• ই-পেপার

কবিতার ইশতেহার প্রসঙ্গে

  • অধির চক্রবর্তী

বই আলোচনা

নতুনভাবে দেশভাগ চর্চা

নতুনভাবে দেশভাগ চর্চা

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে উপমহাদেশের ৪৭-ট্র্যাজেডি দেশভাগ নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিক ও অন্য আলোয় দেখা আরেক স্বাদের প্রবন্ধগ্রন্থ সৈয়দ রিয়াজুর রশীদের দেশভাগ চর্চা। বিবৃত হয়েছে দেশ বিভাগের ইতিহাস, বর্তমান ও প্রাসঙ্গিকী। এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি আয়োজনে সন্নিবিষ্ট রয়েছেরবীন্দ্রনাথ ও দেশভাগ; দেশভাগের সকাল-বিকাল; দেশভাগ ও উত্তরবঙ্গ; দেশভাগ যশোহর রোড ও ১৯৭১; দেশভাগ পাঞ্জাব ও ট্রমাটিক মান্টো; দেশভাগ ও ইলিয়াসের চশমা; উত্তম-সুচিত্রা দেশভাগ ও চলচ্চিত্র বিষয়ক অধ্যায়গুলোতে।

গ্রন্থের অধ্যায়গুলো লক্ষ করলে বিবিধ বীক্ষণের সহজ একটা ধারণা পাওয়া যায়। আর এই দৃশ্য অবলোকন করতেই শিকড়সম্পৃক্ত পাঠক হাতে তুলে নেবেন এই গ্রন্থ।

দেশভাগের নামে ভারতবর্ষের ইতিহাসে ১৯৪৭ ঘিরে যে ঘূর্ণাবর্ত তছনছ করে দিয়েছে কোটি মানুষের গোছানো জীবন, উজ্জীবন আর বিলুপ্তির অগণন অজ্ঞাত পর্বে যেভাবে উল্টেপাল্টে গেছে, সেই অতীত সময় ও পরম্পরা, ত্রিপার্শ্ব কাচের ভেতর দিয়ে শব্দের ক্যানভাসে দৃশ্যমান করে তুলেছেন সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ তাঁর দেশভাগ চর্চা : ইতিহাস বর্তমান ও প্রাসঙ্গিক পাঠ শিরোনামের এই গ্রন্থটিতে। তাঁর বর্ণনা সাবলীল। আগ্রহী পাঠকদের আশা করি এই গ্রন্থটি ভালো লাগবে। যাঁরা দেশভাগ নিয়ে গবেষণা করবেন, তাঁদেরও উপকারে আসবে গ্রন্থটি।

দেশভাগ চর্চা : ইতিহাস বর্তমান ও প্রাসঙ্গিক পাঠ : সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ। প্রকাশক :  পুণ্ড্র প্রকাশন। প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান। মূল্য : ২৮০ টাকা।

গল্প

অবশেষে

মঈন শেখ

অবশেষে
অঙ্কন : তানভীর মালেক

ক্ষুধাটা অনেক দিনের। তবে না খেয়ে থাকার নয়। নিত্য একঘেয়ে খাবারের তোড়ে স্বাদগ্রন্থী ভোঁতা হওয়ার ক্ষুধা। আজ ইচ্ছা হলো ভালো কিছু খাওয়ার। অনটনের সংসার হলেও কষ্টেসৃষ্টে দুই কেজি মিষ্টি কিনে পনেরো বছর পর বেয়াইবাড়ি গেলেন জুব্বার। সেখানে গেলে যে ভালো খাবারের খরানি কাটবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তার ওপর ছেলের শ্বশুরবাড়ি। ক্ষুধাটা চাগিয়ে নেওয়ার জন্য না খেয়েই বের হলেন জুব্বার মিয়া। পৌঁছেই একদফা ভারি নাশতা করার মওকা আছে। কিন্তু গাড়ি-ঘোড়ার জেরে তাড়াতাড়ি পৌঁছা হলো না। রাস্তা পাকা, গাড়ি-ঘোড়ারও কমতি নেই। অথচ আজকেই খামতি পড়তে হলো। নানা হ্যাপা ঠেকিয়ে যখন পৌঁছলেন, তখন প্রায় দুপুর।

