• ই-পেপার

চীনের আস্থার ধারাবাহিকতায় বিএনপির বড় অর্জন

  • সাইমন মোহসিন

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে

এ কে এম আতিকুর রহমান

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর শুরু হয় ২১ জুন, যেদিন তিনি একই সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন সফরের দ্বিতীয় ধাপে তিনি চীনের দালিয়ানে পৌঁছেন এবং সেখানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নিউ চ্যাম্পিয়নসের ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী দালিয়ান ফোরামে অংশগ্রহণ শেষে ২৪ জুন বিকেলে রেলযোগে বেইজিংয়ে পৌঁছেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এ ছাড়া তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেন। ২৬ জুন বিকেলে তিনি ঢাকার উদ্দেশে বেইজিং ত্যাগ করেন।

দুই.

২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে দুই প্রধানমন্ত্রী একান্ত বৈঠকে বসেন। আনুষ্ঠানিক বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়; যেমনঅর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এবং খোলা মনে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো জোরদার করার লক্ষ্যে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও কথা হয়েছে এবং এ বিষয়ে চীন বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছে।

বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বিষয়ক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ সহায়তা, জিডিআই, মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তা, চীনের ভাষাশিক্ষা এবং গণমাধ্যমের নানা পরিসরে সহায়তা। বিনিয়োগ সহযোগিতায় চারটি চুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি, গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এ ছাড়া গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্টের ডিফারেন্ট কো-অপারেশন প্ল্যান, বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানি, চীনের ভাষা ম্যান্ডারিন স্কুল কারিকুলামে যুক্ত করা এবং টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশন কো-অপারেশনে পৃথক দুটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যেও একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

তিন.

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেপ্রধানমন্ত্রী ২৬ জুন সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারি ইত্যাদি গুরুত্ব পায়। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে এবং উভয় দেশের মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে পরস্পরকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীনের সহযোগিতার কথা জানান। তিনি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করার ব্যাপারে চীনের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন। ওই দিন তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি। তাঁদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি ছাড়াও রাজনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে কথাবার্তা হয়।

২৫ জুন চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী এসব বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সেদিন প্রধানমন্ত্রী চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গেও দলীয় পর্যায়ে বৈঠক করেন। লিউ হাইশিং বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরো জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারেক রহমান বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণে চীনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন এবং দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চীনে অবস্থানকালে বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ নির্বাহী, চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দেশের উন্নয়নযাত্রায় আরো কার্যকর অবদান রাখার আগ্রহ দেখান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে আরো দেখা করেন চীনভিত্তিক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান মেগা রিচ ইন্ডাস্ট্রিয়াল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা অংশীদার কেভিন উ, দেশটির শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল ও পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হান্ডা গ্রুপের চেয়ারম্যান হান চুন এবং শীর্ষস্থানীয় অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান চেরি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইন টংইউয়ে।

চার.

সফরকালে তারেক রহমান ২৫ জুন বেইজিংয়ের একটি হোটেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড আয়োজিত বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি চীনা কম্পানিগুলোকে এশিয়ার পরবর্তী বৃহৎ অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনায় যৌথ রূপকার হতে বাংলাদেশে তাদের মূল্যশৃঙ্খল সম্প্রসারণের আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাবে এবং এ অঞ্চলের সম্ভাবনাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ ও চীনের পারস্পরিক সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। তিনি আরো বেশি চীনা কম্পানিকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, আসুন, সমমর্যাদার অংশীদারির ভিত্তিতে আমরা একসঙ্গে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করি।

পাঁচ.

