• ই-পেপার

যেভাবে শুরু হয় হিজরি সন

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৫৪

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক তো আল্লাহ, অতঃপর অবিচলিত থাকে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, তারা যা করত তার পুরস্কারস্বরূপ। আমি মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ১৩-১৫)

আয়াতগুলোতে দ্বিনের ওপর দৃঢ়তা ও মা-বাবার সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

 

১. দ্বিনের ওপর দৃঢ়তার অর্থ হলো ঈমান ও শরিয়তের ওপর অবিচল থাকা এবং দ্বিন পরিপালনে পার্থিব ভয়-ভীতি উপেক্ষা করা।

২. দ্বিনের ওপর অবিচল থাকার পুরস্কার হলো পার্থিব জীবনের অনিশ্চয়তা ও দুর্ভাবনা দূর হওয়া এবং পরকালে জান্নাত লাভ করা।

৩. মা-বাবার সঙ্গে উত্তম আচরণের অর্থ হলো তাদের আনুগত্য করা, তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করা, হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করা।

৪. হাদিসে বলা হয়েছে, মৃত্যুর পর মা-বাবার আনুগত্য হলো তাদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা, তাদের অঙ্গীকারগুলো পূরণ করা, তাদের সম্পর্কিত আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের বন্ধুদের সম্মান করা।

৫. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কবিরা গুনাহ হলো শিরক করা, মা-বাবার অবাধ্য হওয়া, মানুষ হত্যা করা ও মিথ্যা কসম করা। (তাফসিরে মুনির : ১৩/৩৪৩)

নতুন বছরে নতুন গিলাফে পবিত্র কাবা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
নতুন বছরে নতুন গিলাফে পবিত্র কাবা

শুরু হলো আরবি নতুন হিজরি সন। আরবি ক্যালেন্ডারের নতুন বছর ১৪৪৮ হিজরির সূচনায় ইসলামের পবিত্রতম স্থান কাবা শরিফে ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে নতুন কিসওয়া (গিলাফ) পরানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে মসজিদুল হারামে এই বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। 

সৌদি আরবের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী বিষয়ক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে কাবার পুরনো গিলাফ সরিয়ে নতুন গিলাফ স্থাপন করা হয়। পুরো কার্যক্রমে তদারকি করেন মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর ধর্মবিষয়ক প্রধান শায়খ ড. আবদুর রহমান আস-সুদাইস।

কাবার কিসওয়া তৈরির দায়িত্বে থাকা কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্সের দক্ষ কারিগর ও প্রযুক্তিবিদদের একটি দল ১০ ধাপের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন কিসওয়া স্থাপন করে। এ সময় পুরনো কিসওয়া খুলে ফেলে কাবার চারপাশে নতুন কিসওয়া ধাপে ধাপে স্থাপন করা হয় এবং তা কাবার কোনা ও ছাদের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।

মদিনায় শুরু হলো বহুলপ্রতীক্ষিত খেজুরের মৌসুম

হাফেজ মাওলানা আব্দুর রহমান
মদিনায় শুরু হলো বহুলপ্রতীক্ষিত খেজুরের মৌসুম

বাগান থেকে মৌসুমের প্রথম খেজুর সংগ্রহের মধ্য দিয়ে ইসলামের পবিত্র নগরী মদিনায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এ বছরের খেজুর মৌসুম। এরই মধ্যে মদিনার কেন্দ্রীয় খেজুর বাজার, নিলাম কেন্দ্র এবং আশপাশের কৃষি অঞ্চলে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। কৃষক, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।

মদিনার পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামগুলো এবং ওয়াদি আল-সাফরা এলাকার বাগানগুলো থেকে প্রথম দফার খেজুর বাজারে আসতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং বাজার আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

এবারও বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে রুথানা জাতের খেজুর। মদিনার বাসিন্দা ও আগত দর্শনার্থীদের কাছে এটি অন্যতম জনপ্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত খেজুর হিসেবে পরিচিত। মাঝারি আকার, নরম গঠন এবং পরিমিত মিষ্টতার কারণে এই জাতের খেজুরের চাহিদা প্রতিবছরই থাকে তুঙ্গে। কৃষকরা জানিয়েছেন, জুন মাসের শেষ নাগাদ রুথানা খেজুর পূর্ণমাত্রায় পাকতে শুরু করবে এবং তখন বাজারে এর ব্যাপক সরবরাহ দেখা যাবে।