জুব্বার বাড়ি ঢুকতেই এক বদনা পানি এগিয়ে দিলেন বেয়ান সাহেবা। উঠানের নলকূপের ঠাণ্ডা পানি। চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিতেই পথের ক্লান্তি অনেকটাই চলে গেল। ফুরফুরে হলো ভিতর-বাহির। বেয়ান যখন হাত মোছার জন্য তোয়ালে দিলেন, তখন আরো ভালো লাগল।

বৈঠকঘরে বসতেই ফ্যানটা চালিয়ে দিলেন বেয়াই মাসুদ। মিল্লাত ফ্যান। মরচে ধরা হলেও বাতাস সেই আগের মতোইমিলমিলে। জুব্বার বুঝতে পারেন, বৈঠকঘরের জানালার ওপারেই রান্নাঘর। রান্নার খুশবু না এলেও মসলা বাটার শব্দ আসছে জানালার শিকে বাড়ি খেয়ে। শিল-নোড়ায় যুদ্ধ চলছে যেন।

বেয়ান সাহেবাও রান্নাঘরে ঢুকেছেন; কথাবার্তায় বোঝা গেল :

কি বউমা, দিনভর মসলাই বাটবে, নাকি রান্না চড়াবে?

এইতো হলো মা। শোনেন মা, মসলা যত পেস্ট হবে, রান্না ততই স্বাদের হবে।

তা না হয় হবে, তাই বলে বিকেলে খেতে দেবে? পেটে পিত্তি পড়বে যে।

তা কেন পড়বে? এখন নাশতা-পানি দেন, তাহলেই হবে।

না বউমা, দুপুর হয়েই গেছে। এখন নাশতা দিলে দুপুরে আর খেতে পারবে না। ভরা পেটে স্বাদ পাবে না। বেয়াই তোমার রান্নার সুনাম কিন্তু অনেক শুনেছে। এখন প্রমাণ দিতে হবে তোমাকে।

এই রে, এখন যে হাত কাঁপবে মা?

কাঁপাকাঁপি বাদ দাও। সেরা রান্নাটা আজকেই রাঁধতে হবে কিন্তু।

সে জন্যই তো মিহি করে মসলা বাটছি।

তাড়াতাড়ি করো, আমি ওদিকটা দেখছি।

আচ্ছা।

সব কথাই শুনেছেন জুব্বার। বউমার হাতের রান্নার সুনাম তিনি যে জানেন না তা নয়। সেটাও তখন মাথায় ছিল। পেটে ক্ষুধার ঢোল খঞ্জনি বাজলেও শরীরটা জোর করে চাঙ্গা রেখেছিলেন এতক্ষণ। নাকে তখনো অলীক ঘ্রাণটা ছিলই। দরজার চৌকাঠের ওপার থেকে রাঙা হাতের তালুতে হেলেদুলে ঢুকছিল এক বিশাল খঞ্চা, যাতে শৈল্পিকভাবে সাজানো কয়েক রকমের দেশি-বিদেশি ফল, মিষ্টি, বাড়িতে তৈরি কিছু হালকা খাবার ইত্যাদি। আড়চোখে সেই খঞ্চাই যেন দেখছিলেন জুব্বার। আর এভাবেই জোর করে চাঙ্গা রেখেছিলেন শরীরটা। তবে বেয়ানের কথা শুনে পোকা খাওয়া শজনেগাছের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল তা। এমন সময় হাসির রেখা ফুটিয়ে ঘরে ঢুকলেন বেয়ান। যে মাত্রার হাসি, তাতে দাঁত বের না করলেও চলত, তবু যেন জোর করেই দাঁত বের করলেন বেয়ান সাহেবা। এতে হাসির সৌন্দর্যে কিছুটা খামতি দেখা দিল। বেয়ান যে সদ্য পান ধরেছেন, দাঁত বের করায় তা বোঝা গেল। এটাও বোঝা গেল, সকালে কাঠকয়লা দিয়ে পুরোদস্তুর মেজেছেন। কয়লার বেরসিক কণা কোনো কোনো ফাঁকে ঘাপটি মেরে হাসছে দাঁতকে পাল্লা দিয়ে।