প্রধানমন্ত্রী ২৩ জুন সকাল ১০টায় চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) নিউ চ্যাম্পিয়নসের ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সম্পর্কিত ঝুঁকির মুখে থাকা বাংলাদেশসহ বদ্বীপ অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে সহায়তা করার জন্য ফোরামকে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানান। ওই সম্মেলনের ফাঁকে তিনি ডব্লিউইএফের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আলোইস জুইংগির সঙ্গেও বৈঠক করেন। তিনি বাংলাদেশের নদ-নদীতে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষায় তাঁর পরিকল্পনার কথা অবহিত করে বলেন, বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহ দিতে কর প্রণোদনা চালু করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আলোইস জুইংগি জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার আশাবাদ ব্যক্ত করে আশ্বাস দেন যে বাংলাদেশের উত্থাপিত বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে। এ ছাড়া তিনি ফোরামের পক্ষ থেকে সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপন এবং রাজনৈতিক, ব্যাবসায়িক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করাসহ উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনার উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী ওলজাস পানি কূটনীতি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠার কাজাখস্তানের প্রস্তাবে বাংলাদেশের সমর্থন চান।

ছয়.

সব বৈঠকেই উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। চীন ও বাংলাদেশ এবং তাদের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরো সম্প্রসারিত, জোরদার ও বহুমুখী করার অঙ্গীকার করা হয়। এই সফরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো যেমন বাংলাদেশ ও তার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে বেগবান করার সুযোগ সৃষ্টি করবে, তেমনি বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে আরো গভীর ও বহুমাত্রিক করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত আলো দেখাবে। উভয় দেশ বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে লাভবান হওয়ার পথগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে তা উভয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে। দুই দেশের নেতাদের আলোচনাকে বাস্তবতায় রূপ দিতে পারলে গ্লোবাল সাউথ ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়বে, যা এশীয় শিল্প চেইন ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে সহজতর করবে।  

এই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উভয় দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও চীনের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চীন তার অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হবে না বলেও জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। এই সফরের ফলে কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান এবং উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, তেমনটিই প্রত্যাশা করা যায়। 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

ওবিই মহাযজ্ঞ : মানবিক জ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

ড. আলা উদ্দিন

ওবিই মহাযজ্ঞ : মানবিক জ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

পণ্য মাপার দাঁড়িপাল্লায় মানুষের মগজ মেপে দেখার এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। নাম তার আউটকাম-বেসড এডুকেশন (ওবিই)। যেকোনো নতুন দাওয়াইয়ের মতোই একে ঘিরেও স্তুতি আর প্রচারের কোনো কমতি নেই। বলা হচ্ছে, এই পদ্ধতি আমাদের শিক্ষাকে এক ধাক্কায় বৈশ্বিক মানে উন্নীত করবে এবং পাস করার পরপরই শিক্ষার্থীরা করপোরেট দুনিয়ায় নিজেদের স্থান করে নেবে। আপাতদৃষ্টিতে বাজারমুখী দক্ষতার এই চমৎকার মোড়কটি বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু বিজ্ঞান বা কারিগরি শিক্ষার বাইরে, বিশেষ করে কলা ও সমাজবিজ্ঞানের মতো মানবিক অনুষদগুলোর জন্য এই মহাযজ্ঞ আসলে কেমন এক গভীর সংকট আর চ্যালেঞ্জ বয়ে আনছে, তা তলিয়ে দেখার সময় এসেছে।

এখানেই আধুনিক শিক্ষার এক অদ্ভুত বাণিজ্যিক বাস্তবতার কথা বলতে হয়। আমরা যখন উত্তর-আধুনিক সমাজতত্ত্বের চোখ দিয়ে এই পরিবর্তনকে দেখি, তখন ফরাসি দার্শনিক জঁ-ফ্রাঁসোয়া লিয়োতার্দের সেই ল্যাঙ্গুয়েজ গেম বা ভাষার খেলার তত্ত্বটি মনে পড়ে। লিয়োতার্দ সতর্ক করেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বে জ্ঞানের বৈধতা নির্ধারিত হয় তার সত্যতা বা নৈতিকতা দিয়ে নয়, বরং তার কার্যকারিতা বা পারফরমেটিভিটি দিয়ে। অর্থাৎ আপনার অর্জিত জ্ঞান বাজারে ঠিক কতটা বিক্রি করা যাবে, সেটিই হবে তার একমাত্র পরিচয়। ওবিই পদ্ধতি মূলত এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। এটি শিক্ষাকে স্রেফ কতগুলো পরিমাপযোগ্য আউটকাম বা দক্ষতার ছাঁচে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সমাজবিজ্ঞান বা দর্শনের মতো বিষয়গুলো কি শুধু জিপিএ বা নির্দিষ্ট কোনো চাকরির দক্ষতার ছকে বেঁধে ফেলা সম্ভব?

সমাজবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাসরুমে কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল পড়ে কিংবা কোনো নৃবিজ্ঞানী মাঠ পর্যায়ে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের গল্প শোনে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের বিমূর্ত চিন্তার জন্ম হয়। সে সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখে, কাঠামোগত বৈষম্যগুলো ধরতে পারে এবং একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। ওবিইর নতুন নিয়মে এই গভীর মানবিক রূপান্তরকে মাপা হবে কতগুলো কাঠখোট্টা পয়েন্ট বা অবজেক্টিভের মাধ্যমে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছেশিক্ষার্থীরা নতুন কিছু ভাবার বা পড়ার চেয়ে শুধু অ্যাসাইনমেন্টের ছক পূরণ করে দ্রুত গ্রেড পাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে। সৃজনশীলতার এই অমানবিক অবদমন মানবিক অনুষদগুলোর মৌলিক চরিত্রকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

এখানেই কার্ল মার্ক্সের সেই পণ্যপূজা বা কমোডিটি ফেটিশিজমের তত্ত্বটি এক নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়। মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদ মানুষের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ককে পণ্যের সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে। ওবিইর এই জামানায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও যেন এক নতুন পণ্যপূজার শিকার। এখানে ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যকার সেই চিরাচরিত গভীর আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মিথস্ক্রিয়া আড়ালে চলে যাচ্ছে, আর বড় হয়ে উঠছে স্রেফ একটি ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট নামের চূড়ান্ত পণ্য। শিক্ষক এখানে আর মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী বা পথপ্রদর্শক নন, তিনি হয়ে উঠছেন একজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর বা করপোরেট ম্যানেজার, যাঁর দিন কাটবে ওবিইর জটিল ফরম পূরণ আর রিপোর্টিংয়ের পেছনে। আর শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে সেই কারখানার কাঁচামাল, যাদের ঘষেমেজে করপোরেট দুনিয়ার জন্য সস্তা শ্রমিক হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।

হয়তো না বুঝেই এক ধরনের পদ্ধতিগত উপনিবেশায়নের ফাঁদে পা দিচ্ছি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধে যেভাবে গবেষণার আড়ালে পশ্চিমা নব্য উপনিবেশবাদী শোষণের

রূপটি দেখিয়েছিলেন, এই ওবিই পদ্ধতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ওবিই মডেলটি মূলত পশ্চিমা করপোরেট এবং টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলোর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং গ্রামীণ বাস্তবতা পশ্চিমা দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণায় যেমন বিউপনিবেশায়ন দরকার, তেমনি ওবিইর ব্যবচ্ছেদ বা স্থানীয়করণ দরকার ছিল। আমাদের সমাজবিজ্ঞানের কাজ ছিল এ দেশের মাটির মানুষের ভাষা ও অধিকারের কথা বলা, কিন্তু ওবিই যখন শুধু গ্লোবাল মার্কেট ডিমান্ডের কথা বলে, তখন আমাদের নিজস্ব লৌকিক জ্ঞান বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের লড়াইয়ের মতো বিষয়গুলো কারিকুলাম থেকে চিরতরে ব্রাত্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আরো মারাত্মক। বাংলাদেশের চাকরির বাজার এখনো এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য আর অঘোষিত গ্লাস সিলিং বা কাচের ছাদ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এখানে শুধু দক্ষতা থাকলেই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয় না; অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, লিঙ্গীয় পক্ষপাত এবং সামাজিক পরিচয় বড় ভূমিকা পালন করে। ওবিই পদ্ধতি দাবি করে যে এটি শিক্ষার্থীদের শতভাগ কর্মমুখী করবে, কিন্তু এটি আসলে আমাদের করপোরেট বাজারের গভীর বৈষম্যগুলোকে আড়াল করে এক ধরনের মেকি মেরিটক্রেসির (মেধাতন্ত্র) ধারণা তৈরি করছে। শিক্ষার্থীরা যখন ওবিইর সব ছক পূরণ করেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাবে না, তখন তাদের মধ্যে তীব্র একাকিত্ব এবং হতাশার জন্ম নেবে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখাইমের ভাষায়, এ ধরনের হঠাৎ পরিবর্তন ও সামাজিক নিয়মহীনতা সমাজে অ্যানোমিক বা অরাজকতাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার লক্ষণ আমরা এরই মধ্যে এ দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।

