সময়ের বিবর্তন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আবাসন খাত শুধু একটি মৌলিক চাহিদা হিসেবে থেকে যায়নি, বরং অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতেও পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে একসময় এই খাত চাঙ্গা থাকলেও করোনা মহামারি ও তার পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত নানা সংকটে জর্জরিত। নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণে উচ্চ সুদহার ও ডলার অস্থিরতার কারণে এই খাত রীতিমতো ধুঁকছে। এবার প্রস্তাবিত বাজেটেও এ নিয়ে কোনো আশার আলো দেখা যায়নি। উল্টো রডের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের আরো উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে আবাসন খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা এই খাতের রয়েছে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব। এর সঙ্গে যুক্ত আছে হাজারো সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এর সঙ্গে যুক্ত। জিডিপিতে অবদান প্রায় ১৫ শতাংশ। সংগত কারণেই ওয়াকিফহাল মহলের সতর্কবার্তা হলো, এই খাতের সংকট বাড়লে গোটা অর্থনীতিতেই এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানি ও নির্মাণ উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে সব মিলিয়ে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। এতে ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) তথ্যানুযায়ী, কয়েক বছর আগেও পুরো শিল্প খাতে মাসিক ফ্ল্যাট বিক্রি আগে যেখানে প্রায় এক হাজারটি ছিল, এখন তা কমে ৫০০-তে নেমে এসেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার। বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এই নাজুক পরিস্থিতিতেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রডের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা এই খাতকে আরো দুর্বল করে দিতে পারে। এ ছাড়া নানা পর্যায়ে কর বৃদ্ধির প্রস্তাবও করা হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের মতো জমি স্বল্পতার দেশে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে ফ্ল্যাটের দিকেই ঝুঁকছেন। কিন্তু বাজারে নির্মাণসামগ্রী ও জমির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ফ্ল্যাটের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেছে। এর ওপর ব্যাংকঋণ পাওয়াও এখন অনেক কঠিন।’
আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি সব সময়ই আবাসন খাতকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার পক্ষে। এই একটি খাত চাঙ্গা হলে এর সঙ্গে যুক্ত তিন হাজার ৬০০টি সেবা ও উৎপাদনমুখী শিল্প খাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠবে। আবাসন খাত থেকে কর ছাড় দিলে সরকার যে রাজস্ব হারাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব উঠে আসবে এর সঙ্গে যুক্ত লিংকেজ শিল্পগুলোর প্রবৃদ্ধি থেকে।’
আমরাও মনে করি, দেশের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে সচল করতে আবাসন খাতে সুনজর দেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সরকার সঠিক পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য।