কিগো, নাশতা-পানি কিছু দাও। মাসুদ সাহেব তড়িঘড়ি করে বললেন কথাটা। যদিও জুব্বার মিয়া ভরসা পেলেন না তাতে।

তোমার আবার ঢঙের কথা। এখন নাশতা দিলে দুপুরেরটা খাবেন কখন? কী বলেন বেয়াই সাহেব? জুব্বার শুকনা মুখে হাসি না এনে পারলেন না।ঠিকই তো। এখন খেলে বউমার হাতের রান্না কবজি ডুবিয়ে খাব কী করে?

তা ঠিক বলেছেন বেয়াই। এখন একটু গড়াগড়ি দেন, গরুর মুখে দুই আঁটি খড় দিয়ে আসছি। বেয়াই-বেয়ান দুজনই ঘর থেকে বের হলে জুব্বার বিছানায় আধশোয়া হয়ে কাত হলেন। ক্ষুধার ধকলে শরীর নিস্তেজ হলে নাকি ঝিমুনি আসে। জুব্বারেরও কিছুটা ঝিমুনি এলো। কানে তখনো শহুরে বউমার মসলা বাটার শব্দ। ঘষর ঘষর। কখনো খটখট। এই ঘষর ঘষর শব্দটাই আরো ইন্ধন জোগাল ঝিমুনিতে।

ধড়ফড়িয়ে লাফ দিয়ে উঠলেন জুব্বার। চোখটা এঁটে এসেছিল। কিন্তু শব্দটা এলো কোথা থেকে? হামানদিস্তায় কালো ধুতরার শিকড় কে যেন থেঁতলাচ্ছে। মনে হলো কানের কাছেই। তবে কি বউমা এখনো মসলা করছে? এমনই নানা প্রশ্নরেখা ফুটে উঠল জুব্বারের চোখে-মুখে। বুক ওঠানামা তখনো করছে। এমন সময় উঠান থেকে বেয়ানের চিল্লানি শোনা গেল।কী হলো বউমা, এত দিনের নোড়াটা ভাঙলে নাকি?

না মা।

মসলা করতেই যদি দিন চলে যায়, তাহলে রান্নাটা হবে কখন? মানুষ বাঁচলে তবেই তো স্বাদের রান্না খাবে।

ছি ছি মা, এসব কী বলছেন। এক্ষুনি রান্না চড়াচ্ছি।

তাই করো। আমার পিঠা করা হয়ে গেল। বউ-শাশুড়ির কথোপকথনে জুব্বার বুঝতে পারলেন, বউ মসলা করতে গিয়েই শব্দটা করেছে। তাই বলে এত জোরে! আবার মনকে প্রবোধ দেন, ঘুমের ঘোরে বলেই বোধ হয় এমনটা শুনেছেন। তার পরও ধন্দ একটা থেকেই গেল। তিনি আরো বুঝতে পারলেন, বেয়ান সাহেবা উঠানের চুলায় পিঠা ভাজছেন। এখন কোনো কিছুরই ঘ্রাণ জুব্বার আলীকে স্পর্শ করছে না।