এখানেই শেষ নয়, ওবিই পদ্ধতির এই অতি যান্ত্রিকতা আমাদের পরিবেশগত ও মানবিক সংকটের সংবেদনশীলতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি খাতে বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ উপকূল ছেড়ে শহরে এসে উদ্বাস্তুজীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন এক গভীর রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বোঝাপড়া। কিন্তু ওবিইর সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট দক্ষতার সিলেবাস মানুষকে শুধু তার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শেখায়, চারপাশের বড় বড় সামাজিক সংকটের প্রতি তাকে উদাসীন করে তোলে। মানবিক অনুষদের শিক্ষার্থীরা যদি শুধু করপোরেট রিপোর্টিং শেখে আর সামাজিকভাবে অন্ধ হয়ে যায়, তবে এই বিশাল মানবিক দুর্যোগগুলো মোকাবেলা করবে কে?

কেন এটি নিয়ে এখন গভীরভাবে ভাবা দরকার? কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক কারখানা নয় যে দিনশেষে সেখানে শুধু কতগুলো দক্ষ রোবট তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের এই আধুনিক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তি আর বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সেই চেষ্টার মূল্য যদি হয় মানুষের মুক্তচিন্তা ও মানবিক বোধের বলিদান, তবে সেই উন্নয়ন হবে অন্তঃসারশূন্য। কলা ও সমাজবিজ্ঞানের কাজই হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখানো, বাজারের দাস বানানো নয়।

ওবিইর এই মহাযজ্ঞকে যদি আমরা কলা ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে প্রয়োগ করতে থাকি, তবে আমরা হয়তো ভালো কেরানি বা ম্যানেজার পাব, কিন্তু কোনো সংবেদনশীল দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী বা চিন্তাশীল লেখক কিংবা ক্রিটিক্যাল বুদ্ধিজীবী না পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই সময় এসেছে এই যান্ত্রিক ছকগুলোকে ভেঙে সামাজিক-মানবিক অনুষদগুলোর জন্য একটি নিজস্ব, নমনীয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতিবান্ধব মূল্যায়নের মডেল তৈরি করার। জ্ঞানের জগৎ যেন শুধু বাজারের পণ্য না হয়ে ওঠে, বরং তা যেন মানুষের মনের জানালা খুলে দেওয়ার অবারিত আকাশ হিসেবেই টিকে থাকে। কাচের ছাদ ভাঙার লড়াইটা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার ওপর চেপে বসা এই যান্ত্রিকতার শিকল ভাঙাটাও আজ আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।

লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শিশুর বিকাশে ঘরোয়া বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

শিশুর বিকাশে ঘরোয়া বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

শিশুদের বিকাশে আমাদের সনাতন বিনোদন ব্যবস্থার জায়গায় প্রধানত শহুরে সমাজে ঘরোয়া বিনোদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের বিনোদনের প্রতি শিশুদের অভ্যস্ত হওয়া তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা হয়তো বিবিধ কারণে এ ধরনের বিনোদনের প্রতি সন্তানদের অভ্যস্ত করছি। সময়ের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত মাঠের অভাব, শিশুদের নিরাপত্তাঝুঁকি কিংবা অন্য কোনো কারণে আমরা ঘরোয়া বিনোদনে সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছি। এই বিনোদনে শিশুদের মধ্যে কোনো শিক্ষণীয় বিষয় লক্ষ করা যায় না, বরং এক ধরনের প্রতিযোগিতা এবং আসক্তি তাদের মধ্যে তৈরি করে।

