিরলে তাদের স্বাগত জানাত। (মুস্তাদরিকে হাকিম, হাদিস : ১৭৯৬)
আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা.) বলেন, নবী (সা.) যখন সফর থেকে ফিরতেন, তখন তাঁর পরিবারের শিশুদের মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানানো হতো। তিনি এক সফর থেকে ফিরলে আমাকে সামনে এগিয়ে দেওয়া হলো। তিনি আমাকে (বাহনে) তাঁর সামনে বসিয়ে নিলেন। অতঃপর ফাতেমা (রা.)-এর দুই ছেলের কোনো এক ছেলেকে নিয়ে আসা হলো। নবী (সা.) তাঁকে নিজের পেছনে বসিয়ে দিলেন। অতঃপর আমরা তিনজন একটি বাহনে আরোহণ করে মদিনায় প্রবেশ করলাম। (মুসলিম, হাদিস : ২৪২৮)
কেন স্বাগত জানাব
হাজিরা আল্লাহর ঘর ও নিদর্শনগুলো প্রত্যক্ষকারী এবং পবিত্র রওজা জিয়ারতকারী, তাই তারা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার দাবিদার। অভ্যর্থনা এই সম্মান প্রকাশের একটি মাধ্যম। এ ছাড়া হাজিরা দীর্ঘদিন পরিবার, কর্মস্থল ও মাতৃভূমি থেকে দূরে ছিল, তারা ফিরে আসায় আপনজনরা স্বভাবতই আনন্দিত হয়, তাদের অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নের মাধ্যমে এই আনন্দ প্রকাশ পায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ঘরে অবস্থানকারীরা যদি জানত তাদের ওপর হাজিদের কী অধিকার আছে, তবে হাজিরা আগমন করলে তারা তাদের বাহনগুলোকে চুম্বন করত। কেননা হাজিরা সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর প্রতিনিধিদল। (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ১৮১৫)
যেভাবে অভ্যর্থনা জানানো উচিত
হজ থেকে আসা হাজিদের অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানাতে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা উচিত।
১. এগিয়ে যাওয়া : হাজিদের অভ্যর্থনা জানাতে নিজ বাড়ি ও মহল্লা থেকে এগিয়ে যাওয়া বা জনপদের প্রবেশপথে অবস্থান করা উত্তম। কেননা নবীজি (সা.) জায়েদ বিন হারিসা (রা.)-কে স্বাগত জানাতে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন।
২. সালাম দেওয়া : ইমাম শাবি (রহ.) বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি সফর থেকে ফেরে তখন সুন্নত হলো তাঁর আপনজনরা তাঁর দিকে এগিয়ে যাবে এবং তাকে সালাম জানাবে। আর যখন কেউ সফরে বের হবে, তখন ব্যক্তি তাঁর আত্মীয়দের কাছে যাবে. তাদের কাছে দোয়া চাইবে। (বাহজাতুন নাজরি ফি আদাবিস সাফরি, পৃষ্ঠা-১০)
৩. মুসাফা ও মুআনাকা করা : যারা হাজিদের অভ্যর্থনা জানাবে, তারা হাজিদের সঙ্গে মুসাফা ও মুআনাকা করবে। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, নবীজি (সা.)-এর সাহাবিরা যখন পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন তাঁরা মুসাফা করতেন আর যখন সফর থেকে ফিরতেন তখন মুআনাকা করতেন। (আল আউসাত লিত-তাবরানি, হাদিস : ৯৭)
৪. দোয়া করা : যখন কোনো ব্যক্তি হজ থেকে ফেরেন তার জন্য দোয়া করা উচিত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রহ.) হজ থেকে ফেরা হাজিদের জন্য দোয়া করতেন, ‘আল্লাহ তোমার ইবাদত কবুল করুন, তোমার প্রতিদান বাড়িয়ে দিন এবং তোমার ব্যয়ের প্রতিবিধান দিন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ১৫৮১৪)
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) একজন হাজির জন্য এভাবে দোয়া করেছিলেন, ‘আল্লাহ তোমার হজ কবুল করুন, তোমার আমলগুলো পবিত্র করুন এবং আমাদেরকে ও তোমাকে পুনরায় তার পবিত্র ঘরে যাওয়ার তাওফিক দিন।’ (শরহু গায়াতিল মুনতাহা : ২/৪৪৪)
৫. দোয়া চাওয়া : পূর্বসূরি আলেমরা হাজিদের কাছে দোয়া চাওয়ার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ দিতেন। বিশেষ করে তারা পার্থিব কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তুমি কোনো হাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তাঁকে সালাম দেবে, তাঁর সঙ্গে মুসাফা করবে এবং সে ঘরে প্রবেশের আগে তোমার পাপমুক্তির জন্য দোয়া চাইবে। কেননা তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬১১২)
হাজিদের করণীয়
হজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর হাজিদের কয়েকটি করণীয় হলো—
১. আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় : হজ থেকে ফেরার পর হাজিদের করণীয় হলো আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা। কেননা আল্লাহ তাকে হজ করার এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার তাওফিক দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো যুদ্ধ, হজ অথবা ওমরাহ থেকে প্রত্যাবর্তন করতেন তখন তিনি প্রত্যেক উঁচু ভূমিতে তিনবার আল্লাহু আকবার বলতেন এবং পরে বলতেন, ‘আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। সর্বময় ক্ষমতা এবং সব প্রশংসা কেবল তাঁরই। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। আমরা প্রত্যাবর্তনকারী ও তাওবাকারী, ইবাদতকারী, আমাদের প্রভুর উদ্দেশে সিজদাকারী ও প্রশংসাকারী। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, স্বীয় বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তিনি একাই সব শত্রুদলকে পরাজিত করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৭৯৭)
২. মসজিদে নামাজ আদায় : মহানবী (সা.)-এর অভ্যাস ছিল তিনি কোনো সফর থেকে ফিরলে প্রথমে মসজিদে যেতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। অতঃপর সমবেত মানুষকে নিয়ে বসতেন। সুতরাং হজ থেকে আগত ব্যক্তির বাড়ির কাছে মসজিদ থাকলে তারও উচিত প্রথমে মসজিদে যাওয়া এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করে ঘরে ফেরা।
৩. আপ্যায়ন করা : আরব ও মুসলিম সমাজের একটি পুরনো রীতি হলো হাজিদের বাড়িতে সমবেত মানুষের জন্য সাধ্যানুযায়ী আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা। আরবি ভাষায় এই খাবারকে নাকিআ বলা হয়। নাকিআ শব্দ নাকউন থেকে এসেছে, তার অর্থ ধুলাবালি। কেননা মুসাফিরের শরীরে ধুলাবালি লেগে থাকে। বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় ফিরতেন একটি উট বা গরু জবাই করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৩০৮৯)
সুতরাং হাজিরাও সাক্ষাৎ করতে আসা মানুষের জন্য আপ্যায়ন করতে পারে। বিশেষত হজ থেকে আনা খেজুর ও জমজমের পানি দ্বারা।
আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।