অবশেষে যখন খাবার দেওয়া হলো তখন দুপুর নেই; বলা চলে বিকেলও গড়িয়ে গেছে। এক এক করে বেশ কয়েক রকম খাবার এলো ঘরে। টেবিলে আঁটছে না যেন। টেবিলে না আঁটাতে পায়েসের বাটিটা বিছানার এক কোনায় রাখা হলো। পায়েস পরে আনলেও চলত। খাওয়ার সময় বোধ হয় মনে করে দেওয়ার জন্যই তা এনে রাখা হলো, যাতে খাওয়ার সময় পেটে জায়গা রাখেন। এমনই মনে হলো জুব্বারের।

মুুখে পানির ঝাপটা দিয়ে এসে টেবিলে বসলেন বটে, তবে ভেতর থেকে সাড়া এলো না। এত ঘ্রাণ, এত খাবারকোনো কিছুই আর জুব্বারের ক্ষুধাকে তাড়িত করতে পরল না। ক্ষুধাও যেন নেতিয়ে পড়েছে; দাঁড়ানোর শক্তি নেই। সঙ্গে মাসুদ সাহেবও বসেছেন। বেয়ান সামনে বসে তুলে দিচ্ছেন দুজনকে। বউমা দরজার চৌকাঠে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রান্নার প্রশংসা শোনার জন্য তার মনে যে একটা ছটফটানি আছে, শরীরের দুলুনিতে তা বেশ বোঝা যায়। বাহাদুরের মাংস দিয়ে বেয়াই সেবা। কান দোলানো, টোপর দোলানো বাড়ির লাল মোরগকে তাঁরা বাহাদুর ডাকতেন। কানে দুল পরানো ছিল বাহাদুরের। খাসি। বাড়ির মানান ছিল বাহাদুর। পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করত সব সময়। তাকেই আজ জবাই করা হয়েছে। এতে মনে একটা দুঃখ জমা হলেও পনেরো বছর পরে আসা বেয়াইকে খাওয়ানোর সুখ কম নয়। রান দুটির একটি প্রথমে বেয়াই এবং পরে স্বামীর প্লেটে তুলে দিলেন। বেয়াইয়ের প্লেটে আরো কয়েক টুকরা মাংস দিলেন। ভেবেছিলেন, বেয়াই সাহেব আপত্তি তুলে প্লেটের সামনে হাত বাড়াবেন। কিন্তু তা করলেন না জুব্বার। এতে বেয়ান সুফিয়া মনে মনে খুশিও হলেন, মাংসের প্রতি বেয়াই সাহেবের লোভ দেখে। কী হলো বেয়াই, মুখে তুলছেন না কেন?

এইতো তুলছি।

কিগো, তুমিও যে বসে থাকলে কুটুম হয়ে। স্বামীকে আরেক টুকরা মাংস দিতে দিতে বললেন সুফিয়া। স্বামীকে বললেও জুব্বারই মুখে তুললেন আগে। মুখে তুলেই একটা খটকা অনুভব করলেন। তবে কিছু বললেন না। এবার মাসুদ সাহেব মোরগ-ঝোলে পোলাও ভালো করে রগড়ে বিসমিল্লাহ বলে মুখে দিলেন। ডান গাল থেকে বাঁ গালে নিতেই উঠে দিলেন দৌড়। মুখের মাংস-পোলাও উগরে কয়েকবার কুলি করলেন পর্যন্ত। তখনো কিছু বলেননি মাসুদ। বউ আর বউমা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে থাকেন। বউমা ভাবে, শ্বশুরের দাঁতে চুল পড়েছে। বেয়ান ভাবেন লবঙ্গ। জুব্বার অবশ্য মনে মনে হাসছেন।

কী হলো তোমার, নিশ্চয় লবঙ্গ পড়েছে? সুফিয়া একধাপ এগিয়ে গেলেন স্বামীর দিকে।

না মা, লবঙ্গ পড়বে কেন? আমি ভালো করে পেস্ট করেছি। নিশ্চয়ই চুল। আমর চুল কিন্তু ঝরে না, সেটা বাবা জানেন। বউ-শাশুড়ির তর্ক দেখে খেঁকিয়ে ওঠেন মাসুদ সাহেব।থামবে তোমরা। চুল বা লবঙ্গ কিছুই পড়েনি। বালি পড়েছে। মাংসে বালি দিল কে?