আমরা হয়তো এ ধরনের বিনোদনকে বিকল্প ভাবছি। কিন্তু এই বিকল্পের পরিণতি নিয়ে ভাবছি না। এখনো আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ছোট-বড় মাঠ আছে। এ ছাড়া বাইরে কোনো না কোনো মাঠ পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ করলে দেখবেন, ছুটির দিন কিংবা বিকেলবেলা এই মাঠ ব্যবহারের কোনো সুযোগ অনেক প্রতিষ্ঠান দেয় না। দ্বিতীয়ত, এখানে নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় যদি মাঠগুলো বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে খুলে দেওয়া হয়, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী এর সুযোগ নিতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া এবং টিউশনে এতটাই ব্যস্ত রাখি যে ছুটির দিন ছাড়া তাদের কোনো অবসরই নেই। অনেক ক্ষেত্রে শুক্রবারও তাদের টিউশন থাকে। শিশুদের সারাক্ষণ লেখাপড়ায় ব্যস্ত না রেখে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদনের সঙ্গে পরিচিত করে না তুলতে পারলে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। অধুনা বিনোদন বলতে বাইরের কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়া এবং এক কোণে সেই ঘরোয়া বিনোদন। যেভাবেই বলি না কেন, ঘরোয়া বিনোদন শিশুদের বিকাশের পরিবর্তে গেমসের প্রতি এক ধরনের আসক্তি এবং আবার প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করছে।

আমরা বই পড়ে যতটা না শিখি, তার চেয়ে বেশি জানা ও শেখা যায় আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে। অবশ্যই শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে এবং গঠনমূলক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই শিশুরা বেশি শিখবে। ঘরোয়া বিনোদনে আটকে থাকা শিশুর সঙ্গে অন্যদের তেমন কোনো আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয় না। শিশুদের পছন্দ, বিকল্পের অভাব এবং ঝামেলামুক্ত হওয়ায় আজ এমন বিনোদনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।

অন্যদিকে আমরা যদি বাইরের বিনোদনের দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখব, এখানে শেখার সুযোগ অনেক বেশি। ফুটবল, ক্রিকেট এবং অন্যান্য খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক বিকাশ ও গড়ন তৈরি হয়, মানসিক শক্তি ও সাহস বেড়ে যায়, যা তাদের অনেক দূর নিয়ে যায়। অন্যের সঙ্গে তারা দ্রুত মিশতে পারে। আরো বড় সুবিধা আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে তাদের ধ্যান-ধারণা, মনের বিকাশ, আচার-আচরণের পরিবর্তন মোটাদাগে তাদের সামাজিকীকরণে এক বড় ভূমিকা পালন করে। পরিবারের বাইরে যে প্রতিনিধিকে আমরা সামাজিকীকরণের বড় মাধ্যম বলি, তা হলো পিয়ার গ্রুপ। তাদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা যা শেখে, তা অন্য কোনো মাধ্যমে কোনোভাবেই শিখতে পারে না। মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাবের বিনিময় না হলে প্রকৃত শিক্ষা কখনো সম্পূর্ণ হয় না। প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের শিশুদের নিজেদের অজান্তে কিংবা বাস্তবতার নিরিখে এক অর্থে বঞ্চিত করছি; যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ এবং পরবর্তী জীবনে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কের ওপর। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু বড় হয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে একদম মেলামেশা করে না। বাসায় মেহমান এলে তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলাপ-আলোচনা এবং কথাবার্তা পর্যন্ত হয় না। আমরা এমনও লক্ষ করি, শিশুরা একসঙ্গে থেকেও কারো সঙ্গে কারো ভাব বিনিময় করতে দেখা যায় না। মোবাইল আসক্তি তাদের পেয়ে বসে।

