কাপড়ের ছাউনির মতো বাহনে চড়ে আকাশে ভেসে চলার দৃশ্য দেখা যায় আজকাল। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে—এটা কী? বিজ্ঞান এখানে কিভাবে কাজ করে? এই কাঠামোটির নাম প্যারাগ্লাইডার। এর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় আকাশে ভেসে বেড়ানো যায়। এই ওড়ার পেছনে ভূমিকা রাখে বায়ুগতিবিদ্যা (এরোডায়নামিকস), বায়ুপ্রবাহ ও পদার্থবিজ্ঞান। প্যারাগ্লাইডার মূলত ইঞ্জিনবিহীন এক ধরনের হালকা ওজনের উড়োজাহাজ বা বাহন। এর কাপড়ের ছাউনি বা কাপড়ের ডানায় (ক্যানোপি) অনেকগুলো দড়ি থাকে। দড়িগুলোর এক প্রান্তে থাকে পাইলটের বসার ব্যবস্থা। উড্ডয়নের সময় বাতাস ক্যানোপির সামনের খোলা অংশ দিয়ে ঢুকে ভেতরে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে কাপড়ের ডানাটি ফুলে উঠে একটি নির্দিষ্ট বায়ুগতীয় আকৃতি ধারণ করে, যা বিমানের ডানার মতো কাজ করে। লিফট বা উত্তোলন বল কাজে লাগিয়ে প্যারাগ্লাইডার উড্ডয়ন করে। ভাসমান প্যারাগ্লাইডার সামনে এগোনোর সময় ডানার ওপর ও নিচ দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়। ডানার বিশেষ আকৃতির কারণে ওপরের দিকের বাতাস নিচের দিকের তুলনায় দ্রুত প্রবাহিত হয়। এর ফলে ওপরের অংশে বায়ুচাপ কম এবং নিচে তুলনামূলক বেশি থাকে। এই চাপের পার্থক্য ডানাকে ওপরে তোলার জন্য একটি বল সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়াটিই হলো লিফট বা উত্তোলন বল। পদার্থবিজ্ঞানে লিফটের পরিমাণ বায়ুর ঘনত্ব, গতি, ডানার ক্ষেত্রফল ও ডানার নকশার ওপর নির্ভর করে। একই সঙ্গে প্যারাগ্লাইডারে স্বভাবতই পৃথিবীর মহাকর্ষ বল কাজ করে। যখন লিফট ওজনের একটি বড় অংশকে ভারসাম্য দেয়, তখন পাইলট ধীরে ধীরে নিচে নামতে নামতে সামনের দিকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারেন। তবে শুধু লিফটের কারণেই প্যারাগ্লাইডার দীর্ঘ সময় আকাশে থাকে, ব্যাপারটা এমন নয়। এখানে ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ বা আপড্রাফট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সূর্যের তাপে ভূমির বিভিন্ন অংশ গরম থাকে। ফলে কোথাও কোথাও উষ্ণ হালকা বাতাস (থার্মাল) ওপরের দিকে উঠতে থাকে। পাইলটরা এই থার্মাল বায়ুপ্রবাহের ভেতরে চক্কর দিলে প্যারাগ্লাইডার আরো ওপরে উঠে যায়। এভাবেই তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশে থাকতে পারেন। প্যারাগ্লাইডারের দিক নিয়ন্ত্রণও বেশ বৈজ্ঞানিক। ক্যানোপির দুই পাশে ব্রেক লাইন থাকে। পাইলট যদি ডান পাশের ব্রেক টানেন, তাহলে ডান পাশের ডানার গতি কমে যায়। তখন প্যারাগ্লাইডার ডান দিকে ঘুরে যায়। একইভাবে বাঁ পাশের ব্রেক টানলে বাঁ দিকে মোড় নেয়। উভয় ব্রেক একসঙ্গে টানলে গতি কমে যায়। এ অবস্থায় অবতরণ করা যায়। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে ইউরোপীয় পর্বতারোহীরা পাহাড় থেকে দ্রুত নিচে নামার জন্য প্যারাশুট ব্যবহার করতেন। ১৯৮০-র দশকে প্যারাশুটের নকশায় পরিবর্তন এনে ডানা যোগ করা হয়। ইঞ্জিনবিহীন এই বাহনের নাম দেওয়া হয় প্যারাগ্লাইডার।