মৌসুমের শুরুতে সরবরাহ সীমিত থাকায় এবং চাহিদা বেশি হওয়ায় খেজুরের দাম তুলনামূলকভাবে উচ্চ অবস্থানে থাকে। তবে জুলাই মাসে বিভিন্ন জাতের খেজুর একসঙ্গে বাজারে আসতে শুরু করলে সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম ধীরে ধীরে কমে আসে। ব্যবসায়ীদের ধারণা, ভরা মৌসুমে এক বাক্স রুথানা খেজুরের দাম নেমে মাত্র ১০ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এরপর আগস্ট মাসে মৌসুম শেষের দিকে এগোলে আবারও দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রুথানার পাশাপাশি মদিনার গ্রীষ্মকালীন খেজুরের মধ্যে লোনারাবিয়া অন্যতম, যেগুলো সাধারণত মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আসে। এ ছাড়া বড় আকার ও সুস্বাদু মিষ্টতার জন্য বার্নি খেজুরও ব্যাপক জনপ্রিয়। অন্যদিকে আজওয়া খেজুর তার বিশেষ মর্যাদা, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং উচ্চ বাজারমূল্যের কারণে দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে। এর বাইরে সাফাওয়িহালিয়াহ জাতের খেজুরও বাজারে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

উচ্চ চাহিদার কারণে কৃষকরা বিশেষভাবে সতর্কতার সঙ্গে খেজুরের পরিপক্বতা ও গুণমান নিশ্চিত করে থাকেন। ফল সম্পূর্ণরূপে পাকার পরই সেগুলো সংগ্রহ করা হয়। এরপর বাগান থেকে সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি দেশ-বিদেশে রপ্তানি এবং ব্যক্তিগত ক্রেতাদের জন্য প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা হয়।

প্রতিবছরের মতো এবারও মদিনার খেজুরের মৌসুম জুন থেকে আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত চলবে। এ সময় মদিনার অর্থনীতি, কৃষি খাত ও স্থানীয় বাজারে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরবি নববর্ষের বৈশিষ্ট্য

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
আরবি নববর্ষের বৈশিষ্ট্য

হিজরি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এর প্রসার ও প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ইসলামের প্রথম যুগের মুসলমান এবং মুসলিম শাসকরা এটিকে তাঁদের প্রধান ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত তারিখ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করতেন। এখনো মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশে হিজরি সনকে বর্ষপঞ্জি হিসেবেই ব্যবহার করা হয়।

হিজরি সনের বৈশিষ্ট্য

পৃথিবীর সব বর্ষপঞ্জির নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। ঠিক তেমনি হিজরি সনেরও কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো

১. অনন্য সূচনা : পৃথিবীতে প্রচলিত বর্ষপঞ্জিগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় যে সেগুলোর সূচনা হয়েছে কোনো বড় ব্যক্তি ও শাসকের জন্ম বা মৃত্যু কেন্দ্র করে অথবা বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে। কিন্তু হিজরি সনের সূচনা হয়েছে একটি জাতির অসামান্য আত্মত্যাগের ইতিহাস কেন্দ্র করে। মুসলমানরা দ্বিন ও ইসলামের স্বার্থে প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে এসেছিল। মাতৃভূমি ত্যাগ করা যেকোনো ব্যক্তির জন্য অনেক বড় আত্মত্যাগ, মানুষ আমৃত্যু মাতৃভূমিকে ভুলতে পারে না। মহানবী (সা.) হিজরতের সময় মক্কাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, হে মক্কা! তুমি কতই পবিত্র ও প্রিয়। যদি আমার গোত্র আমাকে বের করে না দিত আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না। (তিরমিজি)

২. চান্দ্রবর্ষ : হিজরি সন গণনা করা হয় চাঁদের হিসাবে। চাঁদের ওপর ভিত্তি করে এর মাস ও বছর গণনা করা হয়। বহু প্রচলিত খ্রিস্ট বা গ্যাগরিয়ান বর্ষপঞ্জি এর বিপরীত, কেননা তাতে সূর্যের ওপর নির্ভর করে দিন গণনা করা হয় এবং তা অনেকাংশে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল।