আমাদের সনাতন বিনোদন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যালয়ের মাঠকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে, যেখানে বিকেলবেলা শিশুরা খেলতে পারে। মাঠের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। যে বিনোদন আমরা ঘরের মধ্যে ব্যবস্থা করছি, তাকে বাইরে নিয়ে আসতে হবে, যেখানে সবাই একসঙ্গে কিংবা কয়েকজন শিশু বিনোদন পেতে পারে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের মাঠে দোলনা ও শারীরিক গড়ন তৈরি হয় এমন সব খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুদের বিরতি শুধু টিফিন নয়, নাম হবে টিফিন এবং খেলাধুলা। এ কাজে তাদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্যালয়ে শিশুরা শুধু একাডেমিক লেখাপড়া করতে যায় না। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার ভিত তৈরিও বড় বিষয়। সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ এবং বিকাশ মুখ্য বিষয়। মানুষের সঙ্গে মেশার এবং ভাব বিনিময়ের এক চারণভূমি হবে প্রতিটি বিদ্যালয়। আমরা যদি বিদ্যালয়গুলোকে এভাবে তৈরি করতে পারি, তাহলে ঘরোয়া বিনোদনের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ থাকবে না। শিশুরা ঘরোয়া বিনোদনকে না বলবে। এ কাজে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক, দায়িত্বশীল ও সচেতন ব্যক্তিবর্গ এ কাজে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পারবে আমাদের শিশুদের সনাতন বিনোদনকে পুনরায় ব্যাপকভাবে ফিরিয়ে আনতে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

সব হিসাব বিশ্বকাপে মিলবে না

ইকরামউজ্জমান

সব হিসাব বিশ্বকাপে মিলবে না

ফুটবল দুনিয়ার বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ এখন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। খেলাটির সৌন্দর্য আর উত্তেজনা উপভোগের পাশাপাশি আবার অস্বস্তি, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা লেগেই আছে। মাঠের ফুটবল তো এক নিয়মে গড়ায় না। একটি বিশ্বকাপের সঙ্গে আরেকটি বিশ্বকাপের কোনো মিল নেই। রোমাঞ্চ ছড়ানো, সফলতা ও ব্যর্থতার রূপ একদম ভিন্ন। অপ্রত্যাশিত ফলাফল, অঘটন আর চমক বিশ্ব ফুটবলের নিত্যসঙ্গী। হিসাব মিলে গেলে তো বিশ্বকাপের মজা আর থাকবে না, যা ভাবা হয়নি, সেটি বাস্তবে ঘটতে সময় লাগছে না। আবার নিশ্চিত বিষয়গুলো জটিল হয়ে উঠছে। সত্যি, ফুটবলের গল্প একেক সময় একেক রকম। আমরা সাধারণরা শুধু মত পাল্টাই না, ফুটবল পণ্ডিতরাও মত পাল্টান। আগে বলা হয়েছিল, কাপ আবার ইউরোপে ফিরে যাবে; এখন বলা হচ্ছে, মেসির আর্জেন্টিনার কাপ ধরে রাখার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অনেক আগেই বলা হয়েছে, যে কয়টি দেশ বিগত ৯৬ বছরে ট্রফি জিতেছে, ২০২৬-এর ফিফা ট্রফি সেই দেশগুলোর বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই বিষয়ে ফুটবল পণ্ডিতরা তাঁদের মত এখনো পাল্টাননি। অর্থাৎ ২০১০ সালে স্পেনের পর আর নতুন দেশের দেখা মিলবে না। বিশ্বকাপে এবার সবচেয়ে দামি দল ফ্রান্স। চলমান বিশ্বকাপে শিরোপা অধিকার করার সম্ভাব্য তালিকায় ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ধরনের যুক্তি উত্থাপন করে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সকে সবার ওপরে রেখেছেন। তবে এই তালিকায় আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি এবং ইংল্যান্ডকেও রাখা আছে। ব্রাজিলের বিষয়ে অনেক কথাবার্তা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও যুক্তিতর্ক আছে। শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে, তা দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে। মাঠের লড়াই তো সব নয়, ওপরের নির্দেশকদের সহায়তা ছাড়া কিছুই তো হবে না। হায়রে ভাগ্য! ভারসাম্যপূর্ণ দল নিয়েও শেষ পর্যন্ত ফিফা ট্রফি ছোঁয়ার সুযোগ হয়নিএমন ইতিহাস বিশ্বকাপে অনেক।