এ আবার কেমন কথা বাবা! বালি কে দেবে?

একবার মুখে দিয়ে দেখো। মিহি বালি নয়, ডুমার বালি। কি বেয়াই, আপনার মুখে পড়েনি?

পড়েছে, তবে আপনার বোধ হয় বেশিই পড়েছে। কথাটা বলেই মুচকি মুচকি হাসতে থাকেন জুব্বার।

বেয়ান সাহেবা যতটা লকলকানি, ততটাই বুদ্ধিমতী। সহজেই অনেক কিছু বুঝে ফেলেন। তিনি আর কথা বাড়ালেন না। গজরগজর করতে করতে রান্নাঘরে দৌড় দিলেন। আর খানিক পরেই মসলা করার নোড়াটা নিয়ে এ ঘরে এলেন। এমনভাবে নোড়া ধরে এলেন, যেন কাউকে তুলে মারবেন। বউমা ভাবল তাকে। স্বামী ভাবলেন অন্য। জুব্বারের কাছে মনে হচ্ছে, ছুঁচার কেত্তন। পেটের ছুঁচা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। এবার চিল্লিয়ে উঠলেন সুফিয়া।তাই তো বলি, অত জোরে শব্দ হলো কেন। গতরের শক্তি সব ঢাললে হবে না এমন? বলেই নোড়াটা সামনে তুলে দেখালেন। সবাই দেখল, নোড়ার এক কোনা পুরোটাই ভেঙে গেছে। নোড়ার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে বউমা। ধক করে উঠল বুক। তবে কিছু বলার আগেই খেঁকিয়ে উঠলেন শাশুড়িআমার বাপের দেওয়া মহিষা পাথরের নোড়াটা ভেঙে দিলে? গতরে তোমার এতই শক্তি?

 না মা, বড় এলাচটা পাথরের মতো শক্ত যে। কোনোমতেই পেরে উঠছিলাম না। জোরে মারতে গিয়েই নোড়ার কোনাটা ভেঙেছে। তবে আমিও সেই বাপের বেটি। এলাচ ঠিকই পেস্ট করেছি।

শোনো বউমা, আমরা পায়ের গোড়ালি দিয়ে রসুন থেঁতলে ডাল তেলে দিয়েছি, তবু স্বাদে কম পড়েনি। রাস্তার লোক গন্ধ পেয়ে টুকি মেরেছে।

এটা ঠিক বললেন না মা। মসলা যত পেস্ট করবেন, ততই স্বাদ হবে। না হলে বেলাভর মসলা করলাম কেন?

মসলার সঙ্গে যে নোড়ার কোনাও পেস্ট করেছিস রাঁধুনির বেটি। এবার আরো রেগে গেলেন সুফিয়া।

না মা, তা করব কেন?

তাহলে ভাঙা অংশটা দেখা।

আমিও খুঁজেছি মা, পাইনি। কোথায় যেন ছিটকে চলে গেছে।

কোথাও যায়নি খানেওয়ালা ঘরের বেটি। ওটা তোর পেস্ট হয়ে তরকারিতেই গেছে। তাইতো এত স্বাদ। দেখছিস না, মুখে তুলতে পারছে না?