৩. প্রাকৃতিক নিয়মের প্রতিফলন : দিন-রাতের পরিবর্তন এবং পৃথিবী ও চাঁদের আবর্তনের মাধ্যমে বছর ও মাসের যে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান, হিজরি সন সম্পূর্ণরূপে তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চান্দ্র বছর প্রকৃত অর্থেই একটি বাস্তব ও স্বাভাবিক বছর। চাঁদ যখন পৃথিবীর চারদিকে একবার পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে, তখন একটি মাস পূর্ণ হয়; আর ১২ বার আবর্তন সম্পন্ন করলে একটি বছর শেষ হয়। পক্ষান্তরে খ্রিস্টীয় (ইংরেজি) সনের ক্ষেত্রে এমন কোনো স্বাভাবিক ও নির্দিষ্ট ভিত্তি নেই। খ্রিস্টীয় বছরে ৩৬৫ দিন এবং প্রায় ৬ ঘণ্টা থাকে। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে বছরের সমাপ্তি ঘটে শেষ দিনেরও এক-চতুর্থাংশ অতিক্রান্ত হওয়ার পর। ফলে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে নয়, বরং দিনের মাঝপথেই বছরের সমাপ্তি ঘটে।

৪. অবিকৃত : হিজরি সন তার প্রবর্তনের শুরু থেকেই নিজস্ব মূল ও প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী অবিকৃতভাবে চলে আসছে; এতে কোনো সংশোধন বা পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়নি। ইসলামী ক্যালেন্ডারের এটি এমন একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা সম্ভবত পৃথিবীর অন্য কোনো প্রচলিত ক্যালেন্ডারে নেই। এমনকি খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারও এ বৈশিষ্ট্য থেকে বঞ্চিত।

৫. পৃথিবীর প্রাচীন বর্ষপঞ্জি : প্রচলন ও ব্যবহারের দিক থেকেও হিজরি সন বিশ্বের বেশির ভাগ প্রচলিত সনের তুলনায় অধিক প্রাচীন। যদিও অন্যান্য প্রচলিত সনের সংখ্যাগত হিসাব দেখে সেগুলো হিজরি সনের চেয়ে পুরনো বলে মনে হতে পারে।

হিজরি সনের গুরুত্ব

মুসলমানের কর্তব্য হলো ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং দৈনন্দিন জীবনে এই বর্ষপঞ্জিকে গুরুত্ব দেওয়া। যদিও বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করা পাপ নয় এবং শরিয়তের দৃষ্টিতেও তা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু যদি সৌর ক্যালেন্ডারের ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে আমরা ইসলামী হিজরি সনকে পুরোপুরি ভুলে যাই, তবে তা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। কারণ ইসলামী হিজরি ক্যালেন্ডার সংরক্ষণ করাও মুসলমানদের একটি দায়িত্ব।  এ ছাড়া নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখা একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) এ বিষয়ে লেখেন, যেহেতু শরিয়তের বিধানগুলোর ভিত্তি চান্দ্র হিসাবের ওপর নির্ভরশীল, তাই এ হিসাব সংরক্ষণ করা ফরজে কিফায়া। অতএব, যদি সমগ্র উম্মাহ অন্য কোনো তারিখ পদ্ধতিকেই নিজেদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করে এবং এর ফলে চান্দ্র হিসাব বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে সবাই গুনাহগার হবে। আর যদি চান্দ্র হিসাব সংরক্ষিত থাকে, তবে অন্য হিসাব ব্যবহার করাও বৈধ। তবে তা অবশ্যই পূর্বসূরি মনীষীদের সুন্নত ও রীতির পরিপন্থী। আর চান্দ্র হিসাবের ব্যবহার যেহেতু ফরজে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত, তাই তা নিঃসন্দেহে অধিক উত্তম ও শ্রেয়। (বয়ানুল কোরআন)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বিনের ব্যাপারে সচেতনতা দান করুন। আমিন।