সব হিসাব বিশ্বকাপে মিলবে নাবিশ্বকাপ ফুটবল তো শুধু একটি বৃহৎ প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি আবেগ। একটি স্বপ্ন। মানবতার সপক্ষে ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বড় সামাজিক আন্দোলন। এই ফুটবলের মধ্যে মানবজাতির কল্যাণ ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য লুকিয়ে আছে শক্তিশালী অস্ত্র। কথা হলো  কূট আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিপক্ষে লড়ার শক্তি ফিফার খুব কম। এই অবস্থায় মানবতার অপমানকে ফিফা রুখতে পারবে না। এটিই বাস্তবতা। ইরানের প্রতি স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দনীয় আচরণের পরও ইরান ফুটবলে অংশ নিয়েছে। ইরানের অংশগ্রহণ পুরো দুনিয়াকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ইরান যেভাবে বিশ্বের সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়েছে, এটি খেলায় জেতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু! এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

গোটা বিশ্ব এখন রোমাঞ্চকর ফুটবল মাঠে ভাসছে। ফুটবলের সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা বিশ্বজুড়ে বিক্রি হচ্ছে। ফুটবলের জাতশিল্পীদের জার্সি নম্বর নয়, তাঁদের দুই পা দিয়ে সবুজ ক্যানভাসে সৃষ্ট অসাধারণ শিল্পকলা মাঠকে আলোকিত করছে। এক দল হারিয়ে যাবে, আরেক দল জ্বলে উঠবে। এটি তো জগৎ সংসারেরও নিয়ম। পেশাদার ফুটবলারদের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ চূড়া হলো বিশ্বকাপ। জাতীয় দলের আবেগ আর লক্ষ্যের সঙ্গে ক্লাব ফুটবলের কোনো তুলনাই চলে না। জাতীয় দলে খেলার জন্য সবাই মুখিয়ে থাকেন। এই সম্মান ও গৌরব তো তুলনাহীন। বিশ্বকাপ ট্রফিটি যে কত মহার্ঘ, দেশ, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের কাছে এটি লিখে বোঝানো মুশকিল। বিশ্বকাপ সব সময় বিশেষ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের দর্শনে ঠাসা! সমর্থকরা আবেগে ভাসে, চাপ সৃষ্টি হয়আর এটি খেলেই তো প্রতিদিন পারফরম করছেন খেলোয়াড়রা। একটির পর একটি খেলা ছন্দ ধরে রেখে পারফরম করা ছাড়া উপায় নেই।

সবাই তো আর বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলার সুযোগ পান না। তবে বিশ্বকাপ ফুটবলারদের ভীষণভাবে টানে। এই চত্বরে ফুটবলারদের অনুভূতিটাই একদম আলাদা। তাঁরা শুধু সেলিব্রিটি ননতাঁরা এন্টারটেইনার। তাঁরা খেলেন নির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য।

৪৮ দেশের ২৬ জন করে প্রতিটি স্কোয়াড। অনেক যাচাই-বাছাই করে তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খেলাটি তো দেশের জন্য। বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। দেশকে তুলে ধরে পরিচিত করার জন্য। চাইলেই বারবার স্কোয়াডে স্থান করে নেওয়ার সুযোগ নেই। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে স্কোয়াডে স্থান মেলে। তবে মাঠে নামার সুযোগ হবে কি না এই গ্যারান্টি সবার নেই। এখানে নিজেকে পদে পদে প্রমাণ দিতে হয়।

২০২২ বিশ্বকাপে খেলেছেন এমন সাত শরও বেশি খেলোয়াড় সুযোগ পাননি ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁর দেশকে আবার প্রতিনিধিত্ব করার। জন্ম এক দেশে অথচ খেলছেন অন্য দেশের হয়ে এমন খেলোয়াড়ের সংখ্যা এবার ২৮৯। এই সংখ্যা প্রতিটি বিশ্বকাপে বাড়ছে। এটি ফুটবল বিশ্বায়ন এবং পেশাদারির প্রশ্নের বড় উত্তর।