দুই বেয়াই মিলে বাকি দুজনের ঝগড়া শুনছিলেন। কেউ কোনো কথা বলেননি। শহুরে বউ কী বলবে সেও বুঝতে পারছে না। তবে নিজেকে নিজেই চড়াতে ইচ্ছা করল। সরে গেল সেখান থেকে। বেয়ান লজ্জায় তাকাতে পারছেন না তাঁর বেয়াইয়ের দিকে। তবু সবকিছু দূরে ঠেলে তাকালেন। জুব্বার ততক্ষণে হাত ধুচ্ছেন। বেয়ান দৌড়ে গিয়ে বলতে পারলেন নাদোহাই বেয়াই, হাত ধোবেন না। অন্য তরকারি দিয়ে খান। বলতে পারলেন নাবেয়াই, অন্তত পায়েসটা খান। জুব্বার এখন বেয়ানের এনে রাখা গামছায় হাত মুছাতে ব্যস্ত।

শৈশব ও বাবা

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

শৈশব ও বাবা

শৈশবে বাবার শাসন ছিল একটু কড়া

মনে হতো বাবা মানেই নিষেধের বেড়া

স্বাধীনতার চারপাশে টানা কাঁটাতার।

শৈশব ধরে রাখতে পারিনি মুঠোয়

শুকনো বালির মতো ঝরে গেছে সময়

আঙুলের ফাঁক দিয়ে নিঃশব্দে।

বাবার হাত ধরে হাঁটতে চেয়েছিলাম

রোমাঞ্চকর সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে

কিন্তু তিনি ছিলেন দূরের প্রদীপ

আমাদের আলোকিত করতে ছুটতেন দিন-রাত।

সুখ বলতে তিনি বুঝতেন

রবিবার হাটে নিয়ে যাওয়া

সন্তানের নতুন জামা

পকেটে একটা নতুন নোট।

চাইতাম হাত

দিতেন হাতখরচ।

আমি চেয়েছিলাম একটু একান্ত সময়

একটু হাসি

একটা গল্প

বাবা বাবা গন্ধে ভরপুর একটা হাতের স্পর্শ।

আজ আমিও বাবা

দাঁড়িয়ে আছি সেতুর মাঝখানে

এক প্রান্তে আমার শৈশব

অন্য প্রান্তে সন্তানের চোখ

সন্তান তাকিয়ে থাকে

ঠিক যেমন আমি তাকিয়ে থাকতাম

অপেক্ষার লম্বা ছায়ায় দাঁড়িয়ে।

আমার সন্তানও একদিন বাবা হবে

সেও হয়তো ছুটবে আমার মতো

আমার বাবার মতো

তার বাবার মতো

তার সন্তানও হয়তো শৈশব বিক্রি করে দেবে

দামি দীর্ঘশ্বাসের দামে।

 

শৈশবে আমরা চাই

আমাদের একটা সকাল জমা থাকুক

আমাদের একটা বিকেল আসুক

হাতের ভিতর হাত রেখে হাঁটার

ছোটগল্পটা হয়ে উঠুক সিনেমার চিত্রনাট্য।

অথচ সেই শৈশবকেই আমরা

ঘাটের খেয়া নৌকায় অপেক্ষায় রেখে

উঠে আসি নিয়তির স্টিমারে।

 

শূন্যতার ল্যান্ডস্কেপ

আবদুর রব

শূন্যতার ল্যান্ডস্কেপ

কামুর অস্তিত্ববাদী নির্জনতার স্মরণে

পাহাড় থেকে পাথর নেমে আসে নিঃশব্দে

ঘাসের উপত্যকায়।

 

পৃথিবী জানে না কতটা অচেনা সে।

নিজেই নিজেকে চাপা দিয়ে রাখে,

সময়ের ভারে।

 

প্রতিটি পাথর-নিস্পন্দ হৃদয়,

অর্থহীন দৃশ্যের ভিতরে একাকী হারায়।

 

এক পরিত্যক্ত স্বর্গ,

যেদিকে তাকাও, পাথরের জঙ্গল, এর সৌন্দর্য

শূন্যতার ল্যান্ডস্কেপে টিকে থাকে

মৃত্যুর নীরবতায়।