নতুন দেশ কুরাসাও এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলছে। তাদের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ২৫ জনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা নেদারল্যান্ডসে। সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও। তাদের সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা আমাদের চেয়ে অনেক খারাপ। এর পরও তারা ফুটবলের মাধ্যমে বিশ্বে পরিচিত হতে চেয়েছে এবং সফল হয়েছে। যে কাজগুলো অগ্রাধিকার নির্ণয় করে করা দরকার, সেগুলো নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে করতে পেরেছে বলেই তারা স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পেরেছে।

আধুনিক ফুটবলে প্রতিভার পাশাপাশি ফিটনেস, রিকভারি এবং মাঠের গতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া শক্ত লড়াই করা মুশকিল। বিশ্বকাপে তো সবাই জেতার মানসিকতা নিয়ে নামে, আর এর জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড। খেলতে হবে ট্যাকটিক্যাল গেম। পাশাপাশি শক্তিশালী রক্ষণভাগ, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা, কার্যকর আক্রমণভাগএই সবকিছুর সমন্বয় থাকা ছাড়া উপায় নেই। সব দল যে একই অবস্থা থেকে একই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে খেলেছে, তা কিন্তু নয়। এতে প্রতিপক্ষ দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। খেলা তো এখন বিজ্ঞান। আবেগের দরকার আছে, তবে এর সঙ্গে যুক্তির মিল থাকতে হবে। কোচরা রণকৌশলের বিষয়ে এখন খুবই সতর্ক। প্রতিপক্ষের ট্যাকটিক্যাল ভুলের সুযোগ একজন কোচ তো নেবেনএটিই স্বাভাবিক। ছোট দেশ কেপ ভার্দেও এবার প্রথম খেলছে। প্রথম ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে ড্র। ফুটবল পণ্ডিতরা প্রথম থেকেই বলেছেন, স্পেন এবার ফেভারিট। এটি অপ্রত্যাশিত ফলাফল। কেপ ভার্দে এরপর দ্বিতীয় খেলায় উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে নিজেকে বিশ্বের কাছে চিনিয়েছে। স্পেন ও উরুগুয়ে এই দুটি দলই অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে। স্পেন বিশ্বকাপ জিতেছে ২০১০ সালে, আর উরুগুয়ে এর অনেক আগে ১৯৩০ ও ১৯৫০ সালে। সৌদি আরবের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে কেপ ভার্দে কী করে, সেটি দেখার অপেক্ষায় থাকছি।

কেপ ভার্দের মাঠের ফুটবল পুরো দুনিয়াকে নাড়া দিয়েছে। তৃতীয় নয়ন খুলে দিয়েছে। কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে মানসিক দৃঢ়তা ও প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব। কেপ ভার্দের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গোলরক্ষক ভোজিনহার মা ১৫ হাজার ডলার জমা দিতে পারেননি বলে আমেরিকার ভিসা ইস্যু করা হয়নি। প্রথম ম্যাচ জয়ের পর ভোজিনহা মায়ের খেলা দেখতে না পারার বিষয়টি নিয়ে একটি আবেগময় স্ট্যাটাস দিয়েছেন, যা অগণিত মানুষকে আপ্লুত করেছে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকান ভিসা ইস্যু করা হয়েছে তাঁর মাকে। মা ছুটে গেছেন ছেলের বীরত্বপূর্ণ খেলা গ্যালারিতে বসে দেখার জন্য। এই টাচি বিষয়টি পুরো দুনিয়ার বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ফুটবল একটি খেলা, এটি প্রতিটি মানুষের জীবনের আবেগ থেকে তো বড় নয়। ফুটবলময় দিনগুলো নিজের মতো করে উপভোগ করুন। শুধু মনে রাখবেন, ফুটবলে মতপার্থক্য নেহাত খেলাটির সান্নিধ্যে থাকার জন্য।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া